kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

ফারজানা লাবনী   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

করোনাকালীন সংকটে ভালো নেই দেশের শীর্ষ নারী উদ্যোক্তা বা শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের প্রকোপে গত বছরের পাঁচ থেকে ছয় মাস ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা ছিল। এ সময়ে আয় না থাকলেও ব্যয় করতে হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের খরচ, শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, দোকানপাটের ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, হিসাব কষে সময়মতো ভ্যাট-কর-শুল্ক কড়ায়গণ্ডায় পরিশোধ করতে হয়েছে। সম্প্রতি করোনার ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্বাভাবিক ধারা ফিরে আসছে। তবে গত বছরের লোকসান এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা। বিশেষভাবে রাজস্বের ভার কমানো ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নারী উদ্যোক্তা সমিতির সভাপতি এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ব্যবসায়ী জীবনে গত বছরের মতো এত বড় ধরনের লোকসান এর আগে কখনো হয়নি। শুধু আমার নয়, মাইডাসের সঙ্গে থাকার কারণে আমি অনেক বড়মাপের উদ্যোক্তার কথা জেনেছি, তাঁরাও করোনার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে টিকে থাকার লড়াই করছেন। বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তা বা নারী ব্যবসায়ীদের সংকট অনেক বেশি। একজন নারীও যে টিকে থাকার লড়াইয়ে জিতে যেতে পারেন, তা আমাদের দেশের সমাজ এখনো অনেক সময় মেনে নিতে চায় না। তাই হয়তো ব্যাংকঋণ, রাজস্ব ছাড়, প্রণোদনা আমাদের ভাগ্যে কম জোটে।’

শীর্ষ এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘করোনার ভ্যাকসিন এসেছে। অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু রাতারাতি কি আর এই লোকসান থেকে বের হওয়া সম্ভব? এ ক্ষেত্রে আমাদের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।’

গত বছরের তিন থেকে পাঁচ মাস করোনার প্রকোপ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেশির ভাগ কারখানা বন্ধ রাখা হয়। কিছু কারখানা সীমিত পরিসরে চলে। জনসমাগম এড়াতে বড় শপিং মলগুলো, ছোট-বড় বিপণিবিতানও বন্ধ ছিল। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় পণ্য বিদেশে পাঠানো যায়নি। চাহিদামতো কাঁচামালও সংগ্রহ করা যায়নি।

নিটল নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা আহমাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক কঠিন ধাপ পেরিয়ে এই গ্রুপ দেশের পরিবহন খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু গত বছর করোনা ব্যাধির কারণে এত বড় ধরনের সংকট এর আগে কখনো আসেনি। ওই সময় লকডাউন ছিল। না পণ্য আমদানি করতে পেরেছি, না আগে তৈরি পণ্য বিক্রি করতে পেরেছি। অথচ প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ অফিস ও কারখানার সব খরচ ঠিকই পরিশোধ করতে হয়েছে। সে সময় আয় না থাকলেও ব্যয় ঠিকই ছিল। এখন ব্যবসা পরিস্থিতি আগের চেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এখনো আসেনি। সরকার সহযোগিতা করছে। তবে এ সহযোগিতার সুফল নিয়ে ব্যবসা আগের মতো মুনাফায় আনতে সময় লাগবে। আমি আশা করছি, ব্যবসায় গতি ফেরাতে আগামী বাজেটে নারী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের বিশেষ কিছু ছাড় দেওয়া হবে; বিশেষ করে রাজস্ব ছাড় খুব জরুরি।’

নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ উইমেন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ওয়েব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আওয়াল মিন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার মধ্যে পণ্য বিক্রি ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। না বাইরে পাঠানো গেছে, না স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা গেছে। এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। আমাদের সহযোগিতা ও সময় দিলে এ লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারব। আমরা নারী উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা সামাজিক ও পারিবারিক বাধার মুখে বেশি পড়ি। এর সঙ্গে সরকারি নিয়ম-নীতিতে ছাড় না পেলে কিভাবে টিকে থাকব?’

করোনাকালীন সংকটেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে হিসাব কষে রাজস্ব পরিশোধ করতে হয়েছে। নারী ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে করোনা পিকে থাকাকালীন স্বল্প সময়ের জন্য ব্যাংকঋণে সাময়িক ছাড় থাকলেও মাফ নেই। বরং করোনাকালীন সংকটে সরকারের ব্যয়ের খরচ জোগাড়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অনেক ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে বলে অভিযোগ নারী উদ্যোক্তাদের।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর করোনাভাইরাস ছোট-বড় সব ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানে ফেলেছে। এখনো এ ধারা থেকে বের হতে পারিনি। দেশের শীর্ষ নারী ব্যবসায়ী বলেন কিংবা উদ্যোক্তা বলেন, সবাই এখন কঠিন সময় পার করছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কাঁধে লোকসানের বোঝা। এর সঙ্গে কর, ভ্যাট আর শুল্কের ভার এতটুকু কমেনি। কম্পানির পণ্য প্রসারের ব্যয়ের করমুক্ত সীমা মোট বিক্রয়মূল্যের দেড় শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এটি নিয়ে এনবিআরকে বারবার বলছি। কোনো সমাধান হয়নি। ব্যবসায় আয় নেই, উচ্চহারে অগ্রিম আয়কর কোথা থেকে দেব? আয় না হলেও কম্পানির বার্ষিক বিক্রির ওপর কর প্রদানের (০.৫%) বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে পালন করতে বাধ্য করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত বছর ব্যবসা করতে পারিনি। নতুন বছরে এখনো ব্যবসা স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে অনেক নতুন কর, ভ্যাট আরোপ করে আদায় করা হচ্ছে। বেজার (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা) জমি কেনায় ভ্যাট ছিল না। এখন ১৫ শতাংশ দিতে বলা হচ্ছে।’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি হাসিনা নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে একক চেষ্টায় ব্যবসা করে টিকে আছে এমন নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা মোট নারী ব্যবসায়ীর ২ থেকে ৩ শতাংশও হবে না। এর মূল কারণ, শুধু নারী হওয়ার কারণে একজন বড়মাপের পুরুষ ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তার তুলনায় বাড়তি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। করোনাকালীন সংকটে পুঁজি সংকটই সবচেয়ে বড় সংকট। আমাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রয়োজন। ব্যাংকে গেলেই এটা-ওটা কত শর্ত যে জুড়ে দেয়। আমি বহু বছর থেকে প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা করছি। করোনার কারণে ব্যবসা প্রায় এক বছর বন্ধ ছিল। এখন পর্যাপ্ত পুঁজি পেলেই আবারও আগের মতো লাভে আসতে পারব। নারী বলেই হয়তো আমার ওপর আস্থা কম!’

মন্তব্য