kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

আমের বাজার ১৫ হাজার কোটি টাকার

রোকন মাহমুদ   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমের বাজার ১৫ হাজার কোটি টাকার

একটা সময় কৃষকরা আম বিক্রি করতেন গড়ে ২০ টাকা কেজি। এখন তা ৫০ টাকারও ওপরে। নানা কারণে ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় আমে মুনাফার ভাগও বেশি হওয়ায় বাগান মালিকরা এখন আম চাষে ঝুঁকছেন। রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরার গণ্ডি পেরিয়ে আমের চাষ হচ্ছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অঞ্চলগুলোতেও। ফলে প্রতিবছরই আমের বাজার বাড়ছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছে যাচ্ছে দেশের আম। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতিসহ সাতক্ষীরা ও নওগাঁর আম। শুধু যে আমের উত্পাদন বেড়েছে, তা নয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্পাদিত আমের জাতের সংখ্যাও বেড়েছে। আগে দেশের মানুষ ফজলি, ল্যাংড়া, আশ্বিনিসহ চার থেকে পাঁচ জাতের আম চিনত। এখন ক্ষীরশাপাতি, হিমসাগর, আম্রপালি, গোপালভোগ, লক্ষ্মণভোগসহ ১০ থেকে ১২ জাতের আম উত্পাদিত হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে গত বছর দেশে বাগান ও বাগানের বাইরে মোট ২৫ লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদন হয়েছে। ডিএই কর্মকর্তারা আমের বাজারমূল্যের সঠিক হিসাব না দিতে পারলেও তাঁরা বলছেন, আমের কেজি এখন গড়ে ৬০ টাকা। সে হিসাবে ২৫ লাখ টন আমের বাজারমূল্য ১৫ হাজার কোটি টাকা হয়। এ ছাড়া এর সঙ্গে প্যাকিং, পরিবহন, বালাইনাশক ইত্যাদি আনুষঙ্গিক খরচ হিসাব করলে আমের মোট বাজার ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা হবে।

ডিএইর মহাপরিচালক মো আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা সময় মানুষ শুধু কয়েক জাতের আমের নাম জানত। এখন অনেক আম বাজারে পাওয়া যায়। এটার কারণ এখন সারা দেশেই আম উত্পাদন হচ্ছে। রাজশাহী, নওগাঁর গণ্ডি পেরিয়ে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটিসহ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতেও আমের বাগান গড়ে উঠেছে। ওই সব অঞ্চলের মানুষ পতিত জঙ্গল বা কাঠজাতীয় গাছের বাগান কেটে আমের বাগান করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত অর্থবছর, অর্থাৎ ২০১৯-২০ বছরে দেশে আগের বছরের তুলনায় গত বছর আমের উত্পাদন বেড়েছে তিন হাজার টন। তবে আমের উত্পাদনের মোড় ঘোরে ২০১৮ সালে। ওই বছর ২০১৭ সালের তুলনায় এক লাফে আমের উত্পাদন বাড়ে ৫৩ হাজার মেট্রিক টন। বিবিএসের হিসাবে গত বছর মোট দুই লাখ ৩৫ হাজার ৩৪৩ একর বাগানে আমের উত্পাদন হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বাবুল চন্দ্র সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা সময় কৃষকরা আমের দাম খুব একটা পেতেন না। কারণ আমের পরিবহনব্যবস্থা ও ভোগ কম থাকায় চাহিদা তেমন ছিল না। ফরমালিনের আতঙ্ক তো ছিলই। এখন সময় অনেক বদলে গেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন আর ফরমালিনের আতঙ্ক নেই। পরিবহনব্যবস্থাও ভালো হয়েছে। ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তে সহজেই আমের গাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে। এ ছাড়া আমের ভালো ভালো জাত উদ্ভাবন হওয়ায় বিদেশি ফলের জায়গা নিতে পেরেছে দেশীয় আম। সব মিলিয়ে কয়েক বছর ধরে ঢাকাসহ দেশের সব বাজারেই আমের বিক্রি ব্যাপক বেড়েছে। কৃষকরা আমের দাম ভালো পাচ্ছেন। এসব কারণে অনেক চাষি ধানের পরিবর্তে আমের বাগান গড়ে তুলছেন।’

তবে আম পরিবহনে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, আম পরিবহনে ফ্রিজার ভ্যানের ব্যবহার বাড়াতে পারলে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমবে। এতে লোকসানের হারও কমে আসবে।

জানা যায়, বছরপাঁচেক আগেও কৃষক পর্যায়ে আমের দাম ছিল ১৫ থেকে ২৫ টাকা। গড়ে ২০ টাকায় আম বিক্রি করতে হয়েছে কৃষকদের। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কৃষক পর্যায়ে আমের দাম ৫০ টাকার ওপরে উঠেছে। চলতি বছর গড়ে ৬০ টাকার ওপরে আম বিক্রি হচ্ছে বাগান থেকে।

চলতি বছর রাজশাহী-নওগাঁসহ কয়েকটি অঞ্চলে করোনার বিস্তার বাড়তে থাকায় লকডাউন চলছে। তা সত্ত্বেও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে আম পৌঁছে যাচ্ছে। আমের জন্য বিশেষ ট্রেন চালু হয়েছে। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোও আম পরিবহনে ব্যাপক তত্পর হয়েছে।

রাজশাহীর বিনোদপুর ফল গবেষণা ক্রেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলীম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা সময় পরিপক্ব হওয়ার আগেই বাগান মালিকরা আম নামিয়ে ফেলতেন। তারপর নানা কেমিক্যাল দিয়ে পাকাতেন, কিন্তু এখন জেলা প্রশাসক ও কৃষি বিভাগ মনিটর করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমের পরিপক্বতা নিশ্চিত হয়ে গাছ থেকে নামানোর অনুমোদন দেয়। তাই এখনকার আম পাকাতে কেমিক্যাল লাগে না। খেতেও সুস্বাদু হয়। এ ছাড়া ফরমালিনের বিষয়েও নানা সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে ক্রেতারা এখন ভালো মানের আম পাচ্ছেন। এসব কারণে দেশের বাজারে আমের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে।

তিনি বলেন, লকডাউনের এই সময়ে কুরিয়ারে আম সরবরাহ চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। আগে কুরিয়ারের লোকজন এসে খুঁজে খুঁজে মাল নিয়ে যেতেন। এখন মানুষকে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়।

বিবিএসের তথ্য মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি আম উত্পাদন হয় রাজশাহী বিভাগে। গত বছর উত্পাদিত সাড়ে ১২ লাখ টনের মধ্যে ছয় লাখ ১৬ হাজার টন আম উত্পাদন হয় রাজশাহী বিভাগে। এর মধ্যে রাজশাহী জেলাতেই উত্পাদন হয় দুই লাখ ৩৫ হাজার টন আম।

বাজারে এখন আমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ক্ষীরশাপাতি ও আম্রপালি। এরপর গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা ইত্যাদি জাতের আমের চাহিদাও ব্যপাক। ঢাকার বাজারে বর্তমানে হিমসাগর বলে যেসব আম বিক্রি হয় তার সবই ক্ষীরশাপাতি। রাজধানীর বাজারগুলোতে গড়ে ৬০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে সব ধরনের আম কিনতে পাওয়া যায় এখন।