kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

অর্থমূল্য নেই নারীর বেশির ভাগ কাজের

তামজিদ হাসান তুরাগ   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অর্থমূল্য নেই নারীর বেশির ভাগ কাজের

ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ঘরের কাজে হাত দেন ফারজানা বেগম—পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রান্নাবান্না, সন্তানদের স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, এরপর নিজে রেডি হয়ে অফিসের পথে ছুটে চলা। এসেই আবার ঠিক একই কাজ। প্রতিদিনের এই জীবনযাত্রায় স্বামী-সন্তান তাদের কাজের বাইরে অবসর সময় পেলেও ফারজানা বেগমের যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। অথচ অফিসের বাইরে প্রতিদিন যে বিশাল কর্মযজ্ঞ তিনি সম্পন্ন করেন, অর্থনীতিতে তার যেন কোনো স্বীকৃতিই নেই। গৃহিণী কিংবা কর্মজীবী নারী—উভয়কেই এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়, একটি পরিবারে একজন নারী গড়ে প্রতিদিন ১২.১ এসএনএ (জাতীয় হিসাব পদ্ধতি) বহির্ভূত কাজ করে থাকেন। এসএনএবহির্ভূত আয় অর্থনৈতিকভাবে দৃশ্যমান নয় এবং তা জিডিপিতে ধরা হয় না। বিপরীতে পরিবারের একজন পুরুষ সদস্যের গড় এসএনএবহির্ভূত কাজ মাত্র ২.৭। বলা হয়, নারীদের এসএনএবহির্ভূত অর্থাৎ বেতনবিহীন গৃহস্থালির কাজের আনুমানিক আর্থিক মূল্য হবে জিডিপির (অর্থবছর ২০১৪-১৫) ৭৬.৮ থেকে ৮৭.৬ শতাংশের সমান। এমনকি যদি নারীদের বেতনহীন কাজের অর্থমূল্য হিসাব করা হয়, তা হবে বেতনভুক্ত কর্মীদের তুলনায় ২.৫ থেকে ২.৯ গুণ বেশি।

অক্সফামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে বছরে নারীদের বেতনহীন কাজের অর্থমূল্য রীতিমতো বিস্ময়কর—১০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ কম্পানি অ্যাপলের বার্ষিক ব্যবসার ৪৩ গুণ বেশি।

ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী তাঁর পরিশ্রমের স্বাক্ষর রাখছেন। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁর যে অবদান, স্বীকৃতি তার সামান্যই। অথচ সামাজিক গোঁড়ামি, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং আইনগত দুর্বলতাও নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি নারী-পুরুষ লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে দাবি করে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলাচলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা শতভাগ স্বাধীন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের সমতায়, মজুরি, উদ্যোগ, সম্পদ ও পেনশন ইত্যাদিতে এখনো পিছিয়ে। এসব ক্ষেত্রে উন্নয়নে আইনগত সংস্কার জরুরি।

দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই নারী। তাই তাদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে নারীর অবদানও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে অবদান বাড়ানোর জন্য কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

সিপিডির গবেষণা প্রতিবদনে বলা হয়, নারীর যেসব পণ্য বা সেবা বিক্রি করে অর্থ পাওয়া যায়, শুধু সেগুলোই জিডিপির হিসাবের মধ্যে আসে। কিন্তু এর বাইরে অনেক ধরনের কাজ রয়েছে, যা থেকে সরাসরি অর্থ আসে না। ফলে এগুলো জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। সিপিডির গবেষণা অনুসারে, নারী তাঁর দিনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, যার সামাজিক স্বীকৃতি বা অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারম্যান ড. তাসনিম সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের নারীরা দারুণভাবে প্রস্তুত সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু সমাজের কিছু কাঠামো তাঁদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। একজন নারী যখন ব্যবসা করবে তখন তার মূলধনের দরকার, কিন্তু সেই নারীটি আবার সমান সম্পত্তির ভাগ পাবে না। সুতরাং এখানে একটা বড় প্রতিবন্ধকতা কাজ করছে। দুই নম্বর, জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন আছে ৫০টি। আমি মনে করি, এখানেও একটা পরিবর্তন দরকার। কেন তারা সংক্ষিত আসনে থাকবে? তাদেরও ভোটের মাধ্যমে সংসদে বসার সুযোগ দিতে হবে। আর রাষ্ট্র যদি এই কাজগুলো করে এই শিকলগুলো ভেঙে দেয়, তাহলে দেখবেন সমাজে আরো অনেক নারী উঠে আসবে। দেশ আরো উন্নয়নের দিকে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিবাসনেও নারীরা পিছিয়ে, কারণ তাদের বেশির ভাগ যাচ্ছে গৃহিণী পেশায়, এই জায়গায় সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীদের অভিবাসনের জন্য শুধু তিনটি পেশা নয়, আরো বেশি পেশায় তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে করে তারা অধিক অর্থ উপার্জন করতে পারে। তাদের উপার্জন যেন থেমে না যায়।’

মন্তব্য