kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

আগামী বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ চান ব্যবসায়ীরা

বাণিজ্যের ভার নিতে চট্টগ্রামের চাই এক্সপ্রেসওয়ে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাণিজ্যের ভার নিতে চট্টগ্রামের চাই এক্সপ্রেসওয়ে

চট্টগ্রামকে ‘অর্থনৈতিক হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতেই সরকার দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করছে চট্টগ্রামের মিরসরাইতে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর; কর্ণফুলীর দক্ষিণ পার একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই কর্ণফুলী নদীর নিচে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু টানেল। বন্দর সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দরের তিন গুণ বড় ‘বে টার্মিনাল’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে নির্মিত হচ্ছে দোহাজারী-কক্সবাজার ডুয়াল গেজ রেললাইন। আকাশপথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। সব কিছুই চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে সমৃদ্ধ করার পদক্ষেপ।

এসব মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সড়ক যোগাযোগে পিছিয়ে পড়বে চট্টগ্রাম। কারণ চট্টগ্রাম-ঢাকা চার লেন মহাসড়কটি দিয়ে সেই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। এ জন্য আগামী বাজেটে চট্টগ্রাম-ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প নির্মাণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ চান ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে সব মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার জন্য বিশেষ নজরদারি চান ব্যবসায়ীরা।

দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলছেন, ‘শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের অর্থনীতির জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি হচ্ছে চট্টগ্রাম-ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা বা আট লেনে নির্মাণ করা। বে টার্মিনাল নির্মাণ দ্রুত শুরু করা এবং চট্টগ্রাম শহরকে সম্প্রসারণ করা।’

তিনি বলছেন, ‘৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে; এই পণ্য সড়কপথেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে। আর চট্টগ্রাম ঘিরে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মিত হচ্ছে; পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে আমরা ট্রানজিট দিচ্ছি। ফলে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে দেশের সব এলাকার সড়ক যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন হতে হবে। সম্প্রতি এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম-ঢাকা হাইস্পিড ট্রেন পরিচালনার উদ্যোগ নিচ্ছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু ডেডিকেটেড রেললাইন দিয়ে যাত্রী পরিবহন সম্ভব; কোটি কোটি টন পণ্য পরিবহন সম্ভব নয়।’

চট্টগ্রাম চেম্বারের এই সাবেক নেতা বলছেন, ‘এখন আমরা চার লেন দিয়ে পণ্য পরিবহন সামাল দিচ্ছি কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে চার লেন দিয়ে এই চাপ কোনোভাবেই সামাল দেওয়া যাবে না। তাই আমাদের চট্টগ্রাম-ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পে তালিকাভুক্ত করতে হবে; চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা-সক্ষমতা বাড়াতে বে টার্মিনাল নির্মাণ জোরদার করতে হবে।

দেশের মোট রাজস্ব আয়ের এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয় চট্টগ্রাম; প্রতিবছর এই রাজস্ব আয়ের ওপর ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা আরোপ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এসব মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ঘিরে রাজস্ব আয় দ্বিগুণ হবে। ফলে সেই মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে অর্থ বরাদ্দ অব্যাহত রাখা এবং কভিড মহামারি সময়ে বিশেষ তদারকির মাধ্যমে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন নিরবচ্ছিন্ন রাখার দাবি জানান গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থনৈতিক হাব করতে চান বলেই অনেক মেগাপ্রকল্প চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বাস্তবায়ন করছেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে চট্টগ্রামের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির গতি বাড়ানোর জন্য।’

মহেশখালীতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে। সেই বন্দরের সঙ্গে চকরিয়া পর্যন্ত একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার ফিজিবিলিটি স্টাডি করছে সরকার। কিন্তু চকরিয়া থেকে এসব পণ্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছবে তার পরিকল্পনা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

জুনিয়র চেম্বার চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলছেন, ‘গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে কক্সবাজার থেকে সড়কপথে পণ্য পরিবহন কিভাবে হবে তা এখনো পরিকল্পনাতে সীমাবদ্ধ আছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দেড় থেকে দুই লেনের সড়ক দিয়ে এই পণ্য পরিবহনের চাপ কোনোভাবেই সামাল দেওয়া যাবে না। সমুদ্রবন্দর চালুর আগে যদি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটি চার লেনে নির্মিত না হয় তাহলে পণ্য পরিবহনে বিপাকে পড়তে হবে। ফলে বাজেটে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’

কর্ণফুলী নদীর নিচে বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের কাজ ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। নদীর নিচে একটি টিউব বসানো হয়েছে, আরেকটি টিউব বসানো হচ্ছে। টানেল চালু হলে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পার থেকে শুরু করে চকরিয়া পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক শিল্পাঞ্চল হবে।

জানতে চাইলে বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলছেন, ‘টানেল চালুর আগেই অনেকে দক্ষিণ পারে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ করেছেন; আমি নিজেও সেখানে শিল্প স্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়েছি।’

ভোগ্য পণ্যের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘সরকার আগামী বাজেটে জেটি স্থাপনে নীতি প্রণয়ন ও প্রণোদনা দিলে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পার ঘিরে বেসরকারি খাতে অনেক জেটি নির্মিত হবে। এতে করে ওই পারের ব্যবসায়ীরা নিজেদের জেটি ব্যবহার করে সরাসরি পণ্য জাহাজ থেকে কারখানায় নিতে পারবেন। এতে খরচ-সময় অনেক সাশ্রয় হবে।