kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

ব্যাংকঋণ-নির্ভরতা বাড়াবে করোনা

বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রাও

জিয়াদুল ইসলাম   

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্যাংকঋণ-নির্ভরতা বাড়াবে করোনা

মহামারি করোনার কারণে আগামী অর্থবছরেও বড় অঙ্কের ঘাটতির বাজেট দিতে হচ্ছে সরকারকে। আর এ ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতি দাঁড়াবে দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৬ শতাংশ। এ ছাড়া বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রাও।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মহামারি করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই অর্থনীতিতে হানা দিয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। সংক্রমণ রোধে সর্বাত্মক লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছে দেশ। মার্কেট, বিপণিবিতান, দোকানপাট, পরিবহন সবই বন্ধ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে। ফলে আগামী অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে তেমন আশার আলো নেই। অন্যদিকে, করোনার কারণে সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারকে আগের তুলনায় বেশি ব্যয় করতে হবে। এতে বাজেটের আকার বড় হওয়ার সঙ্গে ঘাটতির পরিমাণও বাড়বে। ফলে এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকব্যবস্থার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে।

সাধারণত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় বেসরকারি খাত। তাই বরাবরই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে কম ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। তবে দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তেমন নেই বললেই চলে। এ ছাড়া করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বাজারে অর্থের সরবরাহ অনেক বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতে জমেছে উদ্বৃত্ত তারল্যের পাহাড়। তাই আগামীতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলেও বেসরকারি খাতে কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন অনেকেই।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে ব্যাংকে প্রচুর তারল্য আছে। তবে আগামীতে পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটা এখনই বলা মুশকিল। চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত বাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে।  সামনে আদায় খুব বেশি হবে বলে মনে হয় না।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় কমে গেলে তখন ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়ে যায। তবে চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ কম করছে। এর কারণ কাঙ্ক্ষিতহারে এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে টাকারও দরকার পড়েনি। কিন্তু সামনে কী অবস্থা হবে, সেটা বলা যায় না।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে বেশ আগেই। এরই মধ্যে বাজেটের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটি জিডিপির ৩.৪৬ শতাংশ। চলতি বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সে হিসাবে নতুন বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্য বাড়ছে ১৩ হাজার ১৭ কোটি টাকা বাড়ছে। নতুন বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ২.৬ শতাংশ। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ খাতে সরকারের মূল ভরসা ব্যাংক খাত। বাকি ৩০ হাজার কোটি টাকা আসবে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে।

এদিকে আগামী বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে সরকার ৮৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। বিদেশ থেকে ঋণ সংগ্রহে সরকার বিদেশি উৎস থেকে সহজ শর্তে ঋণ সংগ্রহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭৬ হাজার চার কোটি টাকা। সে হিসাবে আট হাজার ৫৬১ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয় ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। তবে করোনার নেতিবাচক প্রভাবে কাঙ্ক্ষিত হারে অর্থ ব্যয় না হওয়া এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ব্যাংকঋণ খুব একটা প্রয়োজন হয়নি। আর সে কারণেই চলতি অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৯৮০ কোটি টাকা কমিয়ে ৮২ হাজার কোটি টাকায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে কোনো ঋণ করেনি। উল্টো আগের নেওয়া ঋণের প্রায় ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা শোধ করেছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৫০ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এই লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে পাঁচ মাস না যেতেই অতিক্রম হয়ে যায়। এর পর থেকে লক্ষ্যের অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে এ খাতে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়ছে। 

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৯ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।