kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

ফুলের চাহিদার ৭০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে গদখালী

করোনার ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা ভালোবাসা দিবসে

ফিরোজ গাজী   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনার ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা ভালোবাসা দিবসে

বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের আগমনে শাহবাগ ভরে উঠেছে নানা রঙের ফুলে। গতকাল ফুলের দোকানগুলোতে ছিল ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়। ছবি : শেখ হাসান

দেশের ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালী। সবচেয়ে বড় ফুলের হাট বসে এখানেই। দেশে ফুলের চাহিদার ৭০ শতাংশই সরবরাহ করা হয় এই অঞ্চল থেকে। যশোরের ছয় হাজার ফুল চাষির মধ্যে পাঁচ হাজার ফুল চাষিই এই গদখালী, পানিসরা ও আশপাশের ইউনিয়নের গ্রামগুলোর। আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই তিন দিবসে ফুলের চাহিদা ও বিক্রি বাড়ে সবচেয়ে বেশি। দামও মেলে আশানুরূপ। এ কারণে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এই তিন বিশেষ দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতে ফুলের সৌরভ ছড়াতে বিশেষ প্রস্তুতি নেন যশোরের ফুল চাষিরা।

অথচ এই তিন উৎসব সামনে থাকলেও এবার এই অঞ্চলে ফুল চাষ কম হচ্ছে। করোনায় ফুল বিক্রি করতে না পেরে ক্ষতির শিকার হওয়ায় সাধারণ ফুল চাষিদের পুঁজির সংকট, যথাযথ সরকারি সহযোগিতা না পাওয়া এবং অনুষ্ঠান আয়োজনে সরকারি বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকায় ফুল বিক্রি কম হওয়া ও উপযুক্ত দাম না পাওয়ার শঙ্কায় আগের মৌসুমগুলোর তুলনায় এবার এই অঞ্চলের ফুল চাষিরা কম জমিতে ফুল চাষ করছেন। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি সূত্রে জানা গেছে, করোনার আগের মৌসুমেও এই এলাকায় প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। অন্য বছরগুলোতে এই অঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়। এবার তার ৩০ শতাংশ কম জমিতে ফুল চাষ হয়েছে।

এই অঞ্চলের পানিসরা, গদখালী, নারাঙ্গালি, হাড়িয়া, পটুয়াপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে দেখা যায়, মাঠে মাঠে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধ্যা, গ্লাডিওলাস, জারবেরাসহ বিভিন্ন ফুলের ক্ষেতে পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকরা। করোনার কারণে গত বছর ফুল বিক্রি করতে পারেননি তাঁরা। এ কারণে ক্ষেতের ফুল ক্ষেতেই শুকিয়েছে। তবে করোনা বিদায় না হলেও এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ফুল বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তিন বিশেষ দিবসে চাহিদা বাড়বে ফুলের, মিলবে আশানুরূপ দাম, এমন আশায় বাজার ধরার প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের ফুল চাষিরা।

পটুয়াপাড়া গ্রামে কথা হয় ফুল চাষি আনিসুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, করোনার সময় তাঁর দেড় বিঘা জমিতে গোলাপ ও দুই বিঘা জমিতে গাঁদা ফুল ছিল। ফুল বিক্রি করতে না পারায় ক্ষেতেই নষ্ট হয়। এতে সে সময় তাঁর ৮০ হাজার টাকা লোকসান হয়। কিন্তু সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি, এ কারণে এবার শুধু দেড় বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন।

একই গ্রামের ফুল চাষি রাকিবুল হাসান বলেন, ‘করোনার সময় প্রায় তিন বিঘা জমির ফুল নষ্ট হয়ে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জমি লিজ নিয়ে ফুল চাষ করি। লিজের টাকা তো শোধ করতি হয়। সরকারের কোনো সহযোগিতা পাইনি। এইবার আবার চিষ্টা করতিছি টিকে থাকতি। যদি ঠিকমতোন ফুল বেচতি পারি, দাম ভালো পাই তালি ৫০ হাজার টাকার মতো ফুল বেচতি পারবানে। তাতে কিছু দিনা শোধ করতি পারবানে। এইজন্যি এইবার দুই বিঘে জমিতি গোলাপ চাষ করিছি। দেখি কী আছে কপালে?’

তাঁদের মতো নীলকণ্ঠনগরের ফুল চাষি ইউসুফ আলী ৩০ শতক জমিতে গোলাপ এবং ৬৫ শতক জমিতে গ্লাডিওলাস করেছেন। গতবার লস হওয়ায় তিনিও কম ফুল চাষ করেছেন। বড় অঙ্কের গচ্চা যাওয়ায় হাড়িয়া গ্রামের ওমর আলী এবার এক বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন। অথচ গতবার তিনি এক বিঘা জমিতে গোলাপ, এক বিঘা জমিতে গাঁদা এবং ১৫ কাঠা জমিতে রজনীগন্ধা চাষ করেছিলেন। পুঁজি স্বল্পতা এবং ফুল বিক্রি ও উপযুক্ত দাম না পাওয়ার শঙ্কায় তাঁদের মতো এই এলাকার বেশির ভাগ ফুল চাষিই এবার কম ফুল চাষ করেছেন বলে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, ‘করোনায় ফুল চাষিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত মৌসুমে ফুল বিক্রি না করতে পেরে তাঁরা পুঁজির সংকট, সব ফুল চাষি যথাযথ সরকারি সহযোগিতা না পাওয়া, অনুষ্ঠান আয়োজনে সরকারি বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকাসহ কয়েকটি কারণে ফুল বিক্রি নিয়ে এবারও অনিশ্চয়তা রয়েছে ফুল চাষিদের মধ্যে। এসব কারণে এবার অন্য মৌসুমের তুলনায় ৩০ ভাগ কম জমিতে ফুল চাষ হয়েছে।’ ফুল চাষিরা এবার যেন ফুল বিক্রি করতে পারেন সে জন্য তিনি স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

যদিও ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, ‘করোনায় ক্ষতির কারণে ৩০ ভাগ জমিতে ফুল চাষ কম হওয়ার তথ্য সঠিক নয়। ১৫ থেকে ২০ ভাগ কম জমিতে ফুল চাষ হয়েছে। তবে করোনায় এই অঞ্চলের ফুল চাষিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এটা সঠিক। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত ফুল চাষিদের টিকে থাকতে তাঁদের মধ্যে ধানের বীজ ও টমেটো চারা বিতরণ করেছি। আশা করছি শিগগিরই তাঁরা সরকারি সহযোগিতাও পাবেন।’



সাতদিনের সেরা