kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বালাই ষাট

৬০ বছর আগে আজকের দিনেই মুক্তি পায় বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। ঐতিহাসিক এই ছবি তৈরির নেপথ্য গল্প বলেছেন ইতিহাসবিদ খন্দকার মাহমুদুল হাসান

৩ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বালাই ষাট

‘মুখ ও মুখোশ’-এর দৃশ্য

ইত্না বারিষ্ (এত বৃষ্টি)—ছোট করে বললেন পাকিস্তানি চিত্র ব্যবসায়ী দোসানি। কথাটার আসল অর্থ, এত বৃষ্টির দেশে সিনেমা বানানো অসম্ভব। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে এক সভায় কথাটা বলেন তিনি। চলচ্চিত্রে পশ্চাৎপদ বাংলাকে কিভাবে স্বাবলম্বী করা যায়, তাই ঠিক করতে চলচ্চিত্র পরিবেশক, প্রদর্শক ও শিল্প-সংস্কৃতিজগতের লোকদের নিয়ে সভাটা ডেকেছিলেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান আবদুস সাদেক। কথাবার্তার এক ফাঁকে এখানে চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলা দরকার বলে মত দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধিতা করলেন দোসানি। বৃষ্টিবহুল এই দেশে ছবি বানানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করলেন। তীব্র প্রতিবাদ করলেন আবদুল জব্বার খান। কলকাতায় যদি ছবি নির্মাণ সম্ভব হয়, তাহলে এখানে কেন হবে না? পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন, এক বছরের মধ্যে যদি কেউ না বানায়, তাহলে তিনিই বানাবেন।

‘কিন্তু কেউই ছবি তৈরির কাজে হাত দিলেন না। বিদেশি ছবি আমদানি করে ছবিঘরগুলো চলতে লাগল’—পরে এক সাক্ষাৎকারে নিজেই দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক কাহিনীচিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণের পটভূমি ব্যাখ্যা করেন আবদুল জব্বার খান। ঠিক করলেন, নিজেই ছবি বানাবেন। ফরিদপুরের একটি ডাকাতির ঘটনাকে উপজীব্য করে ‘ডাকাত’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন, সেটিকেই ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর অবস্থাটা তখন ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। স্টুডিও নেই, ক্যামেরা নেই, ফ্লোর নেই, এমনকি অভিনেতা-অভিনেত্রী-ক্যামেরাম্যান পর্যন্ত নেই; তবু ছবি বানাবেন! অনেকে হাসল, কেউ কেউ ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল।

ছবি প্রযোজনার জন্য দেশভাগের আগে কলকাতায় গঠিত প্রযোজনা সংস্থা ইকবাল ফিল্মস লিমিটেড পুনর্গঠন করা হলো। হাত পাকানোর জন্য প্রথমে দুটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা হলো। এরপর শুরু হলো ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাজ। কষ্টেসৃষ্টে জোগাড় করলেন একটা আইমো ক্যামেরা, বিদ্যুৎ তৈরির জন্য জেনারেটর আর একটা টেপরেকর্ডার। এরপর খুঁজতে লেগে গেলেন অভিনেতা-অভিনেত্রী। সিনেমায় অভিনয়ের যোগ্যতাসম্পন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রী তখন কোথায় পাবেন? তাই সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিলেন। আজাদ, ইত্তেফাক ও মর্নিং নিউজে ছাপা হলো। কিছু সাড়া মিলল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্রী জহরত আরা এবং ইডেন কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী পিয়ারি বেগম উৎসাহী হলেন। ঢাকা বেতার কেন্দ্রে নাটক করতেন আমিনুল হক। তিনিও আগ্রহী। কিন্তু তখনো পাওয়া যায়নি নায়ক-নায়িকা। তখন চট্টগ্রামে থাকতেন কলিম শরাফী ও তাঁর স্ত্রী কামেলা শরাফী। তাঁদের সঙ্গে কথাও বললেন, তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও আর কাজটা করা হলো না। চিন্তায় পড়ে গেলেন আবদুল জব্বার খান। এক বন্ধু একটি মেয়ের সংবাদ দিলেন। মেয়েটি পাথরঘাটায় থাকে, নাটকে অভিনয় করে। নাম পূর্ণিমা সেনগুপ্তা। এককথায় রাজি পূর্ণিমা। মেয়ের বাবারও আপত্তি নেই। কিন্তু ঢাকায় থাকার মতো জায়গা যে তাঁদের নেই। তা ছাড়া চলবেনই বা কী করে। আশ্বস্ত করলেন আবদুল জব্বার, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ফরাশগঞ্জে তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। এভাবেই নায়িকা হলেন পূর্ণিমা সেনগুপ্তা। কোথাও না পেয়ে শেষে নিজেই নায়ক হয়ে গেলেন আবদুল জব্বার খান। আরেকটি চরিত্রের জন্য নিজের শ্যালককে বেছে নিলেন। তাঁর যে অভিনয়দক্ষতা ছিল, আসামের ধুবড়িতে থাকাকালেই জানতেন জব্বার খান। এভাবেই এ ছবির মাধ্যমে দেশের চলচ্চিত্রের প্রথম কৌতুকাভিনেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন সাইফুদ্দিন। তাঁর বিপরীতে বিলকিস বারী। শখের বশে নাটক করতেন। কিন্তু স্বামী পছন্দ করতেন না। স্বামী অফিসে গেলে চুপি চুপি অভিনয় করতে যেতেন, আবার ফিরে আসার আগেই বাসায় আসতেন। একসময় স্বামীর কাছে ধরা পড়েন এবং দেশের চলচ্চিত্রের তিনিই প্রথম অভিনেত্রী, যাঁকে চলচ্চিত্রের কারণে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়তে হয়।

ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র ডাকাত সর্দার। অভিনয় করেছিলেন ইনাম আহমদ। অভিনয়ে অভিজ্ঞ, কলকাতায় চিত্রপুরীতে কাজ করেছিলেন। পূর্ববঙ্গের তৎকালীন গভর্নর মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার উপস্থিতিতে ঢাকার শাহবাগ হোটেলে ১৯৫৪ সালের ৬ আগস্ট ছবির মহরত হলো। কলকাতার ক্যামেরাম্যান মুরারীমোহন ঘোষ চিত্রগ্রাহক।  সহকারী কিউ এম জামান। পুরো ছবির পটভূমি গ্রাম। আজকের ঢাকা শহরের মায়াকানন, শান্তিনগর এলাকায় ধারণ করা হলো সেসব গ্রামের দৃশ্য।

ছবিটির সংগীত পরিচালক সমর দাস। গেয়েছিলেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত (বর্তমানে মাহবুবা রহমান)। রেকর্ডিংয়ের কোনো স্টুডিও তখন ছিল না। শিল্পী বা মিউজিশিয়ানরা কোনো ভুল করলে আগের পুরো কাজ বাতিল হয়ে যেত এবং প্রথম থেকে শুরু করতে হতো। এখানে গান গাওয়ার পর লাহোরে গিয়ে ডেভেলপ করা হতো। ঢাকার শান্তিনগরে আবদুল জব্বার খানের বাসায় রাস্তার ধারে একটি ঘরে রেকর্ডিং হয়েছিল। রাস্তা দিয়ে সব সময় গাড়িঘোড়া চলায় শব্দের কোনো কমতি ছিল না। অথচ রেকর্ডিংয়ের জন্য ঘরটি সাউন্ডপ্রুফ হওয়া অত্যাবশ্যক। কাঁথা, চাদর ঝুলিয়ে ঘরটিকে শব্দরোধী করার চেষ্টা করা হয়।

বন্যার কারণে ১৯৫৫ সালের পুরোটা সময় শুটিং বন্ধ থাকে, এ সময় ক্যামেরাম্যান মুরারীমোহন কলকাতায় গিয়ে আর ফিরে এলেন না, অথচ তাঁকে পারিশ্রমিক ঠিকই দিতে হয়েছিল। সহকারী কিউ এম জামানই নিলেন চিত্রধারণের দায়িত্ব। লাহোরের শাহনুর স্টুডিওতে অবাঙালি সম্পাদক নিয়োগ করে তিন মাসে কাজ শেষ করে ঢাকায় ছবি নিয়ে এলেন।

ছবি তো তৈরি হলো, কিন্তু মুক্তি দেবেন কী করে? পরিবেশক ছাড়া তো আর ছবি চালানো যাবে না। পরিবেশনার দায়িত্ব নিল পাকিস্তান ফিল্মস সার্ভিস ও পাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্ট।

অবশেষে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পেল ‘মুখ ও মুখোশ’। প্রদর্শনী উদ্বোধন করলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। ঢাকার ‘রূপনগর’ সিনেমার রুপালি পর্দায় প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে অভিনয় করলেন পূর্ববঙ্গের অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাচলেন এখানকার নৃত্যশিল্পী, গাইলেন স্থানীয় গায়ক-গায়িকা। নানা ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও ছবি চলাকালে মুহুর্মুহু হাততালিতে ভরে উঠল হল। বাঙালির প্রবল পৃষ্ঠপোষকতা ছবিটিকে সফল করে ছাড়ল। টিকে গেলেন আবদুল জব্বার খান। টিকে গেল তাঁর প্রয়াস। জিতে গেল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। ঢাকায় শুরু হলো নিয়মিত ছায়াছবি নির্মাণ। আজও বিদ্যমান সেই ধারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা