kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

শুল্ক কমেছে উচ্চাভিলাষী হাইব্রিড গাড়িতে

মধ্যবিত্তের অধরাই থাকল ব্যক্তিগত গাড়ি

♦ দামে কম হওয়ায় বর্তমানে বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই দখল করে রেখেছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। কিন্তু এবারের বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি নিয়ে কোনো সুখবর নেই
♦ ব্যবসায়ীরা বলছেন, জনপ্রিয় হাইব্রিড গাড়িগুলোতে শুল্ক কমানো হয়নি বরং কমেছে উচ্চাভিলাষী গাড়িতে। এতে দেশের গাড়ির বাজারে কোনো প্রভাব পড়বে না।

সজীব আহমেদ   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মধ্যবিত্তের অধরাই থাকল ব্যক্তিগত গাড়ি

করোনার ধাক্কা সামলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় গত জানুয়ারি মাস থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গাড়ির ব্যবসা। দেশে নতুন ও রিকন্ডিশন্ড—এই দুই ধরনের গাড়ি বিক্রি হয়। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের কাছে রিকন্ডিশন্ড গাড়িই বেশি পছন্দ। দামে কম হওয়ায় বর্তমানে বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই দখল করে রেখেছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। কিন্তু এবারের বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি গাড়ি নিয়ে কোনো সুখবর না থাকলেও জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব কিছু হাইব্রিড গাড়ির সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে।

যদিও গাড়ি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে জনপ্রিয় হাইব্রিড গাড়িগুলো আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়নি। উচ্চসিসির গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে সরকার। তাই এই গাড়িগুলোর দাম কমানোর প্রভাব বাজারে পড়বে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে তৈরি

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ গাড়ি তৈরিতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে সরকার পুরনো গাড়ির বদলে পরিবেশবান্ধব এবং দেশে তৈরি গাড়ির দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।

বাজেটে যেসব হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে সেগুলো ২০০১ সিসি থেকে ৩০০০ সিসি পর্যন্ত। দেশে জনপ্রিয় হাইব্রিড গাড়িগুলো ১৫০০ সিসি থেকে ২০০০ সিসির মধ্যে। শুল্ক কমানো হাইব্রিড গাড়ির মধ্যে আছে হেরিয়ার হাইব্রিড দাম ছিল প্রায় ৬৫ লাখ টাকা, সেটির দাম কমে হবে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। লেক্সেস এন এক্স ৩০০ এইচ হাইব্রিডের দাম ৬৫ লাখ টাকা, সেটি হবে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এলফা বলফাইয়ার হাইব্রিড দাম ৯০ লাখ টাকা, সেটি হবে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা। সাই ক্রেমরি ক্রাউন হাইব্রিড এটির দাম ছিল প্রায় ৭০ লাখ, কমে হবে ৬০ লাখ টাকা। নোহা স্কয়ার হাইব্রিড দাম ছিল ২৮ লাখ টাকা, সেটি কমে হবে ২৩ লাখ টাকা।

মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রেও ১৮০০ থেকে ২০০০ সিসির ওপরে গাড়ির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ১৮০০ সিসির ওপরের মাইক্রোবাস সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। আর ১৮০০ সিসির ওপরে কার-জিপের ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে। সেগুলোও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। ফলে উচ্চবিত্ত বা বিশেষ শ্রেণির ক্রেতারা এই সুবিধা পাচ্ছে। একই সঙ্গে গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত ১২-১৫ সিটের হাইয়েস মাইক্রোবাস আমদানিতেও কোনো শুল্ক কর কমানো হয়নি। তাই এগুলোর দাম আগের মতোই থাকবে।

রাজধানীর কুড়িলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শোরুম এসবি ট্রেডিংয়ের মালিক শামিম হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাড়ির বাজারে বাজেটের কোনো প্রভাব এখনো পড়েনি। কারণ বাজারে যেসব গাড়ি আছে সেগুলো তো আগের নির্ধারিত শুল্ক দিয়েই নিয়ে আসা হয়েছে। সরকার রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে কোনো সুযোগ দেয়নি। আমাদের চাওয়া ছিল বাংলাদেশে যেসব গাড়ি বেশি চলে সেগুলোতে শুল্ক কমানোর। সরকার এ বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিয়ে উচ্চসিসির গাড়িতে শুল্ক কমিয়েছে। এই গাড়িগুলো মূলত অর্ডার ছাড়া খুব কম আনা হয়।’

রাজধানীর টোকিও মোটরসের মালিক মো. মেহেদী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাপানের রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসায়ী হিসেবে বাজেটে যা প্রত্যাশা করেছিলাম, ওই জায়গাটি পূরণ হয়নি। গাড়ির দাম কমা নিয়ে যে ঘোষণা এসেছে সেটার কারণে গ্রাহকরা মনে করছেন প্রতিটি গাড়িতে সরকার শুল্ক কমিয়েছে। গ্রাহক এসেই আমাদের জিজ্ঞেস করছেন গাড়ির দাম তো চার-পাঁচ লাখ টাকা করে কমেছে। আসলে গ্রাহকের কাছে ভুল বার্তা চলে গেছে। তাই আমি বলব, অতি দ্রুত কর্তৃপক্ষ এই জায়গাটিতে স্পষ্ট করে দিক এবং অফলাইন ও অনলাইন মিডিয়াতে যাতে ভালোভাবে প্রচার দিক।’

প্রগতি সরণি বারিধারায় এএসআর অটোকারের ম্যানেজার শাহরুখ মো. ইয়াসিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজেটে শুল্ক কমানোর বিষয়টি নিয়ে একটি ভুল বার্তা গেছে। মানুষ মনে করছে, সব ধরনের হাইব্রিড গাড়ির দাম কমছে, কিন্তু মূলত কয়েকটি মডেলের হাইব্রিড গাড়ির দাম কমছে। ২০০১ সিসি থেকে ২৫০০ সিসির বেশি মডেলের হাইব্রিড গাড়িতে শুল্ক কমানো হয়েছে। ১৮০০ মডেলের একটি নোহা স্কয়ার হাইব্রিড গাড়িতে শুল্ক কমানো হয়েছে। তবে আমাদের দেশে জনপ্রিয় হাইব্রিড গাড়িগুলো সব ১৫০০ সিসির মধ্যে। এগুলোই মূলত মধ্যবিত্তরা ব্যবহার করে। এগুলোতে শুল্ক কমালে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সবার জন্য খুব ভালো হতো। ২০০১ সিসি থেকে ২৫০০ সিসি গাড়ির ক্ষেত্রে বছরে ট্যাক্স দিতে হয় ৭৫ হাজার টাকা। তাই এই গাড়িগুলো মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ও পরিবেশক সমিতির (বারভিডা) সাবেক সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজেট ঘোষণার পর এখনো তেমনভাবে মার্কেটে প্রভাব পড়েনি। তবে মানুষজন দামের ব্যাপারে শোরুমে গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। আমাদের শোরুমে যেসব গাড়ি আছে সেগুলো তো গত বাজেটের গাড়ি। সেগুলো আগের শুল্কেই আমরা নিয়ে এসেছি। এখন কিছু হাইব্রিড গাড়ির ২০০১ থেকে ২৫০০ সিসির শুল্ক কমিয়েছে। সে গাড়িগুলো বাজারে আসতে এখনো অনেক সময় লাগবে। তবে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল ১২-১৫ সিটের মাইক্রো গাড়ির শুল্ক কমানোর, সেটা আমরা কমাতে পারিনি। নসিমন ও করিমনের পরিবর্তে আমরা চাইছিলাম ১২-১৫ সিটের মাইক্রোগাড়িগুলো গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু বাজেটে সেটি প্রতিফলিত হয়নি। আমরা দাবি রাখব, ১২-১৫ সিটের মাইক্রোবাসগুলো আছে সেগুলোর শুল্ক কমানোর জন্য। জ্বালানি তেল সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ি ১৫০০ সিসি, ১৮০০ সিসি এবং ২০০০ সিসির গাড়িগুলোর ক্ষেত্রেও শুল্ক কমানোর জন্য।

বাংলাদেশে জনপ্রিয় রিকন্ডিশন্ড কম দামি গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে, টয়োটা একুয়া ২০১৩-১৪ মডেলের দাম ১৩ লাখ টাকা। এক্সিও হাইব্রিড গাড়ি ২০১৫ মডেলের দাম সাড়ে ১৬ লাখ টাকা এবং গাড়ি ১৭ লাখ টাকা। ফিল্ডার হাইব্রিড গাড়ি ১৬ লাখ টাকা এবং গাড়ি সাড়ে ১৬ লাখ টাকা। এলিয়ন ২০১৬ মডেলের ২৬ লাখ টাকা। প্রিমিও ২০১৬ মডেলের তেলের গাড়ি ২৭ লাখ টাকা।

গাড়ি বিক্রির বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে এএসআর অটোকারের ম্যানেজার শাহরুখ জানান, ‘গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল—এই চার মাস খুব ভালো বিক্রি ছিল তখন মাসে ১৫-২০টি গাড়ি বিক্রি করা গেছে। তবে মাঝে আবার করোনার পরিস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি কমে গিয়েছিল। এখন আবার বাজেটের কারণে কিছু বিক্রি কমেছে।

এখন মাসে দু-একটি গাড়ি বিক্রি হচ্ছে। কারণ মানুষ আশায় ছিল বাজেটে গাড়ির দাম কমতে পারে; সেই আশায় অনেকে গাড়ি কেনেনি। এখন অনেকে এসে গাড়ি দেখে যাচ্ছেন। তবে আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারব।’



সাতদিনের সেরা