kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

নারীদের ঋণ দিতে ব্যাংকের যত বাহানা

জিয়াদুল ইসলাম   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারীদের ঋণ দিতে ব্যাংকের যত বাহানা

নারীদের ঋণ দিতেই যেন আগ্রহ কম ব্যাংকের। ফলে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও নারী খাতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের চিত্র হতাশাজনক। প্রতিবছর কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ ঋণ দেওয়ার কথা তার অন্তত ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্যের ধারেকাছেও নেই ব্যাংকগুলো। সর্বশেষ গত বছরে এই খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। ২০১০ সালে এই হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশেরও কম। আর ২০১৫ সালে ছিল সাড়ে তিন শতাংশের কিছুটা বেশি। অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০২০ এই ১০ বছরের মধ্যে কোনো বছরই ব্যাংকগুলো নারী খাতে ঋণ বিতরণের টার্গেট অর্জন তো দূরের কথা, ৪ শতাংশের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি।

দেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান বিবেচনায় এটাকে প্রাইমারি সেক্টর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ বিতরণের একটা সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই খাতে মোট বিতরণ হওয়া ঋণের কমপক্ষে ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের দিতে বলা হয়েছে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এটা ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে এই টার্গেট বাস্তবে অর্জিত হয় না। সার্বিকভাবে এই খাতের নারীরা ৪ শতাংশেরও কম ঋণ পাচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালায় নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ দেওয়ার কথা বলা হলেও বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেগুলো যথাযথভাবে পরিপালন করছে না। ঋণ আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নামে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে তাঁদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও ভোগান্তিতে ফেলছেন। এতে নতুনদের পক্ষে ঋণ পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা তেমন হয় না।

নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন এন্টারপ্রেনার্স নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট (ওয়েন্ড) ড. নাদিয়া বিনতে আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারীরা ঋণ নিয়ে যথাসময়েই ফেরত দেন। অথচ নারীদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই ব্যাংকের অনীহা কাজ করে। নিজেরা খুঁজে খুঁজে ঋণ তো দেয়-ই না, প্রকৃত উদ্যোক্তারা নিজ থেকে ঋণের জন্য গেলেও তাঁদের নানা রকম শর্ত জুড়ে দিয়ে অসহযোগিতা করে থাকে। নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো প্রকট।’ প্রণোদনার সিএমএসএমই ঋণের টাকাও নারীরা খুব একটা পাননি এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য বরাদ্দ করা প্রণোদনার টাকা নিয়ে আমাদের বড় প্রশ্ন যে আসলে ব্যাংকে এই টাকাটা আদৌ পৌঁছেছে কি না, নাকি ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে।’

বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নারী উদ্যোক্তাদের অবশ্যই ঋণ দিতে চাই। সে অনুযায়ী নারী খাতে ঋণ বাড়ানোর চেষ্টাও করছি। তবে প্রকৃত নারী উদ্যোক্তা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি, ঋণের জন্য এমন অনেক নারী আবেদন করেছেন, যাঁরা আসলে উদ্যোক্তাই নন, তাঁদের পেছনে রয়েছেন তাঁর স্বামী, বাবা অথবা ছেলে। তাঁদের ব্যবসার টাকার জোগান দিতেই আবেদন করা হয়েছে। তখন বাধ্য হয়ে ওই সব ঋণ প্রস্তাব বাদ দিতে হয়। আমার জানা এমন অনেক নারী ঋণ নিতে চাইছেন, যাঁদের ন্যূনতম ব্যবসা করার অভিজ্ঞতাও নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিএমএসএমই খাতের আওতায় গত ১০ বছরে ব্যাংক থেকে নারীরা মাত্র ৪৪ হাজার ৭০৩ কোটি টাকার মতো ঋণ পেয়েছেন। সুবিধাভোগী উদ্যোক্তার সংখ্যা মাত্র চার লাখ ৩৮ হাজার ৯৯৮ জন। এর মধ্যে ২০২০ সালে পাঁচ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে। ঋণ বিতরণের হার ৩.৫১ শতাংশ। ৬৬ হাজার ১৮৯ জন উদ্যোক্তা এই ঋণ পেয়েছেন। ২০১৯ সালে ছয় হাজার ১০৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়। বিতরণের হার ৩.৬৪ শতাংশ। ৫৬ হাজার ৭০৬ জন উদ্যোক্তা এই ঋণ পান। ২০১৮ সালে ৫৭ হাজার ৫৭১ জন উদ্যোক্তাকে পাঁচ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকগুলো। ঋণ বিতরণের হার ছিল ৩.৪৬ শতাংশ। তবে ২০১৭ সালে নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণ বিতরণের হার ৩ শতাংশের নিচে নেমে যায়। ওই বছর ৫৩ হাজার ৮৭৪ জন নারী চার হাজার ৭৭৩ কোটি টাকার ঋণ পান। ঋণ বিতরণের এই হার ছিল মাত্র ২.৯৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে পাঁচ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার ঋণ পান ৪১ হাজার ৬৭৫ জন উদ্যোক্তা। ঋণ বিতরণের হার ছিল ৩.৭৭ শতাংশ। ২০১৫ সালে ৩১ হাজার ২৪২ জন উদ্যোক্তা চার হাজার ২২৭ কোটি টাকার ঋণ পান। ঋণ বিতরণের হার ছিল ৩.৩৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে ঋণ বিতরণ হয় তিন হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা, ঋণ বিতরণের হার ৩.৯০ শতাংশ। ৪২ হাজার ৭৩০ জন নারী উদ্যোক্তা এই ঋণ পান। ২০১৩ সালে ৪১ হাজার ৭১৯ জন নারী তিন হাজার ৩৫১ কোটি টাকার ঋণ পান। ঋণ বিতরণের হার ছিল ৩.৯৩ শতাংশ। ২০১২ সালে ৩.১৯ শতাংশ ঋণ পান ১৭ হাজার ৩৬২ জন নারী। ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ২০১১ সালে দুই হাজার ৪৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়, যা মোট সিএমএসএমই ঋণের ৩.৮১ শতাংশ। ১৬ হাজার ৬৯৭ জন ওই ঋণ পান। আর ২০১০ সালে ১৩ হাজার ২৩৩ জন উদ্যোক্তা এক হাজার ৮০৫ কোটি টাকা ঋণ পান, ঋণ বিতরণের হার ছিল মাত্র ৩.৩৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে সিএমএসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান এম এস শ্যামা প্রপ্রাইটার সাফিয়া শ্যামা বলেন, ‘নারীদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বিভিন্ন সিকিউরিটি চায় ব্যাংকগুলো। এগুলোর কোনো একটি ঘাটতি থাকলেই ঋণ দিতে অনীহা দেখায়। আবার জামানতবিহীন ঋণ পেতে গ্যারান্টার জোগার করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। নারীদের ঋণ না পাওয়ার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তদারকি ঘাটতি রয়েছে।’

মন্তব্য