kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

স্বপ্নপূরণে সব বাধা জয় করেছেন স্বর্ণলতা

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বপ্নপূরণে সব বাধা জয় করেছেন স্বর্ণলতা

পড়াশোনা শেষ করে রূপালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু। কিন্তু নিজে কিছু একটা করবেন—সেটা ছিল দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। একসময় চাকরি ছাড়েন। ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়ার পথে একদিন একটা ভবন দৃষ্টি কাড়ে। রাস্তার পাশে ভবনের দ্বিতীয় তলায় শুধু ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। সেদিনই গেলেন, ভবন মালিককে খুঁজে বের করে বললেন, ব্যবসার জন্য স্পেস ভাড়া নিতে চান। কিন্তু একজন নারীকে ভাড়া দিতে রাজি ছিলেন না মালিক। শেষে সন্ধ্যায় স্বামীকে নিয়ে আবারও গেলেন। স্বামী ভবন মালিককে বললেন, ‘আমি ছয় মাসের অগ্রিম দিয়ে দিচ্ছি, স্পেসটা দেন। শখটা পূরণ হয়ে যাক। ব্যবসা সহজ কিছু নয়, কিছুদিন গেলে এমনিতেই শখ আর থাকবে না।’

শুধু স্বামী নন, পরিচিত সবারই এ রকম ধারণা ছিল। কিন্তু সবাইকে মিথ্যা প্রমাণ করে সেই যে স্বপ্নের আকাশে ডানা মেললেন স্বর্ণলতা রায়, আজও তাঁর যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবেই শুধু প্রতিষ্ঠা করেননি, নারী উদ্যোক্তা তৈরিতেও সিলেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এখন। কর্মসংস্থান করেছেন বহু নারীর। নারী ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বও দিচ্ছেন। বিউটি পার্লার ও ফ্যাশন হাউস দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও স্বর্ণলতা রায় এখন তথ্য-প্রযুক্তি খাতেও ভূমিকা রাখতে চান। সেই চিন্তা থেকে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘টেক হাব’ নামে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সেখানে মেয়েদের আউটসোর্সিংয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ‘টেক হাব’ অ্যাপস ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করবে—এমন স্বপ্ন তাঁর। তবে তাঁর এ পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। নানা প্রতিবন্ধকতা পথ আটকে দিতে চেয়েছে বারবার। থমকে দাঁড়িয়েছেন; কিন্তু থেমে যাননি। সেই গল্প কালের কণ্ঠকে শুনিয়েছেন স্বর্ণলতা রায়।

স্বর্ণলতার কথায়, ‘২০০৪ সালের ৭ এপ্রিল সিলেট নগরের মীরের ময়দান এলাকায় যাত্রা শুরু করে তাঁর ‘উইমেন্স ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড বিউটি পার্লার’। দুজন কর্মী নিয়ে শুরু। নিজেও কাজ করতেন। কিন্তু তখনো বিউটি পার্লার ব্যবসাকে সিলেটের মানুষ ভালো চোখে দেখত না। ফলে আত্মীয়-স্বজনের নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে। বাইরেও নানা উৎপাত, উটকো ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।’

প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীদের জন্য বাসা ভাড়া নিতে গিয়েও প্রচুর বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে তাঁকে। প্রথম তিন-চার বছর এসব সমস্যায় খুব ভুগিয়েছে। ঋণের জন্য ব্যাংকে গেছেন, নতুন নারী উদ্যোক্তা, এ কারণে ব্যাংকও রাজি হয়নি। পরে স্বামীর নামে ঋণ তুলেছেন। তবে আস্তে আস্তে এসব প্রতিবন্ধকতা তিনি কাটিয়ে উঠেছেন। শুরুতে সবাই যেখানে ধরে নিয়েছিল বড়জোর ছয় মাস টিকবে তাঁর ব্যবসা, সেখানে কাস্টমারদের চাপে দুই বছরের মাথায় নগরের লামাবাজারে খোলেন দ্বিতীয় শাখা। এরপর একে একে আরো দুটি ম্যানস পার্লারও খোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্ধশতাধিক নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়া গত ১৭ বছরে দুই সহস্রাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করেছেন। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরে গড়ে প্রতি বছর ১০০ জন করে হলেও এক হাজার ৭০০ নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। সিলেটের সব বিউটি পার্লারেই আমার কর্মীরা আছে। শুধু সিলেট নয়, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারেও তারা ছড়িয়ে রয়েছে।’

তা ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান ‘টেক হাব’ থেকে এ পর্যন্ত তিন ব্যাচে ১৫০ জন নারীকে আউট সোর্সিংয়ের ফ্রি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যারা কোর্স করেছে তাদের উদ্যোক্তা করে ফেলেছি।’

প্রযুক্তি খাতে অ্যাপস তৈরির পাশাপাশি সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজের আগ্রহের কথা জানিয়ে স্বর্ণলতা বলেন, ‘ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছে। সে সহযোগিতা করলে সাইবার সিকিউরিটি ও ব্যাংকিং সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করতে চাই। তথ্য-প্রযুক্তিতে নারীর কাজের পরিধি আরো বড় করতে চাই।’

সফল উদ্যোক্তা হিসেবে স্বর্ণলতা নিজেকে প্রমাণ করেছেন। সিলেট উইমেন্স চেম্বারের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হওয়ার পর টানা ছয় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এরও আগে ২০১১ সালে তিনি উইমেন বিজনেস ফোরামের প্রেসিডেন্ট হন। একসময় ব্যাংক তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারেনি; কিন্তু এখন ঋণ নিতে তাঁকে অনুরোধ করে। চার বছর ধরে টানা পাচ্ছেন ব্যাংক এশিয়ায় রিওয়ার্ড স্বীকৃতি। উদ্যোক্তা হিসেবে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীও হয়েছেন। ২০১০ সালে এসএমই পুরস্কার, ২০১৫ সালে ন্যাশনাল প্রডাক্টিভিটি অ্যাওয়ার্ড, ২০২০ সালে জয়িতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারও জিতেছেন।

মন্তব্য