kalerkantho

শুক্রবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৭ সফর ১৪৪২

গোলাপীদের আর দেখবে কে

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গোলাপীদের আর দেখবে কে

আমজাদ হোসেন ১৯৪২—২০১৮

চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন আর নেই। গতকাল বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৫৭ মিনিটে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, কাহিনিকার, গীতিকার, অভিনেতা ও লেখক। এই কিংবদন্তিকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর সহকর্মীদের কয়েকজন

 

আফসোস! এমন দিন আর চোখে দেখতে পাব না

ববিতা অভিনেত্রী

আমজাদ হোসেনের মতো মেধাবী মানুষ আর দ্বিতীয়টি পাব না। কোন গুণটি ছিল না তাঁর! গীতিকার, গল্পকার থেকে শুরু করে অভিনেতা, পরিচালক—সব দিক থেকেই সফল তিনি। আমি খুব ভাগ্যবতী, এমন নির্মাতার বেশির ভাগ ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলাম। খুব ছোটবেলা থেকেই আমজাদ হোসেনকে চিনতাম। জহির রায়হান আমার দুলাভাই। তাঁর সহকারী ছিলেন আমজাদ ভাই। সেই সূত্রে পারিবারিক সম্পর্ক আমাদের। এবার দেশে ফিরে আমরা তিন বোন তাঁকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তখন তাঁকে দেখে মনের মধ্যে কেমন যেন ভয় ধরে গিয়েছিল, বেশি দিন বাঁচবেন বলে মনে হয়নি। কিন্তু কাউকে বলিনি কথাটা। দোয়া করেছি, তিনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

আমজাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। কোনটা রেখে কোনটা বলব! ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’র শুটিং করতে ঢাকা থেকে জামালপুর যাচ্ছিলাম। হাজার মানুষের ভিড়ে তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলেন। লিখে ফেললেন কালজয়ী গান ‘হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ’। আমি তাকিয়ে ছিলাম অপলক। কিভাবে পারেন মুহূর্তের মধ্যে এমন অসাধারণ সব কথা সৃষ্টি করতে! তিনি খুব সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। একবার ট্রেনে করে আমরা কোথায় যেন যাচ্ছিলাম। কেউ কেউ ফার্স্ট ক্লাসে আর কেউ সেকেন্ড ক্লাসে যাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমন সময় তিনি এসে বললেন, ‘কিসের ক্লাস! বাংলাদেশে কোনো ক্লাস নেই। সবাই সমান। আমরা একসঙ্গেই বসব সবাই।’ খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করা একজন মানুষ অবলীলায় যখন এমন কথা বলতে পারেন, তাঁকে সম্মান না জানিয়ে কি উপায় আছে? আমজাদ হোসেনের সিনেমায় গ্রামবাংলার রূপ যতটা ফুটে উঠেছে আর কোনো পরিচালক সেটা দেখাতে পারেননি। তাঁর ছবি যেমন বিভিন্ন উৎসবে পুরস্কৃত হতো ঠিক তেমনি বাণিজ্যিকভাবেও সফল হতো। এটা অন্য পরিচালকদের দ্বারা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সত্তর ও আশির দশকে একটা কথা প্রচলিত ছিল ইন্ডাস্ট্রিতে। আর সেটা হলো, আমজাদ হোসেন, ববিতা, আনোয়ারা, ফারুক আর রওশন জামিল যে ছবিতে আছে সে ছবি বছরের শ্রেষ্ঠ ছবি। মুক্তির আগেই শেষ হয়ে যেত হল বুকিং। সে কি মারমার কাটকাট ব্যবসা। পরিচালক হিসেবে আমি যেমন তাঁর ভক্ত ছিলাম ঠিক তেমনি ছিলাম গানের ভক্তও। তাঁর সঙ্গে কাজ করার পেছনে একটা মোহ কাজ করত। আমার লিপে বছরের সেরা গানটি থাকবে ভেবে যেভাবেই হোক শিডিউল জোগাড় করতাম। প্রতিটি ছবিতেই তিনি আমার জন্য অনেক যত্ন নিয়ে গান লিখতেন, তৈরি করতেন। আহ! এমন দিন আর চোখে দেখতে পাব না ভেবে কষ্ট হচ্ছে। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। 

 

এমন অলরাউন্ডার পরিচালক আর আসবেন না

ফারুক অভিনেতা

আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’তে প্রথম অভিনয় করেছিলাম। কিন্তু আমার প্রথম ছবি ‘জলছবি’ করার সময় থেকেই দুজনের পরিচয়। বন্ধুত্ব তৈরি হয় আমাদের। এরপর ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ করার সময় তৈরি হয় পারিবারিক সম্পর্ক। শুধু একজন গুণী নির্মাতা নন, ভালো মনের মানুষও ছিলেন। আমি নির্বাচনী প্রচারণায় আছি, এমন মুহূর্তেই খবরটা পেলাম। শোনার পর থেকেই খুব খারাপ লাগছে। এই মুহূর্তে আর কী বলার আছে! শুধু বলব, চলচ্চিত্রের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র হারালাম। এমন অলরাউন্ডার পরিচালক আর আসবেন না। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

 

কিছু বলার ভাষা নেই

আলাউদ্দিন আলী সংগীত পরিচালক

একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কক্সবাজারে এসেছি। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান, তার প্রস্তুতিই নিচ্ছিলাম। ঠিক এমন সময় দুঃসংবাদটি পেলাম। এই মুহূর্তে কিছু বলার ভাষা নাই! কী করব তা-ও মাথায় আসছে না। শরীর অসুস্থ লাগছে। আমজাদ হোসেনের সঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলো ঘিরে ধরেছে। রাতের পর রাত পার করেছি স্টুডিওতে। তিনি লিখতেন আর আমি সুর করতাম। অনেক কালজয়ী গান আমাদের। একেকটা গানের পেছনে হাজার স্মৃতি। আমি বিকেল থেকে [গতকাল] চেষ্টা করছি তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কিন্তু পারছি না। যদি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম নিজের কাছে হালকা মনে হতো। কাছের কেউ মারা গেলে সত্যিই বড় একা লাগে।

 

আমজাদ হোসেনের সেরা দশ

জীবন থেকে নেয়া [১৯৭০] : জহির রায়হানের কালজয়ী এই ছবির সংলাপ রচয়িতা আমজাদ হোসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করার নেপথ্যে এই ছবির অনেক অবদান। রূপকের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসন তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। প্রধান চরিত্রে আছেন আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, রোজী সামাদ, সুচন্দা ও খান আতাউর রহমান।

 

নয়নমণি [১৯৭৬] : নিজের লেখা উপন্যাস ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনা করেন আমজাদ হোসেন। গ্রাম্য সমাজ ব্যবস্থার ওপর গল্প। প্রযোজনায় আলমগীর পিকচার্স। অভিনয়ে ফারুক, ববিতা, আনোয়ার হোসেন, রওশন জামিল, এ টি এম শামসুজ্জামান, আনোয়ারা প্রমুখ। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনটি বিভাগে পুরস্কার পায় ছবিটি—সেরা চিত্রনাট্যকার আমজাদ হোসেন, সেরা অভিনেত্রী ববিতা ও সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী রওশন জামিল।

 

গোলাপী এখন ট্রেনে [১৯৭৮] : ‘গোলাপী’ সিরিজের প্রথম ছবি। সেরা ছবির জাতীয় পুরস্কার পায় ছবিটি। নাম ভূমিকায় অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত হন ববিতা। অভিনয়ে আরো আছেন ফারুক, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা, এ টি এম শামসুজ্জামান, রওশন জামিল, আব্দুল্লাহ আল মামুন। পরিচালনার পাশাপাশি ছবিটি প্রযোজনাও করেন আমজাদ হোসেন।

 

সুন্দরী [১৯৭৯] : সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠের বিখ্যাত গান ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিলো না’ এই ছবিরই গান। ববিতা ও ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনয় করেছেন প্রধান চরিত্রে। আরো আছেন আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা, সাইফুদ্দিন, জসিম। আমজাদ হোসেন পরিচালিত ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সাত বিভাগে পুরস্কৃত হয়—সংলাপ ও গান রচনায় আমজাদ হোসেন, গায়ক সৈয়দ আব্দুল হাদী, গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন, পার্শ্বচরিত্রে আনোয়ারা ও সাইফুদ্দিন এবং সংগীতে আলাউদ্দিন আলী।

 

কসাই [১৯৮০] : রুনা লায়লার গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম দেখা পাইলাম না’ এই ছবির গান। দারুণ ব্যবসাসফল হয় ছবিটি। মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এটি। অভিনয় করেছেন আলমগীর, কবরী সারোয়ার, ববিতা, রোজিনা, জসিম, আনোয়ারা। চারটি জাতীয় পুরস্কার পায় ছবিটি—সংগীতে আলাউদ্দিন আলী, গায়ক সৈয়দ আব্দুল হাদী, গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন, পার্শ্বচরিত্রে রোজিনা।

 

জন্ম থেকে জ্বলছি [১৯৮১] : পরিচালনার পাশাপাশি ছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গান রচয়িতা আমজাদ হোসেন। অভিনয়ে বুলবুল আহমেদ, ববিতা, আনোয়ারা, প্রবীর মিত্র, সুমিতা দেবী।

 

দুই পয়সার আলতা [১৯৮২] : এই ছবির দুটি গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে—মিতালী মুখার্জির গাওয়া ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নেই’ ও সৈয়দ আব্দুল হাদীর গাওয়া ‘এমনো তো প্রেম হয়’। যথারীতি এই ছবিতেও পরিচালনার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গান রচনায় আমজাদ হোসেন। অভিনয়ে রাজ্জাক, শাবানা, নূতন, আনোয়ারা, প্রবীর মিত্র, সুমিতা দেবী। চারটি জাতীয় পুরস্কার পায় ছবিটি—সেরা অভিনেত্রী শাবানা, গায়িকা মিতালী মুখার্জি, চিত্রগ্রহণে রফিকুল বারী চৌধুরী ও সম্পাদনায় আওকাত হোসেন।

 

ভাত দে [১৯৮৪] : কান উৎসবে প্রদর্শিত প্রথম বাংলাদেশি ছবি। ঢাকা ক্লাবের একটি রুমে বসে টানা এক মাস ধরে ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন আমজাদ হোসেন। খাবারের অভাবে মানুষ কত কী করতে পারে, তাই দেখানো হয়েছে ছবিতে। অভিনয়ে শাবানা, আলমগীর, রাজীব, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা ও আঁখি আলমগীর। শাবানার মুখের সংলাপ ‘ভাত দে হারামজাদা’ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। জাতীয় পুরস্কারে ৯টি বিভাগে পুরস্কার পায় ছবিটি—পরিচালনা-চিত্রনাট্য-সংলাপে আমজাদ হোসেন, অভিনেত্রী শাবানা, শিশুশিল্পী আঁখি আলমগীর, প্রযোজনা আবু জাফর খান, শব্দ গ্রহণে এম এ বাসেত, সম্পাদনায় মুজিবুর রহমান দুলু ও শিল্প নির্দেশনায় অঞ্জন ভৌমিক।

 

আদরের সন্তান [১৯৯৫] : শিক্ষিত বেকার যুবকের লড়াইয়ের গল্প। অভিনয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন, মৌসুমী, এ টি এম শামসুজ্জামান, আবুল হায়াত, সমু চৌধুরী। ব্যবসাসফল হয় ছবিটি। মৌসুমী-কাঞ্চন জুটিও জনপ্রিয়তা পায়।

 

কাল সকালে [২০০৪] : একই নামে নিজের লেখা গল্প অবলম্বনে ছবিটি নির্মাণ করেন আমজাদ হোসেন। অভিনয়ে শাবনূর, ফেরদৌস, অপু বিশ্বাস, দিতি, এস এ হক অলীক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা