kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ঢাকাই ছবির ফেরারি পরিচালকরা

চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সদস্যসংখ্যা এখন প্রায় ৩৫০। কিন্তু এই সময়ে ছবি নির্মাণ করছেন হাতে গোনা কয়েকজন; বাকি সবাই বেকার। এর মধ্যে বেশির ভাগই ফিরে গেছেন নিজ গ্রামে। কেউ আবার পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশেও। এ রকম পাঁচ জনপ্রিয় পরিচালককে নিয়ে লিখেছেন সুদীপ কুমার দীপ

১৯ মে, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকাই ছবির ফেরারি পরিচালকরা

নামের অপমান করে তো লাভ নেই

তমিজ উদ্দীন রিজভী

চলচ্চিত্রের প্রতি মায়া এখনো আছে। তবে কিছুটা ক্ষোভও জন্মেছে। এ কারণেই এফডিসি যান না। সময় এখন টিভি দেখে কাটে। ‘কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা হলে বন্ধুদের নিয়ে বের হই। বিকেলে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে থাকি। এই ক্লাবের ইসি কমিটির সদস্য আমি। বেশ কিছু দায়িত্বও আছে। এই দায়িত্ব পালন করতে করতেই সময় কেটে যায়’—বললেন রিজভী।

‘ছোট মা’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘আশীর্বাদ’, ‘জেলের মেয়ে’র মতো ছবি বানিয়েছেন একসময়। অথচ এখনকার প্রযোজকরা আসেন নামমাত্র বাজেট নিয়ে, এটা মানতেই পারেন না। ‘গানের পেছনেই খরচ করতাম ৫০ লাখ টাকা, মার্কেটিংয়ে খরচ করতাম ১০ লাখ টাকা। আর এখন পুরো ছবির বাজেট নাকি ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা! কিভাবে হবে ছবি? তার চেয়ে বাসায়ই বসে থাকি। শুধু শুধু নামের অপমান করে তো লাভ নেই।’ ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায় রিজভী পরিচালিত শেষ ছবি ‘জবাব চাই’।

 

ভুলে মুখ থেকে অ্যাকশন কাট বের হয়

বাদল খন্দকার

‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘বিশ্বনেত্রী’, ‘মধুর মিলন’, ‘পৃথিবী তোমার আমার’, ‘সাগরিকা’সহ বেশ কিছু ব্যবসাসফল ছবির পরিচালক বাদল খন্দকার। প্রযোজনাও করতেন। তবে ‘বিদ্রোহী পদ্মা’র পর আর চলচ্চিত্রে নেই। এখন থাকেন রংপুরে, একটি অটো রাইস মিল দিয়েছেন। ১০০ টন ক্যাপাসিটির এই মিল নিয়েই এখন তাঁর যত ব্যস্ততা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কুড়িগ্রাম থেকে জাতীয় পার্টির নমিনেশন পেয়েছিলেন। পরে অবশ্য মনোনয়নপত্র তুলে নেন। চলচ্চিত্র ছাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে অশ্লীলতাকেই দায়ী করলেন, শিল্পী সংকটকেও বড় করে দেখতে চান। বলেন, ‘আমাদের সময় শাবনূর, মৌসুমী, সালমান শাহ, ওমর সানীসহ অন্তত ১০ জন তারকা ছিলেন। আর এখন হাতে গোনা এক-দুজন। এ অবস্থায় চলচ্চিত্র নির্মাণ কিভাবে সম্ভব!’ তবে আবারও চলচ্চিত্রে ফিরতে চান বাদল, ‘এখনো মনের ভুলে মুখ থেকে অ্যাকশন-কাট বের হয়। এই মায়া কাটানো অত সহজ নয়।’

 

স্বপ্ন দেখি, আমি ক্যামেরার পেছনে

শওকত জামিল

চার বছর ধরে কুষ্টিয়ায় আছেন এই পরিচালক। এখন হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। ঢাকা ছাড়ার পর চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই। চিকিৎসার জন্য মাঝেমধ্যে ঢাকায় এলেও দেখা হয় না সহকর্মীদের সঙ্গে। শেষ ছবি মুক্তি পায় ২০১২-তে—‘যেখানে তুমি সেখানে আমি’। এরপর আর কোনো ছবি নির্মাণে হাত দেননি পরিচালক সমিতির সাবেক এই সভাপতি। বলেন, ‘চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে অন্য কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত হইনি। কিন্তু কে জানত, একদিন সাধের চলচ্চিত্র তার সুদিন হারাবে। আমাদের মতো পরিচালকদের ফিরে আসতে হবে গ্রামে! মনে পড়লেই চোখ ভিজে যায়। এখনো ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি, আমি ক্যামেরার পেছনে। অভিনয় করছেন বড় বড় সুপারস্টাররা। জানি, এই দিন আর ফিরে আসার নয়। তার পরও মন বোঝে না।’ শওকত জামিলের ব্যবসাসফল ছবির মধ্যে অন্যতম ‘প্রেমের বাজি’, ‘শেষ রক্ষা’, ‘দরদি সন্তান’।

 

চলচ্চিত্রে আর সুদিন ফিরবে না

মনতাজুর রহমান আকবর

৫৪টি ছবির পরিচালক তিনি। এর মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবসাসফল। ‘চাকর’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘কুলি’, ‘ডিসকো ড্যান্সার’, ‘শান্ত কেন মাস্তান’, ‘খলনায়ক’—এসব ছবির কথা এখনো প্রযোজক-পরিবেশকদের মুখে-মুখে। অথচ সেই আকবর এখন বগুড়া শহরে একটি ফার্নিচারের দোকান দিয়েছেন। বেশির ভাগ সময় কাটান সেখানেই। বললেন, ‘চলচ্চিত্রের বর্তমান দশার জন্য দায়ী প্রযোজক-পরিবেশক। তাঁরা একসময় বলতেন, ছবিতে দিলদার না থাকলে চলবে না। এরপর নিলেন ময়ূরী-মুনমুনের নাম, আর এখন শাকিব খান। অথচ পরিচালকদের কোনো মূল্যায়নই করেন না তাঁরা। টাকা হলেই আগে শিল্পীর শিডিউল নেন। গল্প প্রস্তুত করে পরিচালক ডাকেন। তাহলে ছবি নির্মিত হবে কিভাবে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, চলচ্চিত্রে আর সুদিন ফিরবে না। ইন্ডাস্ট্রি এখন শিল্পীদের হাতে জিম্মি।’ আকবরের পরিচালনায় শেষ ছবি মুক্তি পায় গত বছর—‘আগে যদি জানতাম তুই হবি পর’।

 

নায়িকারাই তাঁদের দিয়ে ছবি বানায়

উত্তম আকাশ

টরন্টোতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। সেখানে একটি কম্পানিতে চাকরি করেন। কখনো ডে শিফটে, আবার কখনো নাইট শিফটে দায়িত্ব পড়ে। বছরে এক-দুবার দেশে আসেন। ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘কে অপরাধী’, ‘ঢাকাইয়া পোলা বরিশাইলা মাইয়া’, ‘ভালোবাসা দিবি কি না বল’সহ অনেক ব্যবসাসফল ছবির পরিচালক তিনি। এ বছরও তাঁর পরিচালনায় ‘রাজা ৪২০’ মুক্তি পেয়েছে। মুক্তিপ্রতীক্ষিত আছে ‘এক জবানের জমিদার হেরে গেলেন এইবার’। এরপর? ‘চলচ্চিত্রের অবস্থা এখন ভালো নয়। আমরা যারা নিয়মিত কাজ করতাম, তারা বেকার হয়ে গেছি। মেধাবী কেউ এখন আর কাজ পায় না। প্রযোজকরা হয়ে গেছেন নায়িকানির্ভর। নায়িকারাই তাঁদের দিয়ে ছবি বানায়। কে পরিচালক হবেন, কে অভিনয় করবেন, সেটাও নিয়ন্ত্রণ করে তারা। এ জন্যই দেশ ছেড়েছি। পরিস্থিতি পাল্টালে আবার ফেরার ইচ্ছা আছে। কত দিন অপেক্ষা করতে হবে কে জানে!’

 



সাতদিনের সেরা