kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

একেই বলে শুটিং!

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে ‘রাস্ট’ ছবির শুটিং চলার সময় ঘটেছে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা। অভিনেতা অ্যালেক বল্ডউইনের প্রপ বন্দুক থেকে চালানো গুলিতে মারা যান সিনেমাটোগ্রাফার হ্যালিনা হাচিন্স, আহত হয়েছেন পরিচালক জোয়েল সুজা। চলচ্চিত্র দুনিয়া এই ঘটনায় তোলপাড়। তবে সিনেমার সেটে এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। শুটিংয়ে উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা, নিরাপত্তাবিধি, বলিউড যোগ ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন লতিফুল হক ও সুদীপ কুমার দীপ

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একেই বলে শুটিং!

সেদিন যা হয়েছিল

নিউ মেক্সিকোর বানানজা ক্রিক র‌্যাঞ্জে চলছিল উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে ওয়েস্টার্ন ঘরানার ছবি ‘রাস্ট’-এর শুটিং। ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন এমি, গোল্ডেন গ্লেবা ও সেগ পুরস্কারজয়ী অ্যালেক বল্ডউইন। তিনি ছবির অন্যতম প্রযোজকও বটে। ২১ অক্টোবর স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় মূল শুটিং শুরুর আগে বল্ডউইন বন্দুক চালানোর অনুশীলন করছিলেন। একবার তিনি ক্যামেরা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার ভান করেন। কিন্তু বিধি বাম! সত্যি সত্যি গুলি চলে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সিনেমাটোগ্রাফার হ্যালিনা হাচিন্স ও পরিচালক জোয়েল সুজা। সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টারে করে দুজনকে নিউ মেক্সিকো হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিচালক প্রাণে বেঁচে গেলেও হাচিন্সকে বাঁচানো যায়নি। আকস্মিক এই ঘটনায় পরিচালক-প্রযোজক গিল্ড হতভম্ব হয়ে পড়েন, সিনেমা সেটে নিরাপত্তা নিয়ে দেখা যায় নতুন প্রশ্ন। ঘটনার এক দিন পরে টুইটারে ঘটনা নিয়ে মুখ খোলেন বল্ডউইন, ‘মর্মান্তিক এই ঘটনা নিয়ে বলার ভাষা নেই। হ্যালিনা হাচিন্স যে একজন স্ত্রী, একজন মা, আমাদের সহকর্মী; তাঁকে হারিয়েছি। তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমি নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রাখছি, পুলিশকে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছি।’ ঘটনার পর অনেকে অভিনেতাকে দায় দিলেও হাচিন্সের বাবা ও স্বামী বল্ডউইনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অভিনেতা নিজের সব ছবির শুটিং স্থগিত করেছেন। ইউক্রেনিয়ান সিনেমাটোগ্রাফার হাচিন্সকে এই সময়ের হলিউডের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল মনে করা হতো। তিনি ৩০টির বেশি সিনেমা ও টিভি সিরিজে কাজ করেছেন।

 

সমস্যা কোথায়

দুর্ঘটনার পর পুলিশের কাছে বল্ডউইন বলেছেন, সহকারী পরিচালক তাঁকে জানিয়েছিলেন বন্দুক ফাঁকা, সে জন্যই তিনি নিশ্চিন্ত মনে গুলির অনুশীলন করছিলেন। এই সহকারী পরিচালক ডেভ হলসের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে নিরাপত্তাবিধি না মানার অভিযোগ আগেও ছিল। ২০১৯ সালে স্ট্রিমিং সাইট হুলুর সিরিজ ‘ইনটু দ্য ডার্ক’-এর শুটিংয়ের সময় তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাহী প্রযোজক বরাবর অভিযোগও গিয়েছিল। কিন্তু তখন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুটিং সেটে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ, নানা ধরনের সতর্কতাবিধি মানার পরও বিপদের আশঙ্কা থাকে। কারণ প্রপ বন্দুকে আসল বুলেট না থাকলেও ফাঁকা কার্তুজে বিস্ফোরক ভরা থাকে। যেমন—১৯৮৪ সালে মার্কিন অভিনেতা জন এরিক হেক্সাম টিভি অনুষ্ঠানে রিভলভারে ফাঁকা কার্তুজ ভরে নিজের মাথায় বন্দুক তাক করে গুলি চালান। পরে তিনি মারা যান। বুলেট না থাকলেও বারুদের বিস্ফোরণ এতই শক্তিশালী ছিল যে হেক্সাম বাঁচতে পারেননি। কাছ থেকে সরাসরি শরীরে লাগলে, যা যেকোনো বিপদ ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় দৃশ্য আরো বিশ্বাসযোগ্য করতে শুটিংয়ে সত্যিকারের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ফাঁকা গুলি করা হয়।

চলচ্চিত্রে অস্ত্র ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ মাইক ট্রিস্টানো আগে অ্যালেক বল্ডউইনের সঙ্গেও কাজ করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘প্রতিটি সেটেই অস্ত্র ব্যবহারের কঠোর নিয়ম থাকে। সেটে যেকোনো বন্দুক, এমনকি সেটা নিষ্ক্রিয় বন্দুক হলেও কোনো মানুষকে তাক করে সেটা চালানোর নিয়ম নেই। তাই একেবারেই বুঝতে পারছি না এবারের ঘটনাটি কিভাবে ঘটল। গুলিই বা প্রাণঘাতী হলো কেন। বিশেষজ্ঞরা সিনেমা সেটে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে থাকেন, কিভাবে ব্যবহার করতে হবে সেই পরামর্শও দেন।’

তবে অনেকে বললেন, আধুনিক যুগে সেটে গোলাগুলিরই কোনো যৌক্তিকতা নেই। অভিনেতা ও পরিচালক ক্রেগ যোবেল বলেন, ‘সেট এখন ফাঁকা কার্তুজ ভরা বন্দুক বা অন্য ধরনের বন্দুক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এগুলো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত। কারণ এখন খুবই কম খরচে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বন্দুক চালানোর ইফেক্ট তৈরি করা সম্ভব।’

 

সতর্কতার বার্তা কঙ্গনার

‘রাস্ট’-এর দুঃখজনক ঘটনার জন্য সবার মতো দুঃখিত বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াতও, ‘এটা খুবই মর্মান্তিক। ছবির সেটে বিপজ্জনক স্টান্ট পারফরম করতে হয়, অস্ত্রের ব্যবহার হয়, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, সামান্য ভুল প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।’ হলিউডের ঘটনার পর বলিউডকে সতর্ক হওয়ার তাগিদ দেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া অভিনেত্রী। ‘প্রতিবছরই অনেক স্টান্টম্যান, কলাকুশলী আহত বা নিহত হন, যা খুবই দুঃখজনক এবং হতাশার। ভারতের চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িতদের উচিত যুগোপযোগী অ্যাকশন প্রটোকল তৈরি করা এবং সেটার সঠিক বাস্তবায়ন করা।’

 

বাংলাদেশে কী অবস্থা

ঢাকাই চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ছবির পরিচালক দীপংকর দীপন। তাঁর প্রথম ছবি ‘ঢাকা অ্যাটাক’, মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘অপারেশন সুন্দরবন’ ও ‘অন্তর্জাল’। দীপন মারপিটের দৃশ্যে সত্যিকারের বন্দুক বা পিস্তল ব্যবহার করেন সব সময়। তবে এটাকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি, ‘আমরা প্রযুক্তির অভাবে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে কখনো ডামি ব্যবহার করতে পারি না। অরিজিনাল পিস্তল, বন্দুক বা ছুরি ব্যবহার করতে হয়। প্রতিটি দৃশ্যের আগে আমি নিজে পিস্তলগুলোর ম্যাগাজিন পরীক্ষা করি। তবে শুটিংয়ে অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে সব দিকে খেয়াল করা হয় না। হলিউডে যে ঘটনা ঘটেছে, এটা অকল্পনীয়। তারা যেভাবে নিরাপত্তা নিয়ে শুটিং করে সেখানেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, আমাদের কী হবে! আমাদের আরো সতর্ক হতে হবে।’



সাতদিনের সেরা