kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মোটরসাইকেলশিল্পের বিকাশে চাই শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’

মাসুদ রুমী   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মোটরসাইকেলশিল্পের বিকাশে চাই শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’

জে একরাম হুসাইন, এমডি, টিভিএস অটো বাংলাদেশ

মোটরসাইকেল তৈরিতে ইঞ্জিন থেকে শুরু করে চেইন, সিট কভার ও অন্য নানা যন্ত্রাংশ উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে। এই প্রয়োজন মেটাতে ভেন্ডরনির্ভর ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করছেন টিভিএস অটো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জে একরাম হুসাইন। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, দেশের মোটরসাইকেল শিল্পকে পরবর্তী ধাপে নিতে হলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। এই শিল্প গড়ে না উঠলে দেশীয় মোটরসাইকেলশিল্প বিকাশ করা দুরূহ হবে বলে মনে করেন তিনি।

দেশের মোটরসাইকেলশিল্পে দক্ষ লোকবলের চাহিদা মেটাতে আমাদের স্থানীয় লোকবলকে আরো বেশি করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে বলে জানালেন জে একরাম হুসাইন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের মূলধন ও ঋণ সুবিধা সহজলভ্য করতে হবে। প্রথমত, যারা এই শিল্প নিয়ে ও এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে মূলধনের ব্যবস্থা করা এবং দ্বিতীয়ত, কাস্টমারদেরও জন্য ঋণ সুবিধা দিতে হবে।

উপমহাদেশের দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই কোনো গ্রাহক মোটরসাইকেল কিনতে চাইলে স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে থাকে, যা আমাদের দেশে শুরু হলেও এখনো দুরূহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সব ব্যাংক সহজ শর্তে গ্রাহকদের ঋণ প্রদান করলে মোটরসাইকেলের মার্কেট অনেক বড় হবে।’

বাংলাদেশে টিভিএস অটোর যাত্রা ২০০৭ সাল থেকে শুরু হলেও ভারতে এটি অনেক পুরনো কম্পানি। জে একরাম হুসাইন জানান, ট্রাস্ট ভ্যালু সার্ভিস বা টিভিএস ভারতে ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। টিভিএস যখন বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে তখন এটিই ছিল টিভিএসের প্রথম রপ্তানিকারক দেশ। টিভিএস গ্রুপ এখন ভারতের সবচেয়ে বড় কম্পোনেন্ট উৎপাদনকারী কম্পানি, যেটি বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি কম্পানির একটি।

দেশে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে করোনা মহামারি এই শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করেছে বলে জানালেন টিভিএস অটো বাংলাদেশের এমডি। তিনি বলেন, পারফরম্যান্স ও লুক টিভিএসের সাফল্যের নেপথ্যে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। গ্রাহক চাহিদার দৈনন্দিন পরিবর্তনশীল ধারার সঙ্গে সংগতি রেখে এর উৎপাদন ও নকশা গবেষণার কৌশলপট বিন্যস্ত করা হয়। নতুন ডিজাইন, ডিজাইন নবায়ন, উদ্ভাবন, মূল্য সংযোজনামূলক অগ্রগতি—এসব মিলিয়ে বাংলাদেশের অটোমোটিভ শিল্পের ইতিহাসে নজিরবিহীন রেকর্ড গড়েছে টিভিএস।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদনের শর্ত দিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়। ফলে আমরা মোটরসাইকেলেরও দাম কমানোর সুযোগ পাই। ২০১৫ সালে মোটরসাইকেলের মার্কেট ছিল দুই লাখের মতো। ২০১৯-এ এটি সাড়ে পাঁচ লাখে উঠে আসে। ২০২০ সালে আমরা আশা করছিলাম যে মোটরসাইকেলের মার্কেট সাড়ে ছয় লাখে পৌঁছাবে। কিন্তু করোনার ধাক্কায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমে ১১ শতাংশের মতো। আর ২০২১ সালে অবস্থা আরো খারাপ। প্রতিবছর মার্চ থেকে পবিত্র ঈদুল আজহা পর্যন্ত ভালো বেচাকেনার সময়। পহেলা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মিলিয়ে বাজার থাকে চাঙ্গা। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এই প্রধান সময়ে আমরা কোনো শোরুমই খুলতে পারিনি। তবে বছর শেষ মাসগুলোতে আমরা ভালো বিক্রির আশা করছি।’

গত বছর মোট বিক্রি ও প্রবৃদ্ধির পরিমাণ কত ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, মহামারির এই বছরে দেশে চার লাখ ৯০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫৯ হাজারের মতো কম। সব মিলিয়ে ২০২০ সালে বিক্রি কমে যায় ১১ শতাংশের মতো। বছরটিকে যদি দুটি ভাগ করে নেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে, দ্বিতীয় ভাগে মোটরসাইকেল খাত বেশ ভালো করেছে। যেমন—২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি কমেছিল ২৪ শতাংশের মতো। দ্বিতীয় ভাগ, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিক্রি বেড়েছে ৩ শতাংশের মতো।

জে একরাম হুসাইন বলেন, ‘আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ও অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্টে বছরে এক লাখ ৫০ হাজার বাইক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রযুক্তি ও স্থাপনা রয়েছে। এটি একটি স্টেট-অফ-দ্য-আর্ট স্থাপনা, এখানে মোটরবাইক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মান নিয়ন্ত্রণের পর বাজারজাত করা হয়। একটি মোটরসাইকেল তৈরিতে ৭০০-এর অধিক কম্পোনেন্ট তৈরি করতে হয়। সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল উৎপাদনে যেতে সময় লেগে যায় বহু বছর।’

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল কোনো বিলাসপণ্য নয়, বরং এটি এখন মানুষের প্রয়োজনীয় বাহন। মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কাজের জন্য যাচ্ছে মোটরসাইকেল নিয়ে। সরকারের কাছে আমার চাওয়া, এই শিল্পে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে তা রোধে কাজ করা ও এসংক্রান্ত কিছু আইন সংশোধন করা। দেশে মোটরসাইকেলের দাম পাশের দেশগুলোর তুলনায় এখনো বেশি। মোটরসাইকেলের দামের সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে পণ্যটির দাম সবচেয়ে বেশি। এ দেশে প্রতি ১৬১ জনে একজন মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। ভারতে প্রতি ২০ জনে একজন, আর পাকিস্তানে প্রতি ১৭ জনে একজনের মোটরসাইকেল রয়েছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মোটরসাইকেলের ব্যবহার আরো বেশি। এই তিন দেশে প্রতি চার থেকে পাঁচজনে একজনের মোটরসাইকেল রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে যে জনসংখ্যা, এর ব্যাপক সম্মুখ বৃদ্ধির কথা হিসাবে না ধরলেও, গড়ে বছরে অন্তত ১০ লাখ বাইক বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কম্পানিগুলো সব আমদানির শুল্কে সুুবিধা পেলে দেশে উৎপাদিত হলে মোটরসাইকেলের দাম আরো কমানো সম্ভব হবে।

টিভিএসের বিক্রয়োত্তর সেবার পরিধি আরো বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের গ্রাহকসেবা দেশব্যাপী ১১টি নিজস্ব শোরুম এবং ২৫০টির অধিক ডিলার নেটওয়ার্কে বিস্তৃত। এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে ‘থ্রি-এস’ সুবিধা, অর্থাৎ সেলস, সার্ভিস এবং স্পেয়ার পার্টস। এ ছাড়া সারা দেশে টিভিএসের রয়েছে এক হাজারেরও বেশি সার্টিফায়েড সার্ভিস পয়েন্টস (সিএসপি), ১৫০টির অধিক পার্টস ডিলার এবং হাজারেরও বেশি প্রশিক্ষিত মেকানিকের এক অটুট নেটওয়ার্ক। সার্ভিসের এই পদ্ধতিটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী এর সংখ্যাও বৃদ্ধি হয়।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে টিভিএস অটো বাংলাদেশের এমডি বলেন, ‘ক্রেতা সন্তুষ্টি, মানসম্পন্ন পণ্য, ডিলার সন্তুষ্টি ও টিভিএস পরিবারের উন্নয়নই আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অতি সম্প্রতি আমরা এনটর্ক নামের ১২৫ সিসির রেসিং স্কুটার বাজারে নিয়ে এসেছি, আশা করি এই নতুন বাইক দেশের তরুণ স্কুটার রাইডারদের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। গ্রাহক চাহিদার কথা মাথায় রেখে সামনের দিনগুলোতে আমরা আরো আধুনিক, আরো শক্তিশালী মোটরসাইকেল বাজারজাত করতে চাই। বিগত বছরগুলোতে আমরা যেমন তরুণদের কাঙ্ক্ষিত নতুন নতুন ফিচার সমৃদ্ধ বাইক বাজারে নিয়ে এসেছি, আগামী দিনগুলোতেও আমাদের একই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’