kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই

আজ ৮০ বছর বয়সে পা রাখছেন একুশে পদকজয়ী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। জীবনের বিশেষ এই দিনটিকে সামনে রেখে বরেণ্য এ অভিনেতা, সংগঠকের মুখোমুখি হয়েছেন দাউদ হোসাইন রনি

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই

৮০তম জন্মদিন তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা মাইলফলক। বিশেষ দিনটি কিভাবে উদ্যাপনের পরিকল্পনা করেছেন?

আমি কখনোই জন্মদিন পালনে উৎসাহী নই। থিয়েটারের ছেলে-মেয়েরা টুকটাক আয়োজন করে। জন্মদিনে আমি যেটা করি, পরিবারের পাঁচ সদস্য মিলে বাড়ির বাইরে কোথাও গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করি। এবার সেটাও সম্ভব হবে না। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের আনন্দ আয়োজনেরই সুযোগ নেই। বরং আমার এখন আতঙ্কের সময়, জীবন ফুরিয়ে আসছে। আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই, কিছু স্বপ্নপূরণ এখনো বাকি।

 

আপনি ফেরদৌসী মজুমদারএই বয়সে আপনারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই করোনা জয় করে ফিরেছেন। এটাও তো বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বিশেষ অর্জন।

অবশ্যই।

 

করোনাজয়ের গল্পটা শুনতে চাই।

তার আগে বলি, আমরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম, এখন পুরোপুরি সুস্থ। পুরনো সংবাদটা দু-এক দিন আগে প্রকাশ হওয়ায় অনেকেই ভাবছেন আমরা এখনো অসুস্থ। ১৯ জুলাই ফেরদৌসীর করোনা শনাক্ত হয়। ও গিয়েছিল ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসা নিতে। রক্ত পরীক্ষার পর করোনা পরীক্ষাও করা হলো। তখন জানা গেল সে করোনা পজিটিভ। এরপর বাসায় আলাদা ঘরে থাকল সে। এক সপ্তাহ পর আমারও একটু জ্বর জ্বর লাগল। পরীক্ষা করে জানলাম, আমিও পজিটিভ। তখন আরেকটা ঘরে নিজেকে বন্দি করে ফেললাম। অ্যান্টিবায়োটিক খেলাম। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ আমি নিয়মিত খাই, চিকিৎসক বললেন আর কিছু লাগবে না। একটু একটু করে আমরা দুজনই সুস্থ হয়ে উঠি। এখনই কভিড পরীক্ষা করাব না, আরো কিছুদিন যাক।

 

১৯৪১ সালের আগস্ট লক্ষ্মীপুরে আপনার জন্ম...

সে সময়ের বড় ঘটনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। তাঁর মৃত্যুর ঠিক দুই দিন পরেই আমার জন্ম। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিজের একটা মানসিক যোগাযোগ আছে বলে আমি মনে করি। লক্ষ্মীপুর তখন ছিল থানা শহর। আমাদের সচ্ছল পরিবার, কিন্তু বিলাসিতা ছিল না। বাবা কুন্তল মজুমদার অসম্ভব সৎ মানুষ ছিলেন। মা লীলা মজুমদার ছিলেন ভীষণ পরোপকারী। তাঁদের কিছু গুণ আমি পেয়েছি।

 

সংস্কৃতিমনা হওয়ার দীক্ষা পেয়েছেন কার কাছে?

পরিবারের সবাই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। বাবা আইনজীবী, শখে নাটক করতেন। আমার বড় দুই ভাইও নাটক করতেন। নাটক রক্তের মধ্যেই ছিল। আমাদের বাড়ির সামনে একটা প্রেস ছিল। সেখানে ছোটবেলায়ই টাইপ শিখেছি। সবচেয়ে বড় কথা, ওরা আমাকে প্রুফ দেখতেও শিখিয়েছিল। তখন আমার মধ্যে প্রকাশনার প্রতি আগ্রহও তৈরি হয়।

 

বলা হয়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন মঞ্চনাটক। আপনি সেই থিয়েটার আন্দোলনের অগ্রসৈনিকদের একজন। মঞ্চের এখনকার চিত্র দেখে আপনি সন্তুষ্ট?

টেলিভিশন বাণিজ্যের কাছে নত হলেও মঞ্চ এখনো নত হয়নি। তবে সময় তো বদলে গেছে, সত্তর-আশির দশকে ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে যে সময়টা পাওয়া যেত, সেটা এখন পাওয়া যাচ্ছে না। সেটা প্রত্যাশা করাও ঠিক নয়, জীবন এখন অনেক কঠিন হয়েছে। এর মধ্যেও অনেক নতুন দল হয়েছে, প্রতিভাবানরা আসছে। আমার মতে, মঞ্চ ঠিক পথেই এগোচ্ছে।

 

আপনার হাত ধরেই আইটিআই-এর সদস্য পদ পেল বাংলাদেশ। পরে এই সংস্থার বৈশ্বিক সভাপতিও হয়েছেন। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এটিই কি আপনার বড় অর্জন?

আমার সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা দুটি—আইটিআই এবং ‘থিয়েটার’ পত্রিকা। ছোটবেলায় সুপারিগাছ কেটে কাঁধে করে বয়ে স্কুলের মাঠে মঞ্চ বানাতাম এবং নাটক করতাম। সেই আমি একটা বিশ্ব সংস্থার সভাপতি হয়েছি, এটা আমার জীবনের পরম পাওয়া। আরেকটা ‘থিয়েটার’ পত্রিকা। ৪৮ বছর ধরে পত্রিকাটা চালাচ্ছি। বাংলাদেশের থিয়েটারে খোঁজ নিতে হলে এই পত্রিকার দিকে হাত বাড়াতেই হবে।

 

একটা স্বপ্ন চেতনা নিয়ে যৌবনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এখনকার বাংলাদেশই কি আপনাদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ?

না। এই বাংলাদেশ আমরা চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, সেটা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বাংলাদেশ আবার উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির হাতে কিন্তু সমাজটা চলে গেছে ধর্মান্ধদের দখলে।

 

রেডিও, টিভি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। মঞ্চে অভিনয় নির্দেশনা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন সংবাদ পাঠও করেছেন। পারফর্মিং আর্টের কোন জায়গাটা আপনার বেশি প্রিয়?

অবশ্যই মঞ্চ।

 

মঞ্চের কোন কাজটা করে বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন?

যদিও সাংগঠনিক কাজের জন্য অভিনয়ে সেভাবে মনোযোগ দিতে পারিনি। তবে আমার অভিনয় করতেই বেশি ভালো লাগে। ‘দুই বোন’-এর শশাঙ্ক চরিত্রটা করে তৃপ্তি পেয়েছি একসময়। এখন তৃপ্তি পাচ্ছি ‘মেরাজ ফকিরের মা’ করে।

 

৮০ বছরে জীবনের নানা রং দেখেছেন। জীবনটা আসলে কেমন?

একটাই তো জীবন, যত বেশি উপভোগ করা যায় ততই সার্থক। মানুষের জন্য কী করতে পারলাম সেটাও বিবেচ্য। জীবন একা উপভোগে আনন্দ নেই। আমি খুবই সৌভাগ্যবান, ফেরদৌসীর মতো স্ত্রী পেয়েছি। ত্রপাকে নিয়েও আমি গর্বিত। আমরা যেমন সন্তান কামনা করেছি, ত্রপা তেমনই একটি মেয়ে। ত্রপা আমার বিবেক। আমি যদি কোনো ভুল করি ও-ই আমাকে সংশোধন করে দেয়। শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্যের জীবন নানা রঙের। সেই রং উপভোগ করে বেঁচে থাকাটাই আনন্দের।

 

জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করছি আলাপ। শুভ জন্মদিন।

তোমাকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ কালের কণ্ঠকেও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা