kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

মাসে লাখ টাকার মসলা বিক্রি করেন যে নারী উদ্যোক্তা

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাসে লাখ টাকার মসলা বিক্রি করেন যে নারী উদ্যোক্তা

আধুনিক একটি মসলা কারখানা স্থাপনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ফেরদৌস আক্তার

নারী উদ্যোক্তা ফেরদৌস আক্তার। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে কাজ করছেন গুঁড়া মসলা, শিমের বিচি, বিন্নি চাল ও আতপ চালের গুঁড়া নিয়ে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর প্রসিদ্ধ মিষ্টি মরিচের গুঁড়ার চাহিদা বেশি ক্রেতাদের কাছে। এ ছাড়া হলুদ, ধনিয়া, মেজবানি মসলা, বিরিয়ানি মসলা, মাংসের মসলা, জিরাসহ অনলাইনে প্রতি মাসে বিক্রি করেন লাখ টাকার পণ্য। এখন এই উদ্যোক্তা স্বপ্ন দেখছেন মাসে লাখ টাকা আয়ের। সে জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন আধুনিক একটি মসলা কারখানা স্থাপনের। আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আরো আগে থেকেই গুঁড়া মসলার সঙ্গে কাপড় নিয়েও কাজ শুরু করেছেন তিনি। বিশেষ দিনগুলোতে তাঁর পণ্যের চাহিদা বাড়ে। বাঙালিরা বিশেষ দিনে খাবারের আয়োজন করে বেশি। তাই উত্সবে মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা খুব বেড়ে যায়। উদ্যোক্তাজীবনের প্রায় এক বছরে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন আরো চারজন কর্মী। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা হয় ফেরদৌস আক্তারের।

ফেরদৌস আক্তার বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘কুক মাসালা’। চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের গোচরা গ্রাম থেকে আমি ‘উই’-এর (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম) উদ্যোক্তা হয়ে কাজ করছি। আমার উদ্যোক্তাজীবন শুরু হয় ২০২০ সালের জুলাই মাসে। আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমার ভাবনা থেকেও অনেক বেশি। আমার প্রতিষ্ঠান কুক মাসালার প্রডাক্ট দেশের ৬৪টি জেলায় ছড়িয়ে এখন বিদেশেও সুনাম অর্জন করেছে।”

ফেরদৌস আক্তারের পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গশ্চি মাঝি পাড়ায়। এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যালেও দুই বছর পড়ালেখা করেছেন। রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটার লুত্ফুল বারি পারভেজের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর তাঁর পড়ালেখা থমকে যায়। তখনই তাঁর স্বপ্ন জাগে উদ্যোক্তা হওয়ার। এখন বসবাস করেন উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের গোচরা গ্রামে।

ফেরদৌস জানান, গত বছরের জুলাইয়ে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় স্বামীর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। দুই সন্তান নিয়ে কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। ফেসবুক গ্রুপ ‘উই’-এর সন্ধান পেয়ে ব্যবসা শুরু করেন ফেরদৌস। মাত্র ১০ কেজি মরিচ কিনে সব প্রক্রিয়ার ভিডিও আপলোড দেওয়ার পর গ্রুপে ওই দিন ছয়জন মরিচের গুঁড়ার অর্ডার দেন। প্রতিদিন মরিচ, হলুদ আর মসলার গুঁড়ার অর্ডার বাড়তে থাকে। ওই মাসে লাখখানেক টাকার মসলার গুঁড়া বিক্রি হয়। এর পর থেকে ফেরদৌসকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। করোনার অতিমারি পাল্টে দিয়েছে তাঁর জীবন। এখন ফেরদৌসের ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে সারা দেশে নিয়মিত ক্রেতা ৫০০ জনের ওপরে। গত এক বছরে এক হাজার ১১২ জনের কাছে গ্রুপের মাধ্যমে ১১ লাখ ২০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

উইয়ের ফেসবুক গ্রুপ এই কাজে ফেরদৌসকে বেশ সহযোগিতা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন পূরণের প্ল্যাটফর্ম উই না থাকলে আমার উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন হয়তো জন্মই নিত না। উই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার পর রাজিব আহমেদ স্যারের অনুপ্রেরণায় আমার ভেতর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন জন্ম নেয়। উইয়ের প্রেসিডেন্ট নাসিমা আকতার নিশা আপু উই প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করেছেন।’

উদ্যোক্তাজীবনে পরিবার থেকে ভালোই সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে ফেরদৌস বলেন, ‘পরিবারের সবাই আমাকে সাপোর্ট ও সহযোগিতা করে। তাদের সহযোগিতা ছিল বলেই এতটুকু আসতে পেরেছি। বিশেষ করে আমার স্বামী পারভেজ আমাকে খুব সহযোগিতা করে।’ তিনি জানান, ৬৪ জেলার মধ্যে ঢাকার উত্তরা ও মিরপুর থেকে সবচেয়ে বেশি অর্ডার হয়। হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচের গুঁড়ার চাহিদা বেশি ক্রেতাদের। এ ছাড়া হলুদ, ধনিয়া, মেজবানি মসলা, বিরিয়ানি মসলা, মাংসের মসলা, জিরা, বিন্নি চাল, শিমের বিচি, আতপ চালের গুঁড়াও তিনি বিক্রি করেন। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে মসলার অর্ডার বেড়েছে তাঁর। অর্ডার নেওয়ার পর সপ্তাহে দুই দিন তিনি পণ্য ডেলিভারি দেন।

রাঙ্গুনিয়ায় স্থানীয়ভাবে প্রথম শ্রেণির কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর শাখা না থাকায় চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে হয় বলে জানান ফেরদৌস। তিনি চান ‘কুক মাসালা’ নামে এই পণ্যের ব্যবসা ব্যাপক পরিসরে করতে। এখন স্বপ্ন দেখছেন রাঙ্গুনিয়ায় স্থায়ীভাবে একটি কারখানা স্থাপনের। সেটি হলে নিজের পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হবে। 

ফেরদৌস আক্তার বলেন, ‘আমি একজন নারী। এই পরিচয় দিতে একসময় দ্বিধা কাজ করত। কিন্তু এর সঙ্গে উদ্যোক্তা শব্দটি যোগ হয়েছে। আর আজ নারী উদ্যোক্তা পরিচয় দিতে আমার অহংকার এবং গর্ববোধ হয়। কারণ আজ আমি বোঝা থেকে নিজেকে সম্পদে পরিণত করেছি। আমার এই কাজে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার বড় আপা। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন অনেকে বাজে কথা বলেছিল। সেসব বাজে কথা এবং ঝামেলা থেকে আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে আমার বড় আপা, যাকে আমি সম্প্রতি হারিয়ে ফেলেছি।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সোনিয়া সফি বলেন, ‘ফেরদৌস একজন সফল উদ্যোক্তা। নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই ফেরদৌসের মতো উদ্যোগী হতে হবে। ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়।’



সাতদিনের সেরা