kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

হাসিটুকু থাক

দাউদ হোসাইন রনি

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পর্দার ‘সখী’, ‘চিনি’, ‘তাহমিনা’ রূপে কী মিষ্টি তিনি! যেমন কথায় তেমন চাহনিতে বা তাঁর হাসিতে। একেবারে পাশের বাড়ির মন-ভোলানো সেই মেয়েটা যেন! বাস্তবে কিন্তু তিনি ছিলেন ভীষণ ঠোঁটকাটা। নিরেট সত্য মুখের ওপর বলে দিতেন। যেকোনো প্রসঙ্গে কথা বলতেন দুই মূর্তিতে। প্রথমে চাঁছাছোলা কণ্ঠে নগদ সত্যটা বলে নিতেন। সামনে কে আছেন রাজা, নাকি উজির, থোড়াই কেয়ার করতেন। হাসিমুখেই কথার ভাঁজে লুকানো ছোরা দিয়ে ঘায়েল করতেন। ট্রেডমার্ক হাসিটা মুখে লেগে থাকত বলে অনেক সময় সামনের শ্রোতা বুঝে উঠতে পারত না কথার তীরে কবরী তাকে ঠিক কতটা ঘায়েল করেছেন। শ্রোতার মতিগতি বুঝে পরক্ষণেই পর্দার সেই মিষ্টি কবরী হয়ে যেতেন। তখন কথা বলতেন একেবারে মোলায়েম স্বরে, যেন রোমান্টিক কোনো দৃশ্যের শুটিং করছেন, ওপাশে তাঁর নায়ক রাজ্জাক বা ফারুক।

সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকারা সচরাচর ঠোঁটকাটা হতে পারেন না। কবরী পেরেছেন। কারণ তাঁর ভেতরে একটা অপ্রাপ্তির অভিমান ছিল। অপ্রাপ্তিটা যে কিসের সেটাও খুলে বলতেন না, তিনি চাইতেন অন্যরা যেন সেটা আবিষ্কার করে নেয়। ধরতে না পারলে বা কেউ পাশ কাটিয়ে গেলে তাঁর অভিমান যেত বেড়ে। তিনি তখন একেবারে কিশোরী হয়ে যেতেন।

গত বছরের জুলাইয়ে তাঁর ৭০ বছর পূর্ণ হলো। কবরীকে নিয়ে বিশেষ আয়োজনের প্রস্তুতি নিল রঙের মেলা। তখন ঘোর করোনাকাল। কলেবর হারিয়ে কালের কণ্ঠ’র সাপ্তাহিক বিভাগটি এক পৃষ্ঠায় নেমে এলো। মাত্র এক পৃষ্ঠায় অন্য আয়োজনের পাশাপাশি ৫৬ বছরের সমৃদ্ধ অভিনয় ক্যারিয়ারের কবরীকে ধারণ করা সম্ভব হলো না। যথারীতি তিনি অভিমান করলেন, তবে করোনা বাস্তবতাও মেনে নিলেন। কথা দিলেন এবং নিলেন, করোনা বাস্তবতার বলি না হলে প্লাটিনাম জয়ন্তীর [৭৫ বছর] বিশেষ আয়োজনে তিনি কথার বোমা ফাটাবেন।

গত বছরের জুলাইয়ের পর কবরী আবিষ্কার করলেন, তাঁর অভিমানের কারণটা এই অধম [প্রতিবেদনের লেখক] জানে। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এই ধারণাটা তাঁর হয়েছে। ১৪ বছর পর তিনি ছবি পরিচালনায় ফিরেছেন। ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছবি প্রসঙ্গে মুঠোফোনে প্রায়ই কথা হতো। একদিন নিজেই বললেন অপ্রাপ্তি, অভিমান আর হতাশার কথা। দীর্ঘ সে আলাপ। সারবস্তু হলো এই, মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি নায়িকা হয়েছেন। কবরী-শাবানা-ববিতাদের দেখেই হয়তো পরের জামানার শাবনূর-মৌসুমীরা চলচ্চিত্রে এসেছেন। কিন্তু কবরীর সামনে কেউই ছিলেন না। সিনেমা দেখার বয়স হওয়ার আগেই যে তিনি সিনেমায় এসেছেন। কষ্ট করে ঠেকে শিখেছেন অভিনয়। সহকর্মী হিসেবে পেয়েছেন সুভাষ দত্ত, জহির রায়হান, রাজ্জাক, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আমজাদ হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুনদের মতো শিল্পরসিকদের। অথচ গত দুই দশকে ঢাকাই ছবিতে নতুন আসা একজন পরিচালকের মধ্যেও তিনি শিল্পরস খুঁজে পাননি। কাউকে দেখেই মনে হয়নি, এইতো জহির রায়হান-আমজাদ হোসেনের উত্তরসূরিকে পেয়ে গেলাম! শিল্পের কদর কমে গেলে কমে যায় শিল্পীর কদরও। পাশের দেশের দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেনদের দেখে রীতিমতো কান্না পায় তাঁর। ‘দেশের মানুষ তাঁদের যেমন শ্রদ্ধা করে, রাষ্ট্রও তাঁদের সম্মান জানায়। অমিতাভ বচ্চনসহ সিনিয়র শিল্পীদের এখনো পর্দায় উপযুক্ত চরিত্রেই দেখা যায়। আর আমাদের এখানে শিল্পীর বয়স হলে তাঁকে আপদ মনে করে সবাই, অবহেলা-অবজ্ঞায় তাঁর ভেতরের শিল্পীকে হত্যা করা হয়। অভিমান হবে না বলো?’—বলতে বলতে গলা ধরে এসেছিলো তাঁর।

মুঠোফোনের এপার-ওপার দুই পারেই কিছুক্ষণ নীরবতা। হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠে বললেন, ‘পরিবেশটাই গম্ভীর করে ফেললাম। আমি বরং হাসি, না হাসলে কি কবরীকে মানায়?’

ফোনের এপারে সে হাসিটা দেখা যাচ্ছিল না। ‘সুজন-সখী’র সখীর সেই হাসিমুখ অটোমেটিক চোখে ভেসে উঠেছিল।

১৫ এপ্রিল হাসপাতালের একটা ছবি দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। মুখে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে বেডে বসে ছিলেন কবরী। এমন মনমরা কবরীকে সিনেমার কোনো দুঃখের দৃশ্যেও দেখা যায়নি। সহ্য হলো না। মুহূর্তেই চোখটা সরিয়ে নিলাম। হৃদয়ে তাঁর যে হাসিমুখটা ফ্রেমবন্দি, সেখানেই দেখে নিলাম এক পলক। অন্তরে ওই হাসিটুকু থাক।