kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

হালুয়াঘাটে রত্না আক্তারের উদ্যোগ

চুলের তৈরি টুপি যাচ্ছে চীনে

♦ রত্নার সঙ্গে কাজ করছেন ৬০ জন নারী
♦ প্রতি টুপিতে পারিশ্রমিক ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা

মাজহারুল ইসলাম মিশু, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ)   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চুলের তৈরি টুপি যাচ্ছে চীনে

রত্নার বাড়িতে চুলের টুপি তৈরি করছেন নারীরা।

মাছ চাষ দিয়েই চলত সংসার, কিন্তু প্রচুর লোকসান হওয়ায় অর্থাভাবে পড়ে পরিবারটি। স্বামীর এমন দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ান স্ত্রী রত্না আক্তার। ফুলপুর উপজেলার পাটতলা গ্রামে স্বামীর বাড়িতে রত্নার সঙ্গে পরিচয় হয় চুলের টুপি তৈরি করা এক নারী উদ্যোক্তার। সেখানেই প্রথম চুলের টুপি বানাতে শেখেন তিনি। পাঁচ মাস সেখানে কাজ করার পর সিদ্ধান্ত নেন নিজেই উদ্যোগী হয়ে করবেন এই ব্যবসা।

২০২০ সালের শেষের দিকে স্বামীকে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়ি টিকুরিয়া গ্রামে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে কয়েকজন দরিদ্র কর্মহীন নারীকে চুলের টুপি বানানোর কাজ শেখান রত্না। ধীরে ধীরে কর্মীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাঁর অধীনে ৬০ জন নারী কাজ করছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীও রয়েছে। প্রতিদিন কাজের ফাঁকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে নারীরা আসেন রত্নার বাসায়। ঘণ্টাখানেক কাজ করার পর আসে আরেকটি দল। এভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারীরা কাজ করেন তাঁর সঙ্গে।

ছোট-বড় প্রকারভেদে প্রতিটি টুপির জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেন তিনি। তবে সংসারে কাজের ফাঁকে করা হয় বলে একটি টুপি তৈরি করতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। রত্না আক্তার জানান, প্রথমে ঢাকা থেকে মানুষের চুল আনা হয়, তারপর এখানে টুপি বানিয়ে আবার ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনে রপ্তানি করা হয়। একটি টুপি বিক্রি করে রত্নার দেড় থেকে দুই শত টাকা লাভ হয়। এভাবে তিনি প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। টুপি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে চুলের সঙ্গে নেট, সুই, ক্লাম ব্যবহার করা হয়। রত্নার স্বামী ইউসুফ এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন।

রত্নার সঙ্গে কাজ করতে আসা টিকুরিয়া গ্রামের শিক্ষার্থী পপি বলেন, ‘করোনার কারণে আমাদের কলেজ দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে। ফলে বাসায় সময়টা অযথা নষ্ট হচ্ছে। একদিন রত্না আপার এখানে এসে দেখি, কয়েকজন নারীকে তিনি চুলের টুপি বানানো শেখাচ্ছেন। বিষয়টি দেখে আমিও এ কাজে উৎসাহী হই। কয়েক দিনে এ কাজ আমি শিখে ফেলি। বর্তমানে লেখাপড়ার পাশাপাশি এ কাজ করে আমি সংসারে সহযোগিতা করছি। নিজের খরচও চালাতে পারছি।’

আরেক শিক্ষার্থী নবম শ্রেণি পড়ুয়া সাদিয়া বলে, ‘বর্তমানে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় হাতে অনেক সময়। আমি আমার পাশের বাড়ির এক আপার মাধ্যমে চুলের তৈরি টুপির বিষয়টি জানতে পারি। পরে আমি নিজেও এ কাজে অংশগ্রহণ করি। বর্তমানে আমি পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছি। এ কাজে পরিবারও আমাকে উৎসাহিত করছে।’

নারী উদ্যোক্তা রত্না আক্তার বলেন, ‘অর্থের অভাবে আমি প্রথমে নিজে চুলের তৈরি টুপি বানানোর কাজ শিখেছি। কাজ শেখার পরে স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসি। এখানে এসে প্রথমে আশপাশের আমার মতো নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীদের চুলের টুপি বানানোর প্রশিক্ষণ দিই। আস্তে আস্তে লোক বাড়তে থাকে। বর্তমানে আমার এখানে ৬০ জন নারী কাজ করছেন, কিন্তু এ কাজে আমি কোনো সহযোগিতা বা ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় বড় করতে পারছি না। অনেকে আমার এখানে আসেন। তাঁদের বসার জন্য জায়গা দিতে পারি না। আমার পরিকল্পনা রয়েছে যদি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই তাহলে এক থেকে দেড় শত নারী আমার এখানে কাজ করতে পারবেন।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তা রত্না আক্তার’-এর এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এভাবে উদ্যোক্তা তৈরি হলে আমাদের দেশের বেকারত্ব যেমন কমবে, তেমনি দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন হবে। আর এমন উদ্যোক্তার জন্য আর্থিক কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বা কোনো ঋণের প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করবে। রত্না আক্তারের মতো অন্যরাও যেন এগিয়ে আসতে পারে, সে জন্য তাঁকে মডেল হিসেবেও আমরা উত্থাপন করতে পারব।’



সাতদিনের সেরা