kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ইসলামী অর্থায়নে বড় সম্ভাবনা ‘সুকুক’

ডিজিটাইজেশনেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইসলামী অর্থায়নে বড় সম্ভাবনা ‘সুকুক’

করোনা মহামারিতে বিশ্ব অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত তখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখাচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং। আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি অমুসলিম দেশগুলোতেও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে শরিয়াসম্মত সেবা। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো অর্থব্যবস্থায় করোনার প্রভাব পড়লেও ইসলামী ব্যাংকিং এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য শক্তি দেখাতে সমর্থ হয়েছে। বর্তমানে ইসলামী বন্ড সুকুক এবং ফিনটেকের ফলে ইসলামী ব্যাংকিং আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের তথ্য অনুযায়ী ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ইসলামী অর্থায়ন শিল্পে ২০২১-২২ সালে প্রবৃদ্ধি আসবে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। এটি সম্ভব হবে বিপুল ইসলামী বন্ড ইস্যুকরণ এবং প্রধান ইসলামী অর্থনীতির দেশগুলোয় পরিমিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ফলে।

গত মে মাসে প্রকাশিত এসঅ্যান্ডপির প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু উপসাগরীয় দেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়া এবং তুরস্কে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে জোরালো প্রবৃদ্ধি এবং সুকুক ইস্যু প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়েছে। বলা হয়, ২০২০ সালে ইসলামী অর্থায়নে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এসেছে, যদিও তা ২০১৯ সালের চেয়ে কিছুটা ধীরগতিতে। অথচ করোনার পাশাপাশি তেলের দাম পড়ায় দুটি বড় আঘাত এসেছিল। এ সময়ে ইসলামী অর্থনীতির সুদমুক্ত বন্ড সুকুকের ইস্যুকরণ বেড়েছে, যা ইসলামী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

দুবাইভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক আলপেন ক্যাপিটালের নির্বাহী পরিচালক হামিদ নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘ইসলামী অর্থায়ন শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে এরই মধ্যে চালকের ভূমিকায় উঠে এসেছে সুকুক। গত এক বছরে আমরা দেখলাম সুকুকের ইস্যুকরণ রেকর্ড ভেঙেছে। আশা করা যায় আগামী দিনেও এটি প্রবৃদ্ধির নেতৃত্বে থাকবে।’

তারল্য ব্যবস্থাপনা, বাজেট ঘাটতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ বিনিয়োগ ও গণ-অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগ হিসেবে ‘সুকুক’ এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী মুসলিম ও অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উভয় দেশগুলোয় বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সুকুকের মেয়াদের বিবেচনায় দুটি রূপ আছে। একটি স্বল্পমেয়াদি। এটি সাধারণত এক বছর বা এর কম মেয়াদি হয়ে থাকে। অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি। এটি সাধারণত এক বছরের অধিক হয়ে থাকে।

প্রচলিত আর্থিক বাজারে মুসলিম গ্রাহকদের বিনিয়োগ করার আগ্রহ থাকলেও তারা তা করতে পারেনি। কারণ শরিয়াহ আইন অনুযায়ী সুদ, জুয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ সমস্যাগুলোর বড় সমাধান হিসেবে সুকুক বা ইসলামিক বন্ড আবির্ভূত হয়। চুক্তি এবং অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে সুকুক ও প্রচলিত বন্ডের মধ্যে পার্থক্য আছে। সুকুক একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে সিলমোহর লাগিয়ে কাউকে অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়ার আইনি দলিল। প্রচলিত বন্ডে ইস্যুকারীর ঋণের দায়বদ্ধতার উপস্থাপন করে, অপর পক্ষে সুকুক কোনো সম্পত্তির মালিকানা নির্দেশ করে। সাধারণত সুকুকধারীরা সম্পদের মালিকানা লাভ করেন এবং মুনাফা পান। সুকুক ইস্যুকারী চুক্তি অনুসারে মেয়াদ শেষে ফেস ভ্যালুতে বন্ড কিনতে বাধ্য থাকে। ফলে মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি অমুসলিম দেশগুলোয়ও সরকারের পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছে সুকুক জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বের প্রথম অমুসলিম দেশ হিসেবে সুকুক ইস্যু করে যুক্তরাজ্য। ২০১৪ সালে প্রথম দেশটি ২৫৬ মিলিয়ন ডলারের সুকুক ইস্যু করে।

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিন্যানশিয়াল মার্কেটের (আইআইএফএম) সুকুক নিয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সুকুকের ইস্যুকরণ দাঁড়িয়েছে ১৭৪.৬ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০১৯ সালের চেয়ে ১৯.৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইস্যু হওয়া ৬৪৮ বিলিয়ন ডলারের সুকুকের ৯০ শতাংশ ইস্যু হয়েছে সুপ্রতিষ্ঠিত বাজার মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক এবং বাহরাইনে। এসঅ্যান্ডপির নোটে বলা হয়, ‘আমরা আশা করছি, এ বছর সুকুক ইস্যুর পরিমাণ আরো বাড়বে, কারণ পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে, করপোরেট এবং সভরেইনও বাজারে ফিরে আসছে।’

ইসলামী অর্থনীতিতে আরেকটি সহায়কা শক্তি এখন ফিনটেক। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বৈশ্বিক ব্যাংকিংয়ের অন্যান্য খাতের মতো ইসলামী ব্যাংকিংয়েও আগামী পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে প্রযুক্তি। সম্প্রতি ‘ফেইথ অ্যান্ড ফিন্যান্স : দ্য চেঞ্জিং ফেস অব ইসলামিক ব্যাংকিং’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এক জরিপের তথ্য উঠে আসে। ক্লাউড ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ম্যামবু পরিচালিত ওই জরিপে বিশ্বজুড়ে দুই হাজার মুসলিম তরুণ অংশগ্রহণ করেন। তাতে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, আগামী দিনের সম্ভাবনা হিসেবে তাঁরা অনলাইন ব্যাংকিংকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, ৭০ শতাংশ তরুণ বলেন, তারা ব্যাংকে না গিয়েই সব কাজ সারতে চান, ৭৪ শতাংশ জানান, তাঁরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংকের সব সেবা পেতে চান। ৮০ শতাংশ তরুণ বলেছেন, তাঁরা যেকোনো সময়ে যেকোনো স্থানে ব্যাংকের সেবা পেতে চান। তরুণদের এই প্রবণতা ইসলামী ফিনটেককেন্দ্রিক (আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান) অর্থনীতির গুরুত্বই বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ১২৭টি ইসলামী ফিনটেক ফার্ম রয়েছে, যারা শরিয়াসম্মত আর্থিক পণ্য দিচ্ছে। আইএফএন ইসলামিক ফিন্যান্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইসলামী ফিনটেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে সেবা দিচ্ছে ২৭টি ইসলামী ফিনটেক কম্পানি, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়ায় ১৯ কম্পানি, তৃতীয় স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত ১৫ কম্পানি, চতুর্থ স্থানে ইন্দোনেশিয়ায় ১৩ কম্পানি, পঞ্চম সৌদি আরবে ৯ কম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯ কম্পানি ইসলামী ফিনটেক সেবা দিচ্ছে।

মামবুর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক ইসলামিক ফিনটেক বাজার হবে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের।

সূত্র : ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকার



সাতদিনের সেরা