kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংকটে শিল্প খাত

ফারজানা লাবনী   

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংকটে শিল্প খাত

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে গাড়ি সংযোজন করা হচ্ছে ফাইল ছবি

গাজীপুরের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠান গ্রিন ফাইবার লিমিটেড কর্তৃপক্ষ তাদের শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লকডাউনেও কারখানার নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ নির্দেশ সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞার গত দুই দিনে ১০ শতাংশের বেশি অনুপস্থিত ছিল। নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় অনেকেই গ্রামের বাড়ি গিয়েছেন। এর মধ্যে গ্রিন ফাইবার কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাজার থেকে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে সুতা কিনতে গেলে দাম দ্বিগুণ চাওয়া হয়।

এই চিত্র শুধু গ্রিন ফাইবারের না দেশের বেশির ভাগ বড় মাপের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের। করোনা রোধে টিকা আসায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে স্বস্তি দেখা দেয়। আবার করোনার প্রকোপ বাড়বে, লকডাউন হবে সংশ্লিষ্টদের বেশির ভাগের এ ধারণা ছিল না। তাই লকডাউনে কাঁচামালের মজুদ রাখা, পণ্য বিক্রির ব্যবস্থাও অনেকে করেনি। দোকান স্বাভাবিক নিয়মে না খোলায় স্থানীয় বাজার থেকে চাহিদার সবটা কাঁচামাল সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশে লকডাউন থাকায় দেশের ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে কি না এই আশঙ্কায় চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামসহ ইউরোপের অনেক দেশ থেকে কাঁচামালভর্তি অনেক জাহাজ সময়মতো ছাড়া হচ্ছে না।

গত বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে দেশে প্রথম দফায় করোনার সংক্রমণ শুরু হলে দেশের শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমে আসে। গত পাঁচ-ছয় মাসে এই ব্যাধি কিছুটা কমলেও করোনাকালীন লোকসান বেশির ভাগ শিল্প কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান করোনার প্রথম আঘাত কাটিয়ে উঠতে পুঁজির সবটা বিনিয়োগ করেছে। ধারদেনা বা ব্যাংকঋণ নিয়েও অনেকে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান এবারের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় উৎপাদনের স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখতে না পারলে নিঃস্ব হয়ে পথে বসবে বলেও অনেকে আশঙ্কা করেছেন।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি মো. হাতিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার প্রথমবারের প্রকোপে আমার বড় লোকসান হয়েছে। বাজারে টিকা এসেছে করোনাব্যাধি রোধ হবে এমন বিশ্বাস থেকে ধারদেনা করে ঋণ নিয়ে প্রথমবারের লোকসান কাটিয়ে উঠতে যা আছে সব বিনিয়োগ করেছি। কাঁচামালের মজুদ রাখার প্রয়োজন মনে করিনি। লকডাউনের প্রথম দিকে দোকাপাট বন্ধ ছিল। এরপর দোকানপাট সীমিত সময়ের জন্য খোলা। কাঁচামাল সংগ্রহে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। আবার অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশে লকডাউন শুনে জাহাজ যথাসময়ে ছাড়ছে না। শ্রমিকদের অনেকে বাড়ি চলে গিয়েছে। এতে কারখানায় জনবল কমে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্ডারের মাল সময়মতো শেষ হবে না। করোনায় নতুন অর্ডার পাওয়ার আশা নেই।’

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রূপালী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকার ব্যবহার শুরু হওয়ার পরও করোনা বাড়তে পারে এটা ধারণাতেও ছিল না। অনেক শিল্পেরই এবারের করোনাকালীন সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেই। এতে শিল্প খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইলেকট্রিক পণ্য উৎপাদনকারী ইস্টার্ণ টিউবস লিমিটেড, ইস্টার্ণ কেবলস লিমিটেড, গাজী ওয়্যার লিমিটেড, জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচার কম্পানি লিমিটেড ও ন্যাশনাল টিউবস লিমিটেডসহ অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায়ও নিষেধাজ্ঞায় জনবলের উপস্থিতি কম ছিল।

শিল্পসচিব কে এম আলী আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি কারখানায় এবারের নিষেধাজ্ঞায় জনবল কম ছিল। আমরা টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা কর্মচারীদের উপস্থিত থাকতে বললেও নন-টেকনিক্যালদের সংখ্যা তিনজনে দুজন করেছি। নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়লে কাঁচামালের সংকট এবং পণ্য বিক্রিতে সমস্যা হবে। করোনার প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বারের আঘাতের লোকসান বহুগুণ বাড়বে।’

ইস্টার্ণ টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেরুল আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাব্যাধির জন্য কেউ দায়ী নয়। সরকার এই ব্যাধি থেকে সবাইকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। করোনা বাড়তে থাকলে অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের প্রতিষ্ঠানও সংকটে পড়বে।’

দেশের পরিবহন খাতে অন্যতম প্রতিষ্ঠান নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞায় আমার কারখানায় ২০ শতাংশ জনবল কম উপস্থিত ছিল। এটি চলতে থাকলে জনবলের সংকটে উৎপাদন কমে যাবে। এবারের করোনার প্রকোপ বাড়ায় লোকসান কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।’