kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

লকডাউনে দুধ নিয়ে বিপাকে খামারি

সজীব আহমেদ   

১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লকডাউনে দুধ নিয়ে বিপাকে খামারি

চলমান কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে উৎপাদিত দুধ বিক্রি করতে পারছেন না খামারিরা। দেশের সব মিষ্টি তৈরির দোকান এবং মিল্কভিটা, প্রাণ ডেইরি মিল্ক, আড়ংসহ দেশের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কম্পানিগুলো দুধ কেনা কমিয়ে দেওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা লিটারপ্রতি ২০-৩০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমানে দেশে বার্ষিক প্রায় ৯৯ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হচ্ছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ। দেশের চলমান লকডাউন পরিস্থিতির কারণে দৈনিক কয়েক লাখ লিটার দুধ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। এতে খামারিদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। তাই এই সংগঠনের নেতারা ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে দুধ বিক্রি করতে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দুধ বিক্রিতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা না পেলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেবেন বলেও জানান নেতারা।

প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা জানান, কঠোর লকডাউন শুরু হওয়ার দু-এক দিন আগে থেকেই দুধের দাম কমতে শুরু করে। তখন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কম্পানিগুলোও দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দেয়। চলমান লকডাউনে মিল্কভিটা, প্রাণ, আড়ংয়ের মতো বড় কম্পানি দুধ কেনা কমিয়ে দিলেও অনেক কম্পানি দুধ সংগ্রহ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। এদিকে ছানার কারখানা বন্ধ থাকায় এবং মিষ্টির দোকানগুলোও বেশির ভাগ বন্ধ রাখায় খামারিদের দুধ বিক্রির আর কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে খামারিরা উৎপাদিত দুধ স্থানীয় বাজারে নিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করছেন। এর পরও অনেক দুধ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। একদিকে দুধ বিক্রি করতে না পারা, অন্যদিকে গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের লোকসান আরো বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ এমরান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের দুগ্ধ খামার শিল্পে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করছে। বর্তমান সময়ে আমাদের খামারিরা দুধ বিক্রি করতে পারছে না। কম্পানিগুলোও দুধ কিনছে না। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি রমজান মাসে যেভাবে সরকার ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে খামারিদের দুধ বিক্রি করেছিল, এখনো আগের মতোই দ্রুত ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র চালু করে দুধ বিক্রির ব্যবস্থা যেন করা হয়। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দুধ বিক্রিতে সরকার থেকে সহায়তা না পেলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেব।’

কুষ্টিয়া জেলা ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও লিয়াকত আলী ডেইরি ফার্মের মালিক মো. জাকিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কুষ্টিয়া জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০টির বেশি খামারে দৈনিক দুই লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এই দুধের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষে খায়। বাকি ৮০ শতাংশই বিভিন্ন কম্পানি ও মিষ্টির দোকানে বিক্রি হয়ে থাকে। এখন লকডাউনের কারণে কোনো কম্পানি দুধ নিচ্ছে না। কুষ্টিয়ায় কোনো মিষ্টির দোকানও খুলতে দিচ্ছে না। আমরা খামারিরা দুধ বিক্রির কোনো সুযোগ না পেয়ে দুধ ফেলে দিচ্ছি। যাদের ঘি তৈরি করার মেশিন আছে, তারা ঘি তৈরি করছেন। ছোট খামারিরা এ সুযোগে শেষ হয়ে যাচ্ছে। লিটারপ্রতি ১৫-২০ টাকা দামেও দুধ বিক্রি করতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘আমার নিজের খামারে ১০৫টি গরু রয়েছে, তার মধ্যে ৬৩টি গাভি দৈনিক ৪২০ লিটার দুধ দেয়। আমার  প্রতি মাসে ছয় লাখ ২০ হাজার টাকার গোখাদ্য লাগে। দুধ বিক্রি করে গোখাদ্য নিয়ে আসতে হয়। দুধ বিক্রি করতে না পেরে এরই মধ্যে আমার প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। এখন সরকার যদি মিষ্টির দোকানগুলো খুলে দেয় এবং কম্পানিগুলো যদি দুধ নেওয়া শুরু করে তাহলে খামারি বেঁচে যাবে, তা না হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’

বরিশাল বিভাগীয় ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মানিক অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক কামরুল হাসান খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি দুধ বিক্রি হতো মিষ্টির দোকান ও খোলাবাজারে। এখন খোলাবাজারে দুধ নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মিষ্টির দোকান অল্প সময়ের জন্য খোলা রাখলেও মানুষ না থাকায় বিক্রি কম। তাই তারাও দুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এখন আমরা খামারিরা মিলে বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ৩০ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করছি। রমজান মাসের মতো এখনো যদি সরকারি সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে আমাদের দুধ বিক্রি করতেন তাহলে খামারিদের জন্য খুবই উপকার হতো।’

তিনি বলেন, ‘একদিকে ন্যায্য মূল্যে দুধ বিক্রি করতে পারছি না, অন্যদিকে চড়া মূল্যে গোখাদ্য কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। দুধ বিক্রি না হলেও গরুকে তো খাওয়াতেই হচ্ছে। ন্যায্য মূল্যে দুধ বিক্রি করতে না পেরে বরিশালের সব খামারিই এখন ক্ষতিগ্রস্ত।’

সিরাজগঞ্জ জেলা ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলী আজম রহমান শিবলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন দুধ নিয়ে খুব বিপদে আছি। লকডাউনের কারণে কম্পানিগুলো নামমাত্র দুধ কিনছে। আগের লকডাউনগুলোতে সরকারের সহযোগিতায় বেসরকারি কম্পানিগুলো দুধ না কিনলেও মিল্কভিটা কিনত। এখন তারাও নামেমাত্র দুধ কিনছে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় প্রতিটি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ দুধ বিক্রয়কেন্দ্র ছিল সরকারের সহযোগিতায়। তখন আমরা দুধ বিক্রি করতে পেরেছিলাম। এই কেন্দ্রগুলো এখন আবার চালু করার জোর দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।’

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন দুধ বিক্রি করতে খামারিদের খুবই সমস্যা হচ্ছে। বিক্রি করতে না পারায় কিছু এলাকার খামারিরা দুধ ফেলে দিচ্ছেন। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি রমজান মাসে যেভাবে সরকার ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে খামারিদের দুধ বিক্রি করেছিল। এখন যেন আগের মতোই দ্রুত ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র চালু করে দুধ বিক্রির ব্যবস্থা করে সরকার। কারণ ক্রেতারা তো এখন বের হতে পারছে না, তাই তাদের হাতের কাছে যদি পৌঁছে দেওয়া যায় তাহলে তারা দুধ কিনবে।’

গোখাদ্যের দাম নিয়ে তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে গোখাদ্যের দাম যে পরিমাণ বেড়েছে, খামারিদের উচ্চমূল্যে গোখাদ্য কেনায় অনেক কষ্ট হচ্ছে। গোখাদ্যের আমদানিকারক তিন-চারটি বড় বড় কম্পানি। তারা প্রত্যেক বছরই গোখাদ্যের দাম বাড়িয়ে থাকে। আমদানিকারকরা কত টাকা দরে কিনে আনল, আর তারা কত টাকায় বিক্রি করল এদিকে কারো নজর নেই। আমদানিকারকরা সিন্ডিকেট করে প্রতিবছর দাম বাড়াচ্ছে।’



সাতদিনের সেরা