kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

♦ দেশের প্রতিটি মানুষকে ইসলামী ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের লক্ষ্য
♦ করোনা মহামারিতেও ২৬ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি

মানুষের আস্থায় শূন্য থেকে শিখরে ইসলামী ব্যাংক

মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা, এমডি ও সিইও, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ

মাসুদ রুমী   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষের আস্থায় শূন্য থেকে শিখরে ইসলামী ব্যাংক

শরিয়াহভিত্তিক সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ে মানুষের চাহিদা পূরণ করে শূন্য থেকে শিখরে উঠে এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ ইসলামী ব্যাংকিং গ্রাহককে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বে ইসলামিক মাইক্রো-ফিন্যান্স পদ্ধতির সফল প্রবর্তক ব্যাংকটি বলে মানবতার কথা, কল্যাণের কথা। আর তাই সুদমুক্ত ও কল্যাণমূলক ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের কাছে এখন এটি আস্থার নাম। ক্ষতিকর ও হারাম কোনো খাতে অর্থায়ন না করে প্রয়োজনভিত্তিক হালাল ও টেকসই উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে বিনিয়োগ করে দেশের শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংকের কাতারে উঠে এসেছে বলে জানালেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম আরো বাড়বে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার করা, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং আইন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি আলাদা শরিয়াহ বোর্ড প্রয়োজন বলে মনে করেন এই ব্যাংকার।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ইসলামিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক রয়েছে। এ ছাড়া আটটি প্রচলিত ব্যাংকের ১৯টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং ১১টি ব্যাংকের ১৭৮টি উইন্ডো ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি পাঁচ বছরে ইসলামী ব্যাংকের আমানত তিন গুণ হারে বাড়ছে। গ্রাহক আস্থাকে এর বড় কারণ বলে মনে করেন মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। তিনি বলেন, ‘সম্পদভিত্তিক ব্যাংকিং, দক্ষ পরিচালন কৌশল ও গ্রাহক আস্থা আমাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় ২৭ শতাংশ মার্কেট শেয়ার রয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে।’ ইসলামী ব্যাংকের এমডি জানান, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০৯ সালের গাইডলাইনের মাধ্যমে। এ ছাড়া প্রতিটি ইসলামী ব্যাংক ক্ষমতাসম্পন্ন শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, ব্যাংকগুলোর সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ডও বিষয়গুলো দেখাশোনা করে। তা সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো থাকলে এর নিয়ন্ত্রণ আরো সহজ হতে পারে। যেহেতু মূলধারার ব্যাংকারদের পক্ষে ইসলামী ব্যাংকের সূক্ষ্ম পর্যালোচনা কঠিন, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি আলাদা শরিয়াহ বোর্ডেরও প্রয়োজন রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর শিক্ষা, গবেষণা ও তত্ত্বের প্রয়োগ বিষয়ে আরো জোর দেওয়া জরুরি।

ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই রেমিট্যান্স সেবা দিয়ে আসছে বলে জানালেন মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সাল থেকে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি পাঠাই, যাঁরা প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করেন। আজ দেশ যার সুফল ভোগ করছে।’ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১৪৭টি রেমিট্যান্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের চুক্তি রয়েছে। দ্রুত রেমিট্যান্স সেবা প্রদানে ১০০টি এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে অ্যাপ্লিকেশন প্রগ্রাম ইন্টারফেস (এপিআই) স্থাপন করা হয়েছে। সারা দেশে ব্যাংকের শাখা-উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট মিলিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি ইউনিটে রয়েছে সহজে রেমিট্যান্স গ্রহণের ব্যবস্থা। বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং ইউনিটে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে রেমিট্যান্স সেবা দেওয়া হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংক ১৯৯৫ সাল থেকেই গ্রামীণ দরিদ্র ও কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় হিসাব খোলার ব্যবস্থা করেছে। এ ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামিক মাইক্রো-ফিন্যান্স কর্মসূচি। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের ২১টি ডিপোজিট স্কিম ও ২৪টি বিশেষায়িত বিনিয়োগ স্কিম আছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানের এই শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘আমরা দিচ্ছি সর্বোচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক সার্ভিস। আমাদের সেলফিন একটি ইউনিক ব্যাংকিং অ্যাপ। ইসলামী ব্যাংকের আই-ব্যাংকিং দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইন্টারনেট ব্যাংকিং সার্ভিস। অ্যাকাউন্ট ছাড়াই কম খরচে গ্রাহককে টাকা পাঠাতে আমাদের ক্যাশ-বাই-কোড সার্ভিস ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন উদ্ভাবন।’

তিনি আরো বলেন, ‘করোনা মহামারির প্রকটকালেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর তুলনামূলক অবস্থান ভালো ছিল। ২০২০ সালে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ আর বিনিয়োগে (ঋণ) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯.৬২ শতাংশ, যা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তুলনায় বেশি। দেশের রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মার্কেট শেয়ার বর্তমানে প্রায় ৪৩ শতাংশ। চলতি বছরেও ইসলামী ব্যাংকগুলো অধিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখেছে। ২০২০ সালে এককভাবে আমাদের ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি ছিল আমানতে ২৪.৬২ শতাংশ এবং বিনিয়োগে ১৫.১৬ শতাংশ। বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ।’

ইসলামী ব্যাংকের সফলতার কারণ জানতে চাইলে মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, ‘‘এ ব্যাংকের আবির্ভাব বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বাংলাদেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে এই ব্যাংকই প্রথম ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসে, যারা সুদসংক্রান্ত ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং এড়িয়ে চলত। সম্পূর্ণ নতুন ধারায় কার্যক্রম শুরু করা এ ব্যাংক দুই দশকের মধ্যে আমানত-বিনিয়োগসহ প্রায় সব সূচকে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে শীর্ষস্থানে উঠে আসে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য ব্যাংকার ম্যাগাজিনের জরিপে বিশ্বসেরা এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে এবং টানা ১০ বছর ধরে স্থান পেয়ে আসছে ইসলামী ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক কাউন্সিল সিবাফি ইসলামী ব্যাংককে ২০১৯ সালে ‘ওয়ার্ল্ডস বেস্ট ইসলামিক ব্যাংক’ হিসেবে পুরস্কৃত করে।’’

মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা ১৯৮৬ সালের ৬ মার্চ ইসলামী ব্যাংকে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসারে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিগুলোর বেশি প্রচলন ঘটাতে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে ইসলামী ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের লক্ষ্য। আমরা ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির সক্ষমতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই যেন সেটা দেশের সমপূর্ণ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধারণ করতে পারে। আমরা ইসলামী ব্যাংককে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেছি। শিগগিরই আমরা সৌদি আরবে একটি শাখা এবং দুবাইতে একটি প্রতিনিধি অফিস চালু করতে যাচ্ছি।’



সাতদিনের সেরা