kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মুখোমুখি দেবী কুশীলবরা

হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ বড় পর্দায় আসবে কাল।অনম বিশ্বাসের এই ছবির প্রধান চরিত্রের চার অভিনয়শিল্পী জয়া আহসান, চঞ্চল চৌধুরী, অনিমেষ আইচ ও শবনম ফারিয়া। ৫ প্রশ্ন নিয়ে তাঁদের মুখোমুখি দাউদ হোসাইন রনি

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মুখোমুখি দেবী কুশীলবরা

‘দেবী’র এক দৃশ্যে চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান ও অনিমেষ আইচ

আমার দুটোই চাই

জয়া আহসান

 কৌশিক গাঙ্গুলির ‘বিসর্জন’ মুক্তি পেল গত বছর, ‘বিজয়া’ও মুক্তির মিছিলে। এর মাঝখানে নিয়ে আসছেন ‘দেবী’। সিরিয়ালটা ওলটপালট হয়ে গেল না? প্রথমে ‘দেবী’, ‘বিজয়া’ ও পরে ‘বিসর্জন’ এলে কিন্তু একটা দারুণ ‘ট্রিলজি’ হতে পারত।

হা হা হা। আমার তো আর উপায় নেই, ভাই। ‘দেবী’ যখন ধরা দেওয়ার তখনই দেবে। এটা তো আসলে সরকারি প্রজেক্ট, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওঠানামা হয়। খুব বেশি দেরিও কিন্তু হয়নি। আর আপনি যে সিরিয়ালটার কথা বললেন, এটা কিন্তু একেবারেই মাথায় ছিল না। তবে হ্যাঁ, দারুণ একটা ‘ট্রিলজি’ হতে পারত। তিনটা নাম পর পর শুনলে তেমনটাই মনে হয়। ‘দেবী’র রানু আর ‘বিসর্জন’ ও ‘বিজয়া’র পদ্মা কিন্তু একেবারেই বিপরীতধর্মী চরিত্র। পদ্মা রক্তমাংসের মানুষ, বাস্তব একটা চরিত্র। রানু ঠিক স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়, অতিপ্রাকৃত চরিত্র বলতে পারেন।

 

একই সঙ্গে ‘দেবী’র সহপ্রযোজক ও প্রধান চরিত্রের অভিনেত্রী। প্রযোজক হিসেবে, না অভিনেত্রী হিসেবে সফল হলে বেশি খুশি হবেন?

আমার দুটোই চাই। এ ক্ষেত্রে আমি খুব লোভী। প্রযোজক জয়া অনেক সততার সঙ্গে কাজ করেছে। সব ছবিতে যেভাবে অভিনয় করি, এখানেও সেভাবেই করেছি। রানু যদি সফল না হয়, দোষ শুধু আমার ঘাড়ে আসবে না, পরিচালকের কাঁধেও যাবে। হা হা হা।

 

হুমায়ূন আহমেদের রানু অষ্টাদশী। ছবিতে আপনি কি অষ্টাদশী হওয়ার চেষ্টা করেছেন?

ছবির রানু কিন্তু অষ্টাদশী নয়। মেয়েটার মানসিক বয়স ১২-১৩-তে আটকে আছে, তার শরীরটা হয়তো বেড়েছে। অভিনেত্রীর বয়স বড় বিষয় না আসলে, মিসির আলীকে মোটা না চিকন লাগছে সেটাও বড় বিষয় না। আসল কথা হলো, রানুকে রানুর মতো বা মিসির আলীকে মিসির আলীর মতো লাগছে কি না!

 

রানু ছাড়া ‘দেবী’র আর কোন চরিত্রটার প্রতি আপনার লোভ হয়? সুযোগ পেলে সেটাও করতেন?

নীলু।

 

ছবির একটা দৃশ্যের বর্ণনা দিন, যেটি আপনার চোখে অসাধারণ।

ছবির শেষ দৃশ্যটা আমার অনেক পছন্দের। এই মুহূর্তে ডিটেইল বলা ঠিক হবে না। ভালো লাগার কারণ, এখানে একটা পরিণতি দেখানো হয়েছে।

 

চলচ্চিত্রকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেবে ‘দেবী’

চঞ্চল চৌধুরী

‘দেবী’র আগে পাঁচটি ছবি মুক্তি পেয়েছে আপনার। এর মধ্যে ‘মনপুরা’ আর ‘আয়নাবাজি’ তো গত এক যুগের সেরা দুটি চলচ্চিত্র। দুটিই ছিল পরিচালকের প্রথম ছবি। ‘দেবী’ও অনম বিশ্বাসের প্রথম ছবি। আমরা কি আরেকটা সুপারহিট পেতে যাচ্ছি? আপনার হিসাব কী বলে?

আরেকটা সুপারহিট হবে কি না সেটা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে, সফল ছবি হওয়ার মতোই ছবি ‘দেবী’। হিসাবটা একটু বলি, সারা দেশে হুমায়ূন আহমেদের অগণিত ভক্ত, তারা এই ছবির জন্য মুখিয়ে আছে। ‘আয়নাবাজি’র পর আমার ওপরও দর্শক আস্থা রাখে, সেটাও আমি জানি। পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন কমেন্টসে সেটা দেখতে পাই। ‘আয়নাবাজি’র পরই আমার এই ছবিটা। আগের ছবির দর্শকের একটা বড় অংশ ছবিটা দেখতে আগ্রহী হবে। দুই বাংলা মিলিয়ে জয়ার অ্যাচিভমেন্টের জায়গাও অনেক। দুই বাংলার সেরা অভিনেত্রীদের একজন। ওর কারণেও কিছু দর্শক আসবে। হলে আসার পর ছবিটা দর্শকের ভালো লাগবে। অনম বিশ্বাসের নির্মাণভাবনা খুবই আধুনিক। ‘মনপুরা’র সিনেমাটোগ্রাফার খসরু ভাই আছেন, তিনি বাংলাদেশের ওয়ান অব দ্য বেস্ট। সাউন্ড থেকে শুরু করে কারিগরি দিকের যতটা দেখেছি, মনে হয়েছে আমাদের চলচ্চিত্রকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেবে এই ছবি। চেনা একটা গল্প, কিন্তু চমৎকার উপস্থাপনা দর্শককে চমকে দেবে।

 

সহশিল্পী ও প্রযোজক হিসেবে জয়া আহসান কেমন? ১০-এ কত মার্কস দেবেন?

প্রযোজক হিসেবে ওকে কখনো কাউন্ট করিনি। কারণ প্রযোজকসুলভ কর্তৃত্ব ও কখনো ফলাতে যায়নি। আমরা আগে একসঙ্গে বেশ কিছু নাটক করেছি, সিনেমায় এই প্রথম। আমার বিবেচনায় ও সহশিল্পী। আর প্রযোজক হিসেবে যে দায়িত্বগুলো পালন করা দরকার, সেটা সে পালন করেছে। একটা সত্তার সঙ্গে আরেকটার ক্ল্যাশ হয়নি। আর কত মার্কস দেব? নাম্বারটা না বলি। সর্বোচ্চটাই ধরে নিন।

 

মিসির আলীর কথা মনে হলে পঞ্চাশোর্ধ্ব কারো ছবি চোখে ভাসে। আগে টিভি নাটকে আবুল হায়াত, আবুল খায়েররা হয়েছেন মিসির আলী। চরিত্রটা রূপায়ণ করার জন্য নিজেকে কিভাবে তৈরি করেছেন?

কারো বায়োপিক হলে দর্শক ওই মানুষটার সঙ্গে অভিনেতাকে মেলানোর চেষ্টা করবে। যখন একটা উপন্যাসের চরিত্র রূপায়ণ হয়, ‘দেবদাস’-এর কথাই বলি : দীলিপ কুমার, উত্তম কুমার, বুলবুল আহমেদ দেবদাস হয়েছেন, শাহরুখ খানও করেছেন। একজনের সঙ্গে কি আরেকজনের চেহারার মিল আছে? তাহলে মিসির আলীর ক্ষেত্রে কেন আবুল হায়াত ও আবুল খায়েরকে মিলিয়ে ফেলব! হায়াত ভাই বা আবুল খায়ের সাহেব—উনারা অনেক বড় অভিনেতা। দুজনেরই চেহারার আলাদা আলাদা আদল। উনারা সেটা নিয়েই চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চেয়েছেন। আমিও চেষ্টা করেছি। চরিত্রটার জন্য নিজের হাঁটাচলা, ভয়েস—সবই বদলে ফেলেছি। ‘আয়নাবাজি’ যদি দেখে থাকেন, দেখবেন ছবির প্রতিটা চরিত্রের জন্যই আলাদা আলাদা ভয়েস ব্যবহার করেছি। ‘দেবী’তেও তাই।

 

মিসির আলী ছাড়া ‘দেবী’র আর কোন চরিত্রটা আপনার পছন্দের? সুযোগ থাকলে ওই চরিত্রটাও করতে চাইতেন?

অবশ্যই রানু। মেয়ে হলে ওটাই করতে চাইতাম। আরেকটা হচ্ছে সাবের, যেটা ইরেশ যাকের করেছে। চরিত্রটার মধ্যে অনেক ডাইমেনশন আছে, নেগেটিভ ক্যারেক্টার যদিও।

 

ছবির একটা দৃশ্যের বর্ণনা দিন, যেটি আপনার চোখে অসাধারণ।

অসাধারণ কথাটা আমি কখনো বলতেই চাই না, অন্তত নিজের অভিনয় নিয়ে। ‘দেবী’ সম্পর্কে তো এখন বলতেই পারব না। রিলিজের পর ৫-১০ বার দেখে হয়তো বলতে পারব। মিসির আলীর প্রতিটা লাইনে আমরা এত বেশি ইনপুট দেওয়ার চেষ্টা করেছি, প্রতিটা দৃশ্যই এই মুহূর্তে ভালো। রিলিজের পর বাকিটা বোঝা যাবে। দর্শকই বিচার করুক কোন অংশ তাদের বেশি ভালো লেগেছে।

 

গা শিরশির করে উঠেছিল

শবনম ফারিয়া

অভিষেক ছবি হিসেবে ‘দেবী’ নিয়ে আপনি কতটা হ্যাপি?

খুব ভালো কিছু না হলে ছবি করার প্ল্যানই ছিল না। আবার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ফিল্ম, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ফিল্ম করার ইচ্ছা। ‘দেবী’র আগেও অনেক প্রস্তাব এসেছিল, আগ্রহ দেখাইনি। ‘দেবী’র বিষয়টা আলাদা—হুমায়ূন আহমেদ স্যারের গল্প, সরকারি অনুদানের ছবি, অনম বিশ্বাস ডিরেক্টর এবং জয়াপু। আমার কাছে মনে হয়েছে, ভালো একটা কিছু হতে যাচ্ছে। শুরুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাতে বাকি জার্নিটা সহজ হয়। ‘দেবী’র চেয়ে ভালো কোনো স্টার্ট আমার হতে পারত না। অনেকেই বলেন, তুমি কেন সাপোর্টিং রোল দিয়ে শুরু করলে? একটা ভালো ছবির অংশ হওয়াটাই আসল। চরিত্রটার কতটা ইমপ্যাক্ট আছে, ফিল্মে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

হুমায়ূন আহমেদ আপনার প্রিয় লেখক, অভিনয়ের আইডল জয়া আহসান—‘দেবী’ সাইন করার সময় কার কথা ভেবে বেশি উচ্ছ্বসিত ছিলেন?

জয়াপুর সঙ্গে কাজ করার লোভটা বরাবরই বেশি ছিল। তবে ফিল্ম করার ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের গল্পটাই প্রধান কারণ। সেভেন-এইট থেকেই তাঁর বিশাল ভক্ত। তাঁর গল্পে তিন-চারটা নাটক করেছি। আমাকে ডিরেকশন দেওয়ার সময় শাওন আপার [মেহের আফরোজ শাওন] খুব একটা কষ্ট হতো না। কারণ চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় আগে থেকেই। হুমায়ূন আহমেদের গল্পটাই এই ফিল্মে কাজ করার প্রধান কারণ।

 

প্রথমবার চলচ্চিত্রে অভিনয়, পার্থক্য কী পেলেন?

তেমন কোনো পার্থক্য পাইনি। চঞ্চল ভাই, ইরেশ যাকের ভাইয়ের সঙ্গে আগেও অভিনয় করেছি। চিত্রগ্রাহক খসরু ভাইয়ের সঙ্গে বিজ্ঞাপনচিত্র করেছি। এনভায়রনমেন্টে ও রকম কোনো পার্থক্য আমার কাছে লাগেনি। পার্থক্যটা অন্য জায়গায়। বাজেট ও সময়ের কারণে আমরা দুই দিনে একটা নাটক বানাই। ছোট ছোট বেশ কিছু ছাড় দিতেই হয়। একটা রুমে হয়তো ঠিকঠাক লাইট করা সম্ভব হয়নি, তবু চালিয়ে নিই। ফিল্মে এই ছাড় দেওয়ার সুযোগই নেই। এটাই পার্থক্য।

 

নিলু ছাড়া ‘দেবী’র আর কোন চরিত্রটার প্রতি আপনার লোভ হয়? সুযোগ পেলে সেটাও করতেন?

সবগুলো চরিত্রই লোভনীয়। অবশ্যই রানু করতে চাই। যেকোনো অভিনেত্রীর স্বপ্নের একটা চরিত্র। ছেলে হলে বলতাম মিসির আলীর কথা।

 

ছবির একটা দৃশ্যের বর্ণনা দিন, যেটি আপনার চোখে অসাধারণ।

একেবারে লাস্ট সিন, যেখানে দেখানো হয়, নিলুকে খুন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রানু সেটা ফিল করতে পারে। নিলুকে যেখানে নিয়ে টর্চার করা হয়,  জায়গাটা এত ভয়ানক ছিল, সেটে ঢুকতেই আমার গা শিরশির করে উঠেছিল। টানা দুই দিন শুটিং করেছি আমরা। পুরো ছবিরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য এটা।

 

জয়া আমার ছোটবেলার বন্ধু

অনিমেষ আইচ

‘দেবী’ করতে গিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, অভিনয় না করে ছবিটা পরিচালনা করলে বেশি ভালো হতো?

নাহ্! একবারও না।

 

হুমায়ূন আহমেদের গল্পে আপনি বেশ কয়েকটি টিভি নাটক বানিয়েছেন আগে। চলচ্চিত্রের জন্য লেখকের কোন গল্পটা আপনার বেশি পছন্দ?

সায়েন্স ফিকশন ‘নৃ’। গ্রামের আধিভৌতিক একটা গল্প।

 

জয়া আহসানের সঙ্গে বেশ রোমান্টিক গানে অভিনয় করেছেন। গান, রোমান্স ও সহশিল্পী—অভিজ্ঞতা কেমন?

জয়া খুব ভালো বন্ধু। আমার পরিচালনায় ২০টারও বেশি নাটকে অভিনয় করেছে সে। আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের কী আছে! ও তো আমার ছোটবেলার বন্ধু। গানের সঙ্গে যে দৃশ্যগুলো দেখেছেন, শুটিংয়ের সময় কোনো গান বাজানো হয়নি। গানটা তখনো রেকর্ডই করা হয়নি। ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’ যদি দেখতেন, তাহলে বুঝতেন আমরা কী করেছি! আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল এভাবে ঘোরো, এটা করো-সেটা করো—এভাবেই শট নেওয়া হয়েছিল।

 

‘দেবী’র আনিস চরিত্র বাদে আর কোন চরিত্রটির প্রতি আপনার লোভ হয়? সুযোগ পেলে সেটাও করতেন?

লোভ না, আমার মনে হয়, মিসির আলী আমাকে দেওয়া উচিত ছিল। আমার চেহারাই তো মিসির আলীর মতো। হা হা হা, দুষ্টুমি করলাম। ভবিষ্যতে কোনো পরিচালক যদি মিসির আলী করার প্রস্তাব দেয়, করব। ‘দেবী’তে চঞ্চল ভাই খুব ভালো করেছেন আর এই চরিত্র উনিই ডিজার্ভ করেন।

 

ছবির এমন একটি দৃশ্যের বর্ণনা দিন, যেটা আপনার চোখে অসাধারণ।

ছবির শেষের দিকের একটি দৃশ্য, আনিস আর রানু দুজনই তখন অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস করে। দৃশ্যটাতে এত মনোযোগ দিতে হয়েছিল যে আমার মাথা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল! একজন পরিচালক হিসেবে আমি বুঝি, ফিলে না থাকলে কাজটা হবে না ভালোমতো। চরিত্রের দুঃখ-বেদনাটা ফিল করতে গিয়েই মাথা ব্যথা শুরু হয়েছিল। দৃশ্যটা বেশ কঠিনও ছিল!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা