kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

চলতি মৌসুমে আম সংগ্রহে প্রাণ

গুটি আমে বাড়বে পাল্প রপ্তানি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গুটি আমে বাড়বে পাল্প রপ্তানি

মে থেকে আগস্ট—বছরের এই চার মাস পাকা আমের মৌসুম। দেশে আমের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা ও দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এ সময় গাছে গাছে থাকা পাকা আম পাড়ায় ব্যস্ত থাকেন চাষিরা, হাট-বাজারে চলে পাকা আম কেনাবেচার পূর্ণ ধুম। আর এই অঞ্চলের সুস্বাদু আমের স্বাদ সারা বছর ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে রাজশাহী অঞ্চলের গোদাগাড়ীতে এবং নাটোরের একডালায় বিশাল পাল্প সংগ্রহ কারখানা করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ, যেখানে প্রতিদিন ৫৫০ টন আমের পাল্প করার সক্ষমতা রয়েছে।

চলতি বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁ অঞ্চলে ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ ছাড়া নাটোর, পাবনা ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাতেও এ বছর আমের ভালো ফলন হয়েছে। এসব আমের মধ্যে রয়েছে গুটি আম, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন ধরনের আম। প্রাণ সারা বছর ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক, ম্যাংগো বার, আচার, চাটনি প্রভৃতি আমজাত বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির জন্য আমের এ মৌসুমে চাষিদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করে পাল্প তৈরি করে। আমের জন্য খ্যাত জেলাগুলোয় প্রাণের প্রায় ১২ হাজার চুক্তিভিত্তিক চাষি রয়েছেন যাঁদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করা হয়। প্রাণের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আম চাষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষক সৌভাগ্যের মুখ দেখছেন। প্রাণ আম চাষিদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে আম সংগ্রহ করে থাকে। ফলে আম চাষীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় তাঁরা আরো চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং দিন দিন লাভবান হচ্ছেন।

প্রাণ আম চাষিদের কাছ থেকে মূলত গুটি এবং আশ্বিনা এই দুই জাতের আম কিনে থাকে। চলতি বছরে প্রাণ প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন পাকা আম কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে ও সে অনুযায়ী আম সংগ্রহ শুরু করেছে। গোদাগাড়ীতে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আম এবং নাটোর, নওগাঁ, পাবনাসহ পার্শ্ববর্তী জেলার আম নাটোর কারখানার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারখানায় পহেলা জুন থেকে গুটি আম সংগ্রহ ও পাল্পিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা চলবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এরপর আশ্বিনা আম থেকে পাল্প সংগ্রহ শুরু হবে। কারখানায় আম সংগ্রহ চলবে আগস্ট পর্যন্ত আমের সরবরাহ থাকা সাপেক্ষে। পাল্পের জন্য মূলত গুটি ও আশ্বিনা জাতের আমই সবচেয়ে ভালো। সংগৃহীত আম থেকে পাল্প উত্পাদন করে অ্যাসেপটিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়।

প্রাণের রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে অবস্থিত প্রাণের বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল কারখানায় এবং নাটোরের একডালায় অবস্থিত প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেড কারখানায় সংগৃহীত আম থেকে কয়েকটি ধাপে পাল্প তৈরি হয়। ফ্যাক্টরিতে আম প্রবেশের সময় কোয়ালিটি কন্ট্রোলার দ্বারা আম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা গ্রহণ করা হয়। প্রথমে আমগুলো পাকা কি না তা দেখা হয়, পোকা-রোগমুক্ত এবং পচা কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এরপর ল্যাবে পাঠানো হয় ফরমালিন, পি-এইচসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য। ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হলেই কেবল তার আম ফ্যাক্টরিতে প্রসেসের জন্য নেওয়া হয়।

প্রসেসিং ধাপে আমগুলো প্রথমে কনভেইনার বেল্টে ঢালার পর কয়েকটি ধাপে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে আমকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর আটোমেটিক মেশিনে আম থেকে পাল্প ও আঁটি আলাদা করা হয়। রিফাইনারি মেশিনে পাল্প পরিশোধন এবং স্টেরালাইজড করে পাল্পকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর কোনো হাতের স্পর্শ ছাড়াই অ্যাসেপটিক প্রযুক্তিতে পাল্প সংরক্ষণ করা হয়। এই পদ্ধতির সুবিধা হলো কমপক্ষে দুই বছর জন্য পাল্প নিরাপদ, তাজা ও স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে।

এই পাল্প সংরক্ষিত স্থান থেকে ড্রামে করে চাহিদার ভিত্তিতে নরসিংদীর প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, গাজীপুরের আরএফএল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক এবং হবিগঞ্জে অবস্থিত প্রাণের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্রুট ড্রিংক ও জুস তৈরির জন্য। এরপর জুস তৈরির কারখানায় স্বয়ংক্রিয় মেশিনে কোনো ধরনের হাতের স্পর্শ ছাড়াই উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি করা হচ্ছে প্রাণ ফ্রুটো ম্যাংগো ড্রিংকসহ বিভিন্ন ধরনের ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক ও জুস। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ফ্রুট ড্রিংক ও জুসের বাজার প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এই বাজার আবার প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

প্রাণ গ্রুপ ১৯৯২ সাল থেকে আমের জুস বাজারজাত শুরু করে। আর এখন দেশে ফলের জুস ও ডিংকসের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রাণ। জুস বা ড্রিংক বাজারের ৬৫ শতাংশই প্রাণের দখলে। পাশাপাশি বিশ্বের ১৪৫টি দেশে জুস ও ড্রিংক নিয়মিত রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। করোনাকাল বাদ দিলে প্রতিবছরই রপ্তানি বাড়ছে। দেশে ৯০ দশকের শেষ দিকে আমের জুসের বাজার দ্রুত বেড়েছে। তবে নানা রকম গুজব ও অপপ্রচারের কারণে এ ব্যবসা বাড়ছে ধীরে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন হওয়ায় ফলের জুস বা ড্রিংকের বড় সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের মধ্যে অস্বচ্ছতা দূর করা প্রয়োজন। এ ছাড়া আমের পাল্প তৈরির জন্য ভালো গুটি আমের চাষ বৃদ্ধি করা দরকার। দেশে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ আরো বাড়াতে হবে। এতে একদিকে যেমন কৃষক লাভবান হবেন, অন্যদিকে দেশ ও দেশের বাইরে বাংলাদেশি ফ্রুট ড্রিংক ও জুসের বাজার বাড়বে। পাশাপাশি পাল্প সংগ্রহ বাড়ানো গেলে শুধু ড্রিংক ও জুস তৈরি নয়, সরাসরি রপ্তানি করা যাবে ম্যাংগো পাল্প। প্রাণ গ্রুপের লক্ষ্য আগামী দিনে ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংকের পাশাপাশি সরাসরি ম্যাংগো পাল্প বিদেশে রপ্তানি করা।



সাতদিনের সেরা