kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

বিদেশেও যাচ্ছে সিলেটের বেকারি পণ্য

সস্তা বিস্কুটের সঙ্গে মানের প্রতিযোগিতা

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সস্তা বিস্কুটের সঙ্গে মানের প্রতিযোগিতা

সিলেটে একটি বেকারিতে সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে বিস্কুট। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

বাজার প্রতিযোগিতা, প্রতিবন্ধকতা এবং কাঁচামালের দামের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে টিকে থাকতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে সিলেটের বেশির ভাগ বেকারিকে। তার ওপর রয়েছে করোনার বিরূপ প্রভাব। তাতে ব্যবসা কমেছে স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় অন্তত ৩০ শতাংশ। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সিলেটের একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিস্কুটসহ বেকারি পণ্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে।

সিলেটের একাধিক বেকারি মালিক এবং সদ্য গঠিত বেকারি মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি’র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তাঁরা বলেছেন, যে চারটি কাঁচামাল প্রধানত তাঁরা ব্যবহার করেন সেগুলোর দাম গত ছয় মাসে কয়েক দফায় বেড়েছে। এসব কারণে পণ্যের গুণগত মান ধরে রেখে টিকে থাকা তাঁদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দেশের অন্য জেলা থেকে নিম্নমানের বিস্কুটসামগ্রী এনে ঠেলাগাড়িতে করে সস্তায় বিক্রির কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তাঁরা।

সিলেটের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে মৌমিতা ব্র্যাড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরি, পুষ্টি ফুডস, ফিজা অ্যান্ড কোং, রিফাত অ্যান্ড কোং, মধুফুল। স্বল্প পরিসরে হলেও সিতারা বেকারি, শরীফ বেকারির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। চট্টগ্রামের বনফুল অ্যান্ড কোং, ওয়েল ফুড, মধুবন, ফুলকলির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে ফিজা অ্যান্ড কোং, মধুফুল, রিফাত অ্যান্ড কোংয়ের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান বিপণনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

স্থানীয় বেকারিগুলোর মধ্যে ২২ বছর ধরে ব্যবসা করছে মৌমিতা ব্র্যাড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরি। প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক করিমউল্লাহ হেলাল বলেন, ‘চলতি শতকের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের বনফুলসহ প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো সিলেটে তাঁদের কারখানা চালুর পর আমাদের এক ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু তার পরও আমরা পাল্লা দিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিম্নমানের বিস্কুট এনে কম দামে বিক্রির কারণে আমাদের বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে। তা ছাড়া বেকারির সব ধরনের কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু আমরা পণ্যের দাম বাড়াতে পারি না।’

প্রায় তিন দশক ধরে দাপটের সঙ্গে সিলেটে ব্যবসা করে আসছে স্থানীয় পুষ্টি ফুডস। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আব্দুল মুতালিব বলেন, ‘স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আমরা সিলেট সীমান্তবর্তী ভারতের করিমগঞ্জে বিস্কুট, ড্রাই কেক, টোস্ট বিস্কুটসহ কিছু বেকারিসামগ্রী রপ্তানি শুরু করেছি। ধীরে ধারে অন্য রাজ্যগুলোতেও তা সম্প্রসারণের ইচ্ছা আছে আমাদের।’ করোনা ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন রপ্তানি বন্ধ ছিল। এখন আবার স্বল্প পরিসরে শুরু হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো ৩০ শতাংশ কমে গেছে ব্যবসা।’

মৌমিতা, পুষ্টির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকলেও সিতারা বেকারি, শরিফ বেকারি, সানবেস্টের মতো এক সময়ের জনপ্রিয় বেকারিগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আবার ফিজা, রিফাতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থায়ও আধুনিকতা এনে পাল্লা দিচ্ছে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে। এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ফিজা অ্যান্ড কোং। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্যের বাজার দেশজুড়ে রয়েছে। সিলেটে তাদের ৬৪টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। পাশাপাশি বিস্কুটসহ বিভিন্ন শুকনো পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় রপ্তানি করছে।

ফিজা অ্যান্ড কোংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. নজরুল ইসলাম বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের পাশাপাশি এক দশক ধরে বিদেশেও আমরা পণ্য রপ্তানি করছি। আপাতত কানাডা, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় আমাদের পণ্য যাচ্ছে।’ করোনার কারণে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিতেও প্রভাব পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে প্রতি মাসে ইংল্যান্ড ১০ কনটেইনার, আমেরিকায় চার কনটেইনার এবং কানাডায় তিন কনটেইনার মালপত্র যেত। সেটা আরো বাড়ার কথা। কিন্তু করোনা পরবর্তী সময়ে সব মিলিয়ে এখন প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ কনটেইনার পাঠানো যাচ্ছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম পণ্য যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বেকারির প্রধান কাঁচামালের মধ্যে তেল, ময়দা, ডালডা ও চিনি অন্যতম। এর মধ্যে শুধু তেলের দাম গত ছয় মাসে কত দফায় বেড়েছে সবার জানা। ময়দা ও ডালডার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কাঁচামালের দাম বাড়লেও আমরা তো পণ্যের দাম বাড়াতে পারছি না। ফলে লাভ থাকছে না বললেই চলে।’

সিলেটের বন্দরবাজার, স্টেডিয়াম মার্কেট, আম্বরখানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়িতে করে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতা আনিস মিয়া জানান, প্রতি কেজি বিস্কুটের দাম ১০০ টাকা। সব বিস্কুটের একই দাম। একসঙ্গে বেশি পরিমাণে কিনলে কেজিতে পাঁচ টাকা কম রাখা যাবে।’ এসব বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে কম দামে বিস্কুট কিনে এনে এখানে বিক্রি করছেন তাঁরা। সস্তায় পাওয়া যায় বলে অনেকে মানের বিষয়টি বিবেচনায় না রেখেই এসব পণ্য কিনছেন।

বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি সিলেট জেলার সচিব কাওসার হোসেন বলেন, ‘এসব নিম্নমানের বিস্কুট সস্তায় খোলাবাজারে বিক্রির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় মাঝারি ও ছোট বেকারি মালিকরা। গুণগত মান ঠিক রেখে তাঁদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাঁরা পেরে উঠছেন না।’

মন্তব্য