kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

টিআইএন নিলেও সে হারে বাড়ছে না করদাতা

সজীব আহমেদ   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টিআইএন নিলেও সে হারে বাড়ছে না করদাতা

কর অঞ্চলগুলোতে নভেম্বরের শেষ দিকে করদাতাদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা যায়

বছর বছর মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, সেই সঙ্গে ক্রয়ক্ষমতা। অর্থনীতির অনেক সূচকে পার্শ্ববর্তী ভারতসহ অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। জিডিপিতে অব্যাহত জোরালো প্রবৃদ্ধি প্রশংসা কুড়াচ্ছে বিশ্বের। এত অগ্রগতি সত্ত্বেও আয়কর আদায়ের চিত্র হতাশাজনক। অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে বাড়ছে না করদাতার সংখ্যা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে টিআইএনধারী (কর শনাক্তকরণ নম্বর গ্রহণকারী) ৭০ লাখের বেশি। এ বছর এখনো পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করেছেন সাড়ে ১৮ লাখ। রিটার্ন দাখিলের সময় ৩০ নভেম্বর থেকে বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। 

এনবিআরের হিসাবে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে টিআইএনধারী ছিলেন ৫৬ লাখ, যাঁদের মধ্যে ২৪ লাখ ৩০ হাজার জন আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। বাকি ৩১ লাখ ৬৯ হাজার জন দাখিল করেননি। ২০১০-১১ অর্থবছরে কর দিয়েছিলেন ১৪ লাখ মানুষ। অর্থাৎ ১১ বছরে করদাতা বেড়েছে ১০ লাখ। অথচ সরকারের হিসাবে দেশে কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে এমন লোকের সংখ্যা চার কোটি। অর্থাৎ সামর্থ্যবানদের প্রায় ৯৪ শতাংশই আয়কর দেয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যোগ্য সবাইকে করের আওতায় আনতে পারলে আয়কর তিন গুণ বাড়ানোর সুযোগ আছে। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে বছরে যে পরিমাণ কর ফাঁকি হয়, তা দিয়ে তিনটি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এনবিআরের পক্ষ থেকে মানুষের কাছে গিয়ে করদাতা বানানো এবং টিআইএন খুলেও কেন কর জমা দিচ্ছে না, এটা নিয়ে খবরদারি করা সম্ভব না। কারণ এনবিআরের জনবল খুবই কম। কর আদায়ে সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সবাই সহায়তা করবে। যেমন—জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে সে কর দেয় কি না সেটি দেখাতে হবে, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে সে করদাতা কি না দেখাতে হবে। এভাবে সব ক্ষেত্রে যাচাই হলে আইনের ধারায় কর দিতে বাধ্য হবে।’

এনবিআর প্রতিবছর নতুন করদাতার খোঁজে নানা কর্মসূচি নেয়। এই কর্মসূচিতে শুধু টিআইএন দেওয়া হয়। এতে টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়ে। সে হিসাবে বাড়ে না প্রকৃত করদাতা। চলতি বছরও এক কোটি লোককে নতুনভাবে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষকে আয়করের আওতায় আনতে এখনো তেমন কাঠামো গড়ে ওঠেনি। যদিও উপজেলা পর্যায়েও কর অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর; কিন্তু কেন মানুষ কর দিতে চায় না, এ নিয়ে নেই কোনো গবেষণা।

আবদুল মজিদ বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে ও সামাজিকভাবে চাপ তৈরি করতে হবে,

তা না হলে করদাতা বাড়বে না।’ তিনি বলেন, ‘আগে শুধু বিভাগীয় পর্যায়ে ছিল কর অফিস, এখন সব জেলায় কর অফিস খোলা হয়েছে। এখন যেহেতু তৃণমূল পর্যায়েও মানুষের আয় বেড়ে গেছে, তাই আস্তে আস্তে উপজেলা পর্যায়েও কর অফিস খোলা প্রয়োজন।’

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, একজন করদাতাকে প্রতিবছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে বিষয়ে করদাতাদের সচেতন করতে প্রতিবছর নভেম্বর মাসে আয়কর মেলাসহ বিভিন্ন প্রচারণামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে, যদিও এ বছর ও গত বছর করোনার কারণে আয়কর মেলার আয়োজন হয়নি। তবে মেলা না হলেও মেলার সব সুযোগ-সুবিধা কর অঞ্চলেই পেয়েছেন করদাতারা। এ ছাড়া অনলাইন সেবাসহ বিশেষ ব্যবস্থায় কর অঞ্চলগুলোতে সারা বছরই করসেবা অব্যাহত রয়েছে। এ বছর অনলাইন রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি আরো সহজ করা হয়েছে। তার পরও আয়কর রিটার্ন দাখিল কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়েনি। সে জন্য রিটার্ন দাখিল না করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে নোটিশ দেওয়াসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ভাবছে এনবিআর। প্রথম পর্যায়ে এনবিআরের লক্ষ্য থাকবে ব্যবসায়ী হিসেবে যাঁরা টিআইএন নিয়েছেন কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছেন না, তাঁদের এর আওতায় আনা। সাধারণত বেশির ভাগ চাকরিজীবী রিটার্ন দাখিল করে থাকেন। কারণ তাঁদের বেতনের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিলের একটি অফিশিয়াল সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া মোটরযান ও নৌযান, সব ধরনের ট্রেড লাইসেন্স এবং ঠিকাদার তালিকাভুক্তি কিংবা নবায়নের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আয়কর আদায় নিয়ে অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করদাতাদের মধ্যে যারা আয়কর রিটার্ন দেয়নি, তাদের তথ্য এনবিআরের কাছে রয়েছে। তাদের ফলোআপ করে জরিমানাসহ রিটার্ন আদায় করার ব্যবস্থা করতে হবে। তার পরও যদি তারা না দেয়, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তবে অভিযোগ রয়েছে, করযোগ্য আয় থাকলেও অনেকেই হয়রানির ভয়ে কর দিতে আগ্রহী হন না। তাঁরা মনে করেন, একবার করের জালে ঢুকে গেলে প্রতিবছরই কর দিতে হবে; কিংবা আগের বছরের চেয়ে আয় কমে গেলে কর কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জালে জর্জরিত হতে হবে। এর সত্যতা আছে। আগের বছরের চেয়ে আয় বা করের পরিমাণ কমে গেলে প্রতিবছর বহু করদাতাকে সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিস থেকে নোটিশ পাঠানো হয়। ব্যাখ্যা দিতে হয়, কেন আয় কমল। আবার কর দিতে গেলে নানা ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এসব ঝক্কিঝামেলাই কর দেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া আয় বাড়লেও একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানান অনেকেই।



সাতদিনের সেরা