kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

ছাড়ের দাবিতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের হিসাব মিলছে না

ফারজানা লাবনী   

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছাড়ের দাবিতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের হিসাব মিলছে না

করোনা ব্যাধির প্রকোপে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের অধিকাংশ খাত। করোনাকালীন সংকটে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প টিকিয়ে রাখতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ককর ও ভ্যাটে ছাড় চেয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অন্যদিকে এই ভাইরাসের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে সরকারও বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। করোনার কারণে অনেক নতুন খাতে ব্যয় বাড়লেও নিয়মিত আয় কমেছে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঁধে আদায়ের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালেও ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে এনবিআরকে নতুন কর আরোপ করতে ‘না’ করেছে, প্রয়োজনে ছাড় দিতে নির্দেশ দিয়েছে। এনবিআরসংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে এনবিআর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে কোথা থেকে?

করোনাকালীন সংকটে দেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে জাতীয় বাজেটে কী পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন এ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রস্তাব জানতে চেয়ে এবারে গত মার্চ থেকে  ৫০০-এর বেশি শ্রেণি-পেশার সংগঠনের সঙ্গে ৭০টির বেশি প্রাক-বাজেট বৈঠক করেছে এনবিআর। প্রাক-বাজেট আলোচনায় দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই), ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের (ফিকি), বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিসিসিআই), বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিডাব্লিউসিসিআই), উইমেন এন্টারপ্রেনার নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্টসহ (ওয়েন্ড) বিভিন্ন গুরুত্ব্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠন অংশ নিয়েছে। প্রায় প্রতিটি শিল্প খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গেও পৃথক প্রাক-বাজেট বৈঠক হয়। অর্থনীতি বিশ্লেষক, সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বাজেট সম্পর্কিত মতামত নিয়েছে এনবিআর।    

প্রতিটি প্রাক-বাজেট বৈঠকে করোনাকালীন সংকট থেকে উত্তরণের কথা বলে রাজস্ব ছাড়ের দাবি করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে, ব্যক্তি-শ্রেণির করসীমা বাড়ানো, করপোরেট করহার কমানো, অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার, কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমানো বা মওকুফ, উৎস কর মওকুফের কথা বলা হয়েছে। আমদানি শুল্ক সম্পর্কিত প্রস্তাবে শুল্ক স্তর ১ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ নির্ধারণের দাবি করা হয়েছে। স্টিল ও লোহাজাতীয় পণ্য, সিমেন্ট ক্লিংকার, পেট্রোলিয়ামসহ ৪৭টি পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। চীন থেকে আমদানীকৃত অধিক ব্যবহৃত পণ্যে রাজস্ব ছাড়ের এবং আবাসন খাতে নিবন্ধিত ফিসহ মোট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর জোরালো দাবি করা হয়েছে। জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ ভাঙা শিল্পে, চামড়া ও পাট শিল্পে ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সেবা খাতে (বিশেষত বুটিক, বিউটি পার্লার ও ক্যাটারিং, রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকান ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসা) ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা, নারীদের জন্য ব্যক্তিগত আয়কর সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ, করোনা পরিস্থিতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের ব্যবসা আবারও শুরু করার পর থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ভ্যাট এবং কর মওকুফ করা, নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরুর প্রথম তিন বছরের কর মাফ করা, নতুন ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্সের ফি ও নবায়ন ফি অর্ধেক করা, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত এসএমই উদ্যোক্তাদের সকল স্তরের রাজস্ব হার গড়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমানো, করোনাকালীন সংকটে পরিচালিত ব্যবসায় শোরুমের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান, আমদানীকৃত মেশিনারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিজস্ব উদ্যোগে আমদানীকৃত সব ধরনের যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত আমদানি কর হ্রাস করারও প্রস্তাব করা হয়েছে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা রাজস্ব পরিশোধ করে বলেই প্রতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়িয়ে তার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আদায় করতে পারে এনবিআর। করোনার মধ্যে এ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প কোনো রকমে চলছে। এর মধ্যে এনবিআর আমাদের ওপর রাজস্ব পরিশোধে চাপ দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত শেষ হয়ে যাবে।’  

করোনাকালীন সংকটে গত বছর রাজস্ব আদায়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয়। চলতিবারের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে এনবিআর সূত্র নিশ্চিত করেছে। আসছে বারেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি নির্ধারণ করা হবে।

এনবিআর করনীতি শাখার সদস্য আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এবারের প্রাক-বাজেটে করোনা ব্যাধির কারণে সৃষ্ট সংকট থেকে কিভাবে বের হয়ে আসতে পারে তা জানতে চেয়েছি। এবারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা যে যার খাতে রাজস্ব ছাড়ের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। করোনাকালীন সংকটে যেখানে রাজস্ব ছাড়ের বিকল্প নেই সেখানে এনবিআরের আগামী অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়নি। বরং বাড়ানো হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে তা জানিয়েছি।’ 

করোনাকালীন সংকটে রাজস্ব ছাড় করা হলে এনবিআরের আদায় কমবে এমন মত জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এনবিআরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উৎস কর ০.২৫ শতাংশ কমালে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম হবে। একইভাবে ভ্যাটের হার ১ শতাংশ কমালে সাত হাজার কোটি টাকা, করপোরেট করহার গড়ে ১ শতাংশ কমালে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যক্তি শ্রেণির করসীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ালে ৭০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম হবে। এক হাজার পণ্যের সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ কমালে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং অগ্রিম আয়কর ১ শতাংশ কমালে ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কমে যাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসা বা উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া কঠিন। রাজস্ব পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব। করোনার কারণে সরকারের আয়ও কমেছে। আবার ব্যয়ও বেড়েছে। সরকার এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে আয় বাড়াতে চেষ্টা করছে, যা সঠিক নয়। এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে না।