kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হারালে কোথায় কোন দূর অজানায়

শাহনাজ রহমতউল্লাহকে হারিয়ে শোকাহত সংগীতাঙ্গন

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হারালে কোথায় কোন দূর অজানায়

শাহনাজ রহমতউল্লাহ [১৯৫২-২০১৯]

আমিই তাকে বড়দের আসরে নিয়ে আসি

সৈয়দ আব্দুল হাদী সংগীতশিল্পী

শাহনাজ রহমতউল্লাহর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে। সে তখন পাকিস্তান টেলিভিশনে ছোটদের আসরে গান করত। সেখান থেকে আমিই তাকে বড়দের আসরে নিয়ে আসি। ষাটের দশকের শেষ দিকে টেলিভিশনে দুজন প্রথম একসঙ্গে গান করি। সেটি হলো তার বিখ্যাত গান— ‘সাগরের তীর থেকে’। এরপর গানটির কথায় কিছুটা পরিবর্তন এনে সে বেতারে এককভাবে গায়। দুজন যখন গেয়েছিলাম তখন কথা ছিল—‘সাগরের তীর থেকে, মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে, তোমার আঁচলে ছোয়াব গো’। একা গাওয়ার সময় ‘আঁচলে’ শব্দটির পরিবর্তে ‘কপালে’ গেয়েছিল। টেলিভিশনে জনপ্রিয় হয়েছিল গানটি। এরপর আরো কিছু গানে কণ্ঠ দিই দুজন। শেষ দিকে তো গানের জগৎ থেকেই দূরে সরে যায়। তার পরও তার উপস্থিতি ছিল। এখন তো একেবারেই চলে গেল। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আকস্মিক তার এই চলে যাওয়া। কয়েক বছর আগে রবিন ঘোষ আর আমি তার বাসায় অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছি। সেই দিনটির কথা মনে পড়ছে। আরো কত কত স্মৃতি আমাদের! তার মতো শিল্পী যুগে যুগে জন্মায় না।

 

একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না

গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতিকার ও নির্মাতা

শাহনাজের ভাই আনোয়ার পারভেজ বিখ্যাত সুরকার, আরেক ভাই জাফর ইকবাল গায়ক ও নায়ক। ওদের পরিবারের সঙ্গে প্রথম থেকেই সম্পৃক্ত ছিলাম। ছোটবেলায় ও খুব ছটফটে ছিল। খেলা দেখতে স্টেডিয়ামেও যেত। আমাকে বলত—ভাই, এটা খাওয়াতে হবে, ওটা খাওয়াতে হবে। তখন থেকেই ও রেওয়াজ করত। ছোট বোনের মতোই তাকে দেখতাম। ‘জয় বাংলার জয়’ প্রথম স্বাধীনতার গান। শাহনাজ গেয়েছিল। দেশের মানুষকে সে ভালোবাসত খুব। এমন দরদি ও ক্লাসিক্যাল কণ্ঠস্বর খুব কমই পাওয়া যায়। উপমহাদেশের গুণী শিল্পীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। একজন শাহনাজ রহমতউল্লাহকে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় প্রেজেন্ট করা যায়। জাতীয় সম্মান যেমন পেয়েছে সে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছে। শাহনাজকে হারানোর মানে তার কাজকে, সৃষ্টিকে হারালাম, তা নয়। তবে তাকে হারানোয় বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আমার হাজার হাজার গানের মধ্যে সে যে কয়টা গেয়েছে, সবই মনে রাখার মতো। স্বাধীনতার সময় যে গান করেছি, তাতে শাহনাজের অংশদারি ছিল। যেভাবে গাইতে বলা হতো, সেভাবেই গাইত। শাহনাজের চলে যাওয়াকে চিরবিদায় বলতে পারব না। তাকে মনে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে তাকে উপস্থাপন করতে হবে। সরকারিভাবেও তাকে মনে রাখতে হবে। এতে শিল্পীরা উদ্বুদ্ধ হবে, নতুনরা তার সম্পর্কে জানবে।

 

খুবই মর্মাহত হয়েছি

আলম খান সুরকার

একে একে আমরা সংগীতের কিংবদন্তিদের হারাচ্ছি। শাহনাজ রহমতউল্লাহর চলে যাওয়া মানে কণ্ঠশিল্পীদের মাথার ওপর থেকে একটা ছায়া সরে যাওয়া। এভাবে চলে যাবেন, ভাবতেও পারিনি। আমাদের মাঝে তাঁর আরো কিছুদিন থাকার দরকার ছিল। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৬৭ সালের দিকে, পাকিস্তান টেলিভিশনে। তখন সেটা ছিল ডিআইটি ভবন, এখন যেটা রাউজক ভবন। মিউজিশিয়ান হিসেবে তাঁর সঙ্গে অনেক গানে অর্গান বাজিয়েছি। পাকিস্তান টেলিভিশনে আমার সুরে পাঁচ-ছয়টি গানে কণ্ঠ দেন তিনি। গানগুলো বাংলায়ই ছিল। নদী এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে। এরপর তাঁর সঙ্গে আর কাজ করা হয়নি। তাঁর ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন আমার বন্ধু। সেদিক থেকেও আমাকে খুব সম্মান করতেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি।

 

সংগীতজগতের জন্য অনেক বড় ক্ষতি

রুনা লায়লা সংগীতশিল্পী

শাহনাজ রহমতউল্লাহর চলে যাওয়া সংগীতজগতের জন্য অনেক বড় একটা ক্ষতি। এভাবে আমরা আর কত গুণী শিল্পীদের হারাব! আরো একজন কিংবদন্তি শিল্পী আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে গেলেন। আমি তাঁর আত্মার  শান্তি কামনা করছি।

 

বিবিসির সেরা কুড়ির চারটিই তাঁর

২০০৬ সালে শ্রোতাদের ভোটে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকা তৈরি করে বিবিসি বাংলা। চারটি গানই শাহনাজ রহমতউল্লাহর

 

এক নদী রক্ত পেরিয়ে

খান আতাউর রহমানের কথা ও সুরে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবির গান। গানটি স্থান পেয়েছিল বিবিসি জরিপের  ৯-এ। শহীদদের নিয়ে এই দেশের গানটি গাওয়ার সময় অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করে, বলেছিলেন শিল্পী।

 

জয় বাংলা বাংলার জয়

তালিকার ১৩ নম্বরে জায়গা পাওয়া গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার শাহনাজ রহমতউল্লাহর বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গানে ফার্মগেটের একটি স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড হয়। গানটি শাহনাজ রহমতউল্লাহর কাছে গাওয়ার প্রস্তাব আসে হঠাৎ করেই। সাক্ষাৎকারে শিল্পী জানিয়েছিলেন, মাত্র আধঘণ্টার নোটিশে গাইতে হয়েছিল তাঁকে। গানটিতে তাঁর সহশিল্পী আব্দুল জব্বার।

একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়

গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আনোয়ার পারভেজ গীতিকার-সুরকার জুটির আরেকটি গান এটি। তালিকার ১৫ নম্বরে জায়গা পেয়েছিল এটি।

একতারা তুই দেশের কথা বল

গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আনোয়ার পারভেজের সঙ্গে করা শাহনাজ রহমতউল্লাহর দেশের গানগুলো অন্য রকম মাত্রা পেয়েছিল। বিবিসির জরিপে সেরা শিল্পীর স্থান পাওয়া চার গানের তিনটিই এই গীতিকার-সুরকার জুটির সঙ্গে করা।

 

জনপ্রিয় আরো ১০ গান

►    যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়

►    ফুলের কানে ভ্রমর এসে

►    ওই ঝিনুক ফোঁটা সাগর বেলায়

►    পারি না ভুলে যেতে

►    আমি সাত সাগরের ওপার হতে

►    আরও কিছু দাও না দুঃখ আমায়

►    প্রথম বাংলাদেশ আমার

►    আমায় যদি প্রশ্ন করে

►    সাগরের তীর থেকে

►    খোলা জানালায় চেয়ে দেখি তুমি আসছো

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা