kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

স্কুল যখন ব্যবসার পথও দেখাচ্ছে

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্কুল যখন ব্যবসার পথও দেখাচ্ছে

বাসায় বানিয়ে স্কুলে এসে পণ্য বিক্রি করছেন অভিভাবকরা

মার্জিয়া মাহামুদা আঁখি। কাশীপুর এলাকার ফুলকুঁড়ি শিশু নিকেতনে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। করোনাকালে তাঁর আয় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাচ্চু স্যারের পরামর্শে নকশিকাঁথা তৈরির কাজ শুরু করেন। কাঁথা বিক্রি থেকে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে সংসার চলে যাচ্ছে। তাঁর দেখাদেখি আরো অনেকেই কাঁথা সেলাইসহ অন্যান্য কাজ ধরেছেন। এতে তাঁদের পরিবারে সচ্ছলতা ফিরেছে।

করোনা অতিমারিতে অনেক মানুষই কাজ হারিয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক অনটনে পড়েছেন কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক। এ ছাড়া ছোটখাটো চাকুরে কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত অনেকেই বেকার হয়েছে। তাদের আত্মনির্ভরশীলতার পথ দেখিয়ে চলছেন একজন। তিনি হচ্ছেন আবদুস সোবহান বাচ্চু। বরিশাল কিন্ডারগার্টেন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।

‘এক ঘরের বানানো পণ্য, অন্য ঘরে দেবার জন্য’—এই স্লোগানের মধ্যেই তাঁর উদ্ভাবিত নতুন ব্যবসা আইডিয়া লুকায়িত আছে। করোনার মধ্যেই তাঁর দেখানো নতুন ব্যবসায় সফল অনেকেই। চাকরি হারানো অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে সেই আয় থেকে তাঁদের সন্তানদের পড়াচ্ছেন। অভিভাবকদের উৎপাদিত পণ্য এখন দেশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে বিদেশেও।

আবদুস সোবহান বাচ্চু বলেন, ‘করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। এ সময় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা হয়ে পড়েন সবচেয়ে অসহায়। তাঁরা বেকার হয়ে পড়লেন। পুঁজি নেই, অভিজ্ঞতা নেই, যা দিয়ে বিকল্পভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন। তাঁদেরকে নিয়ে ভাবলাম। তাঁদের জন্য কী করা যায়? দেখলাম, বিনা পুঁজিতে ব্যবসা করা যায়। তাহলে পণ্য কিনবে কে? তাও খুঁজে পেলাম। প্রতিবেশীরাই ক্রেতা হবে। যাঁদের সাধ্য আছে কিন্তু সময় নেই। নেই দক্ষতাও। সেই পরিকল্পনা থেকেই অভিভাবকদের নিয়ে পরিকল্পনা করলাম। কে কী জানেন। একজন বলেন, আমি নকশিকাঁথা তৈরি করতে পারি। আরেকজন বলেন, আমি আচার তৈরি করতে পারি। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নারী অভিভাবক বললেন, আমরা তেমন কিছু পারি না। তা ছাড়া ব্যস্ততার কারণে এ ধরনের কাজও করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে যদি অভিভাবকরা এগুলো তৈরি করেন, আমরা সেগুলো কিনে নেব।’

তিনি বলেন, ‘এভাবেই পণ্য তৈরি থেকে বাজারজাতের পরিকল্পনা সবাই মিলে তৈরি করলাম। প্রকল্পের নাম দিলাম ‘এক ঘরের বানানো পণ্য, অন্য ঘরে দেবার জন্য’। অভিভাবকরা যা তৈরি করেন, শুরুটা হয়েছিল নকশিকাঁথা দিয়ে। পরে পুঁতির ব্যাগ, বিভিন্ন ধরনের আচার, পিঠা-পায়েস ও পোশাক তৈরিতে গিয়ে ঠেকেছে। অভিভাবকদের অনেকেই পোশাক তৈরির পাশাপাশি তাতে হাতের কাজ করেন। নীপবন কিন্ডারগার্টেন অফিসে রেখে যান। সেখান থেকে যার যা প্রয়োজন অভিভাবকরা নগদ টাকায় কিনে নেন।’

যাঁরা দূরের অভিভাবক তাঁরা নিকটবর্তী ফোরামভিত্তিক কিন্ডারগার্টেনে রেখে যান। সেখান থেকে যাঁদের প্রয়োজন তাঁরা নিয়ে যান। নকশিকাঁথা ছাড়াও হাতে করা শাড়ি, অ্যাপ্লিক, অ্যাম্বুশ, ড্রেস, বেডশিট, কুশন, শোপিস, চটের ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি করছেন অভিভাবকরা। খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে রকমারি পিঠা, পায়েস, পুডিং, বিভিন্ন ধরনের আচার, গোলপাতাগাছের রসের গুড়, মহিষের দুধের দই ইত্যাদি।

নানা ধরনের আচার তৈরি করেন রাণী শরীফ নামের এক বৃদ্ধা। তিনি জানান, তাঁর নাতি নীপবন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী। করোনাকালে তাঁদের পরিবারে সংকট দেখা দেয়। নাতিকে পড়াতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। তখন বাচ্চু স্যার নতুন আইডিয়া দেন। সে অনুযায়ী তিনি আচার তৈরি করে নিয়ে আসেন। বাচ্চু স্যার সেই আচার অন্য অভিভাবকদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। তা থেকে মাসে যা আয় হয়, তা দিয়ে নাতির পড়ালেখা চলে। স্কুল খুললে নাতি যেমন স্কুলে আসতে পারবে, ঠিক তেমনিভাবে তাঁর আচারের ব্যবসা জমজমাট হবে। তাঁর দেখাদেখি আরো অনেক অভিভাবক আচার তৈরি করছেন।

বরিশাল কিন্ডারগার্টেন ফোরামের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরজু আক্তার আইভি। ‘এক ঘরের বানানো পণ্য, অন্য ঘরে দেবার জন্য’ প্রকল্পের সমন্বয়কারীর দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি জানান, অন্তত ২৫ জন শিক্ষক আর অভিভাবক মিলে প্রকল্পে কাজ করছেন।



সাতদিনের সেরা