kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

ঐ দেখা যায় পদ্মা, ঐ আমাদের সেতু

দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে এত দিন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল সর্বনাশা পদ্মা। কাল থেকে আবার এক হবে পদ্মার এপার-ওপার। বহু কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শোবিজের পদ্মাপারের তারকারা জানিয়েছেন তাঁদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কথা। শুনেছেন ইসমাত মুমু

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঐ দেখা যায় পদ্মা, ঐ আমাদের সেতু

দেখলেই বুকটা ভরে যায়

তানভীন সুইটি, অভিনেত্রী

আমার দাদাবাড়ি গোপালগঞ্জ। ছোটবেলায় ঢাকা থেকে দাদাবাড়িতে যাওয়ার জন্য খুব ভোরে রওনা হতাম। যেতে হতো লঞ্চে। পদ্মা সেতু হওয়ার পর এখন হয়তো দুই-তিন ঘণ্টায় পৌঁছতে পারব।

বিজ্ঞাপন

একবার আমার এক বোনজামাই অসুস্থ হয়েছিলেন। তাঁকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হবে। আমরা তো দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, ফেরিঘাটে যে জ্যাম হয়, বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সেটা কাটিয়ে তাঁকে জীবিত ঢাকা নিয়ে আসা সম্ভব হবে কি না। এখন এ রকম দুশ্চিন্তার অবসান হলো।

পদ্মা নদীর ওপর সেতু হবে, দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে ছিল এটা একটা অসম্ভব কল্পনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের সেই স্বপ্নটা দেখিয়েছেন এবং সত্যি করেছেন। এখন রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এসব অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করবে। বিনিয়োগ বাড়বে। কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবেন। তাঁদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে পারবেন। পণ্যের ভালো দামও পাওয়া যাবে। এই সেতুর কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে।

এরই মধ্যে কয়েকবার সেতুটা দেখে এসেছি। কমপ্লিট হওয়ার পরও গিয়েছি। দেখলেই বুকটা ভরে যায়। ইচ্ছা আছে, উদ্বোধনের পর আমার ভাই-বোনের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরতে যাব।

 

এটা তো আমাদের কাছে অষ্টম আশ্চর্য

মীর সাব্বির, অভিনেতা-পরিচালক

দক্ষিণবঙ্গের নিচু এলাকা বরগুনা জেলা। সেখান থেকে একসময় আমার বাপ-দাদারা দেড়-দুই দিনে ঢাকায় এসেছেন। তাঁরা তো ঢাকা আসতেই চাইতেন না। একবার আমার দাদা ধানমণ্ডিতে জমি কিনতে এসেছিলেন। তখন নাকি এখানে সব ধানি জমি। তো উনি বললেন, এই জমি তো আমাদের এলাকাতেই আছে, সেখানে কিনব। পদ্মা সেতুর সুবাদে বরগুনা এত কাছে হয়ে গেছে যে আমার ছেলেরা হয়তো এখন দাদার এলাকায় জমি কিনবে। ওরা ঢাকায় বড় হয়েছে। কিন্তু ওই যে যাওয়ার ঝামেলা সেটা থাকবে না। গাড়ি টান দিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবে। বরগুনার মানুষও এখন সকালে রওনা দিলে হয়তো একটা কাজ শেষ করে রাতে আবার বাড়ি ফিরতে পারবে।

আমি ২৮ তারিখ আমেরিকা যাব। আমার ‘রাত জাগা ফুল’ ছবির স্ক্রিনিং আছে সেখানে। আমেরিকা থেকে ফিরে পরিবার নিয়ে পদ্মা সেতু দেখতে যাব। এটা তো আমাদের কাছে অষ্টম আশ্চর্য। এই জীবনে আমি হ্যালির ধূমকেতু দেখলাম, সিডর, করোনা দেখলাম। কত খারাপ দিন বাংলাদেশের এসেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের একটু বেশিই লড়াই করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী যেন দক্ষিণবঙ্গের সব দুঃখ এক নিমেষে এই পদ্মা সেতু দিয়ে দূর করে দিলেন। তাঁর এই ঋণ দক্ষিণবঙ্গের মানুষ কোনো দিন শোধ করতে পারবে না।

 

বাবা-চাচারা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না সেতুর কথা

জায়েদ খান, অভিনেতা

পিরোজপুরে বসে আমাদের বাবা-চাচারা কত আক্ষেপ করেছেন এই পদ্মা নিয়ে। তাঁরা ভেবেই নিয়েছিলেন এটাই হয়তো তাঁদের কপাল। পদ্মায় সেতু হবে সেটা হয়তো তাঁরা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। সেই স্বপ্ন আমরা দেখতে পেরেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য। স্বপ্নের বাস্তবায়নও হয়েছে। আর সেটা মাত্র এই কয় বছরেই! অনেক সময়ই দেখেছি, কোনো রোগীকে ঢাকায় নিয়ে আসতে কতজনকে কত দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই ফেরিতে চাপ থাকে। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ফেরি বন্ধও রাখতে হয়। কত দুর্ঘটনা যে ঘটেছে লঞ্চে বেশি যাত্রী নেওয়ার কারণে। এখন লঞ্চ-ফেরির ওপর চাপ কমবে।

আমি যখনই বাড়ি যেতাম, দেখতাম সেতুর কাজ কতটুকু হয়েছে। পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো নিউজ হলেই পড়ার চেষ্টা করতাম। খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। কত মানুষ কত কথা বলেছে, পদ্মা সেতু হওয়া সম্ভব না। আমি সৌভাগ্যবান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছি। অবশ্যই এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করব। আগে যোগাযোগের জটিলতার কারণে অনেকে এই এলাকায় শুটিং করতে চাইতেন না, এখন সেটা সম্ভব হবে।

 

এখন খুলনাও ইকোনমিক্যাল জোন হয়ে যাবে

জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া, অভিনেত্রী

আমার বাড়ি খুলনা। পদ্মা সেতু আমাদের জন্য বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট। কেউ ভাবতেই পারত না এ রকম বড় একটা প্রজেক্ট বিদেশি সহায়তা ছাড়া আমরা করতে পারব। এখন আমরা বলতে পারছি, আমাদের টাকায় সেতুটা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, টাকা থাকলেই সব কিছু হয় নয়। এক্সিকিউট করার মনমানসিকতা লাগে। সাহস বা কনফিডেন্স লাগে। শত বাধার মুখেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটা করে দেখিয়েছেন। হ্যাটস অফ টু হার।

আমি এখনো পদ্মা সেতু দেখতে পারিনি। উন্মুখ হয়ে আছি কবে দেখতে যাব। অন্য দেশের শহরগুলো কতটা উন্নত সেটা বুঝতে পারবেন তাঁদের রাস্তাঘাট, যোগাযোগব্যবস্থা দেখে। মনে হচ্ছে, আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি। ১৪ বছর আগে যখন ঢাকা এসেছিলাম, মহাখালী ফ্লাইওভারটাও ছিল না। চোখের সামনে ঢাকার ইমপ্রুভমেন্টগুলো দেখছি। আমাদের সবচেয়ে বড় স্থাপনা পদ্মা সেতুও হয়ে গেল।

বাণিজ্যিকভাবেও যদি দেখি, ওই দিকে মোংলা পোর্টও আছে। এখনো আমরা ইকোনমিক্যাল জোন বলতে চট্টগ্রামকে বুঝি। এখন খুলনাও সেটা হয়ে যাবে। এত স্বপ্নের পদ্মা সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে যত্নশীল হতে হবে।

 

দিনে দিনে শো করে আবার ফিরে আসতে পারব

জাকিয়া সুলতানা কর্ণিয়া, গায়িকা

এত দিন ফেরি দিয়েই যেতে হতো। অনেক সময় ফেরি পার হতেই সাত-আট ঘণ্টা লেগে যেত। ঈদের সময় তো কথাই নেই। অনেক দিন ধরেই তো স্বপ্ন দেখছিলাম কবে সেতু হবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে সেটা ছিল কল্পনার অতীত। মনে হয় এই তো কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছিল কাজ। অন্যের সাহায্য ছাড়াই আমরা এমন একটা সেতু করতে পেরেছি এটা আমাদের কাছে অনেক গর্বের ব্যাপার। অনেক কথা উঠেছে, কত রিউমার শুনেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটা সম্ভব হয়েছে। এখন আর পদ্মাপারের কোনো শোতে উপস্থিত থাকার জন্য আগের দিন যেতে হবে না। দিনে দিনে শো করে আবার ফিরে আসতে পারব।

আমার অসুস্থ দাদাকে একবার ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। অর্ধেকটা পথ আসার পরই তিনি মারা যান। কিছুদিন আগে আমার খালুর অবস্থাও খারাপ হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে ঢাকায় আসতেও অনেক সময় লেগেছিল। খুব টেনশনে ছিলাম আমরা। এখন কেবল চিকিৎসাসেবাই নয়, পদ্মা সেতু সামগ্রিকভাবে আমাদের অঞ্চলের মানুষের অনেক সমস্যা মিটিয়ে দেবে।

 



সাতদিনের সেরা