kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

প্রতিবন্ধীদের অবলম্বন গড়ে দিচ্ছেন দৃষ্টিহীন নূরজাহান

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতিবন্ধীদের অবলম্বন গড়ে দিচ্ছেন দৃষ্টিহীন নূরজাহান

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ম্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া নূরজাহান বেগম চট্টগ্রাম বারের সদস্য হিসেবে দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী আইনজীবী। তবে নিজেকে আইন পেশায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নিজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় অন্য প্রতিবন্ধীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে আত্মনিয়োগ করেছেন, হয়েছেন উদ্যোক্তা। নিজ ইচ্ছাশক্তিতে অন্ধকার জয় করে হয়েছেন আলোর যাত্রী।

ডিস-এবল পিপলস অর্গানাইজেশন (ডিপিও) নামের এনজিওর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের হাতে-কলমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। এই এনজিওর এরই মধ্যে ৩৫০ জন সদস্য রয়েছে। মোবাইল অপারেটর রবির স্পন্সরে ২০ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর স্মার্টফোন প্রশিক্ষণ, লায়ন্স ক্লাব অব খুলশীর সহযোগিতায় তিন মাসব্যাপী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ব্লক-ভাটিক, সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সদস্যদের। এ ছাড়া নতুন জায়গায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে কিভাবে খাপ খাওয়াবে সে ব্যাপারেও প্রতিবন্ধীদের কাউন্সেলিং করা হয় ডিপিওর মাধ্যমে। প্রতিবন্ধীরা পরিবার ও সমাজের বোঝা হবে না এ লক্ষ্যেই কাজ করছে ডিস-এবল পিপলস অর্গানাইজেশন।

শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি নূরজাহান বেগম। ‘নকশী বাংলা’ নামের নিজের একটি বিপণন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের তৈরি হস্তশিল্প বিক্রির ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন তিনি। থ্রি-পিস, টু-পিস, নকশি কাঁথা, বেডশিটসহ হাতের কাজের কাপড় কিনে নিজের শোরুমে বিক্রি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। বর্তমানে ডিপিওর প্রায় দেড় শ সদস্য নিজেদের তৈরি পোশাক সরবরাহ করছেন নকশী বাংলায়। তাঁদের অনেকেই নকশী বাংলার মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০১৩ সালে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে নকশী বাংলার কার্যক্রম শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন ও বোনের স্বামী। গত আট বছরে নকশী বাংলার বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকায়। স্বীকৃতি পেয়েছেন ২০১৮ সালে। সিটি ব্যাংক এনএ ১৪তম নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় পুরস্কারে সম্মানিত করেছে নূরজাহান বেগমকে।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ করে ‘উৎস’ নামের একটি এনজিওতে চাকরি শুরু করেন নূরজাহান বেগম। তখন দেখেছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চাকরি পাওয়া কত কষ্টকর। শুধু প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও একটি সামান্য চাকরির জন্য ধরনা দিতে হয় দ্বারে দ্বারে। সেখানেই চম্পা নামের একজন প্রতিবন্ধীর সঙ্গে আলাপ হয় যিনি কিছু করার তাগাদা অনুভব করতেন। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছুই করতে পারছিলেন না। নূরজাহান নিজের বোনের কাছে চম্পাকে পাঠালেন নকশির কাজ শিখতে। পরে চম্পাকে অর্ডার দিয়ে নিজেই কিছু কাজ করালেন। এভাবে মনে হলো অন্য শারীরিক প্রতিবন্ধীদেরও কাজে লাগানো যেতে পারে। নিজের ভেতর একজন উদ্যোক্তার অস্তিত্বও খুঁজে পেলেন নূরজাহান। বিভিন্ন ক্লিনিক ও পরিচিতজনদের মাঝে বিক্রি করতে থাকেন প্রতিবন্ধীদের তৈরি সদ্যোজাত বাচ্চাদের নিমা ও হাতের তৈরি পোশাক।

তিনি শুনেছেন প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করে। কিন্তু কোনো ব্যাংকেই সেই সহায়তা পাচ্ছিলেন না। পরে ব্যাংক এশিয়ার একজন কর্মকর্তার সহায়তায় আড়াই লাখ টাকা ঋণ সহায়তা পান নূরজাহান। সেই টাকায় নগরীর আকবর শাহ এলাকায় নকশী বাংলার নিজস্ব শোরুম চালু করলেন। চেষ্টা করেছেন নিয়মিত ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধের। কিন্তু করোনার হানায় কিছুটা বিপর্যস্ত নকশী বাংলা। স্বাভাবিক অর্ডার কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। যদিও পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংক থেকে কিস্তি পরিশোধে তেমন চাপ দেয়নি তার পরেও নিজেই পুড়ছেন বিবেকের তাড়নায়।

চট্টগ্রাম মহিলা চেম্বার অব কমার্সের এই সদস্য কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই বললেন, ‘করোনার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সরকার এসএমই খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা স্বল্পসুদে ঋণের সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু আমরা প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তারা সেটা পাইনি। অথচ আমাদের বিষয়টা বিশেষ বিবেচনায় রাখার দরকার ছিল।’

মন্তব্য