kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

বিশ্বজয়ের হাতছানি আমের রাজধানীর

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বজয়ের হাতছানি আমের রাজধানীর

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাজারে প্রতিদিনই আসছে নানা জাতের আম। ছবি : কালের কণ্ঠ

সারা দেশে যে পরিমাণ আম উত্পাদিত হয় তার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই আড়াই লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদিত হয়। বলা হয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি চাঙ্গা রেখেছে আম। এ ছাড়া বছরে আমের চারা বিক্রি হয় প্রায় ছয় কোটি টাকার। এতে নতুন নতুন আমবাগান বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, দেশের ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদিত হয়। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এক লাখ ৭৪ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৪০৩ মেট্রিক টন আম উত্পাদিত হয়।

রাজশাহী বিভাগের চারটি জেলায় (রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁসহ) আম অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিগণিত। এসব জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম সবচেয়ে প্রসিদ্ধ, সুস্বাদু এবং সর্বাধিক পরিমাণে উত্পাদিত হয়। এ জন্য এই জেলাকে বলা হয় আমের রাজধানী। কারণ এখানকার জাতীয় বৃক্ষ আমগাছের নয়নাভিরাম দৃশ্য মুগ্ধ করে সবাইকে। এ জেলায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদিত হয়, যার বাজারমূল্য দাঁড়ায় এক হাজার ৫০০ কোটি থেকে দুই হাজার কোটি টাকা।

এদিকে সারা দেশের সবচেয়ে আমের বড় বাজার হিসেবে পরিচিত কানসাট। কানসাটে কয়েক দিন থেকে পুরোদমে আম বিক্রি শুরু হয়েছে। গত ৭ জুন পর্যন্ত লকডাউন থাকায় আম বাজারে ধস নামে। এ ছাড়া জেলার ব্যস্ততম বাজারের মধ্যে রয়েছে গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর, সদর উপজেলার পুরাতন বাজার। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন স্পটে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় আম ক্রয়-বিক্রয়ের আড়ত।

কানসাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি আমভর্তি সাইকেল ও ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই আম চাষি ও আম ব্যবসায়ী দাম নিয়ে দর-কষাকষি করছেন। চাহিদা মোতাবেক দাম পেলে বিক্রি করছেন আম। বাজারের দুই দিকে প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে আম কেনাবেচায় ব্যস্ত থাকে। এই বাজারে প্রায় আমের আড়ত রয়েছে দুই শতাধিক। সেখানে আম বিক্রি, আম সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণে হাজার হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছে। আম মৌসুমে জেলায় কর্মযজ্ঞে জড়িত থাকে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, প্রায় ৪৮ ধরনের আম উত্পাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এখানকার ক্ষীরশাপাতি আম জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেটর পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। অন্য জাতগুলোও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চলছে। দেশের একমাত্র আম গবেষণা কেন্দ্র এ জেলাতেই অবস্থিত, যা নতুন স্থানীয় জাত উদ্ভাবন ও সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে।

আম ব্যবসায়ী আকতার হোসেন জানান, অন্য বছর থেকে এ বছর আমের তুলনামূলক ফলন বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে জুনের প্রথম সপ্তাহে লকডাউন থাকার কারণে বাইরে থেকে আম রপ্তানিকারক আম কিনতে তেমন একটা আসেননি। এ ছাড়া আম চাষিরা গাছ থেকে আমও নামাতে পারেননি। কারণ আম বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। তবে গত তিন-চার দিন থেকে কানসাট আম বাজারে কেনাবেচা শুরু হয়েছে পুরোদমে।

আম চাষি আব্দুল আওয়াল জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর আমের দাম কম। গত বছর ক্ষীরশাপাতি আম দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা ছিল। এবার এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। শুধু ক্ষীরশাপাতি নয়, গোপালভোগ, লখনা, গুটিরও দাম কম। তবে এবার গতবারের থেকে তুলনামূলক আমের ফলন বেশি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি বছরে ৩৫ হাজার ৭৩৮ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। সেখানে আড়াই লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদনের সম্ভাবনা আছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য দুই হাজার কোটির টাকারও বেশি। তবে হঠাৎ করে কারোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আম ব্যবসায় যেন এর প্রভাব না পড়ে সে জন্য ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে লকডাউন শিথিল করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে আমের বাজার অনেক ভালো। আশা করছি, বিগত বছরগুলোকে এবার ছাড়িয়ে যাবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে ২০১৬ সালে ফজলি, ল্যাংড়া, হিমসাগর ও আম্রপালি প্যাকিং আম রপ্তানি হয় ১৮৬ মেট্রিক টন। ২০১৭ সালে রপ্তানি হয় মাত্র পাঁচ-ছয় মেট্রিক টন। ২০১৬ সালে বেশির ভাগ আম রপ্তানি হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে। এবারও প্রথম গত ৫ জুন প্রায় আড়াই মেট্রিক টন ক্ষীরশাপাতি আম সুইডেনে রপ্তানি করেছেন আম চাষি শহিদুল ইসলাম খোকন। তিনি বলেন, ‘আমরা বরাবরই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আম উত্পাদন করি এবং রপ্তানির ১৮টি বিধি-নিষেধ মেনে আম উত্পাদন করে থাকি। এবার আন্তর্জাতিক মানের নিজস্ব প্যাকেট করে প্রতিটি আমে স্টিকার লাগিয়ে দেশে ও বিদেশে পাঠাচ্ছি।’

আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ২০০৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে আয়োজন করা হয়েছিল রঙিন জাতের আম প্রদর্শনী। এখানে প্রদর্শিত ৮৭টি জাতের আমের মধ্যে ৩৩টি জাতকে উত্কৃষ্ট মানের বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৯৩, ২০০২ ও ২০০৭ সালে তিনটি রঙিন জাতের আম প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়।