kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

ডিজিটালে বাধ্য হলো চট্টগ্রাম বন্দর

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডিজিটালে বাধ্য হলো চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা, সরবরাহ, ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখা এবং কাস্টমসের শুল্কায়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আগে থেকেই ছিল। কিন্তু বন্দর ব্যবহারকারী সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থা প্রযুক্তিভিত্তিক ছিল না। কারো প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করার সক্ষমতা থাকলেও ব্যবহার হতো না; আবার কোনো সংস্থার প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। কোনো সংস্থা আগে থেকেই ম্যানুয়ালি বা সনাতন পদ্ধতিতে কাজ করছিল বলেই সেই গণ্ডি থেকে বের হতে পারছিল না। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারি প্রত্যেক সংস্থা এবং ব্যক্তিকে বাধ্য করেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাল দিতে।

এখন সনাতন পদ্ধতির বদলে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। এর ব্যবহার কভিড মহামারির প্রকোপ কমে যাওয়ার পরও এখন ব্যবহার চলছে। এর ফলে আগের চেয়ে কাজ করতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে, ভোগান্তি কমেছে। কম সময়ে বেশি কাজ করা যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় ‘সিটিএমএস প্রযুক্তি’ আগে থেকেই ছিল। চালু হয়েছে ‘ডিজিটাল বার্থিং’; বহির্নোঙরে জাহাজ তদারকিতে চালু আছে ‘ভিটিএমআইএস প্রযুক্তি’। বন্দরে পণ্যবাহী গাড়ি প্রবেশে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি; বন্দর সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশপথে বসেছে আধুনিক প্রযুক্তির গেট। এর পরও সব প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় ছিল না; অনেক বিভাগ সক্ষমতা থাকলেও প্রযুক্তি ব্যবহার করত নামমাত্র। এর ফলে অনেক কাজ সম্পাদন হচ্ছিল সনাতন পদ্ধতিতে বা ম্যানুয়ালি। কিন্তু কভিড মহামারি শুরুর পর থেকে অনেকটা বাধ্য হয়েই বেশি বেশি প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। 

যেমন : কভিড প্রকোপ শুরুর আগেই চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভিড়তে চালু হয়েছে ‘ডিজিটাল বার্থিং’। কৃতিত্বের জন্য বন্দর চেয়ারম্যান অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন কিন্তু সেটি পুরোপুরি চালু হয়নি। ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলেও আবার কাগজপত্র ম্যানুয়ালি জমা দিতে হতো ঠিকই। কভিডের সময় যখন সামাজিক দূরত্ব বাধ্যতামূলক হলো তখন ডিজিটাল বার্থিং পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ল। অথচ আগে থেকেই পুরোপুরি চালু হলে এর সুফল মিলত কভিড সময়ে।

বন্দরে সিটিএমএস পদ্ধতি চালু হলেও পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছিল না আবার সমন্বয়ও ছিল না; কিন্তু কভিড সময়ে এসে সিটিএমএস ব্যবহারে নির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বার্থিংয়েও সুফল মিলেছে অনেক।

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের অনেকগুলো বিভাগ আগে থেকেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে কাজ চলছে। বন্দর একা ডিজিটাল হলে কী হবে; বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একই সঙ্গে ডিজিটাল না হয় তাহলে সুফল পুরোপুরি মিলবে না। এর পরও কভিড সময়ে সারা দেশে লকডাউন চললেও চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন কাজ এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার করে বন্দরের কাজে সহযোগিতা করেছে। ফলে সেই কঠিন সময়ে কাজ করতে আমাদের খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।’

চট্টগ্রাম বন্দরে একজন টার্মিনাল অপারেটর এবং ১২ জন বার্থ অপারেটর রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেবল টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকই প্রযুক্তিনির্ভর কাজ করছে। বাকি অপারেটরদের প্রযুক্তিনির্ভরতার কোনো বালাই নেই। তবে এবার কভিডে তাঁদের প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়েছে।

কভিড সময়ে কিভাবে পরিচালন কাজটি করেছেন জানতে চাইলে টার্মিনার অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের চিফ অপারেটিং অফিসার তানভীর হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভরতা আমাদের আগে থেকেই ছিল কিন্তু কভিড সময়ে সেই নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। আমাদের কর্মীদের প্রবেশপথেই আমরা ফিঙ্গারপ্রিন্টের বদলে স্মার্ট কার্ডে নিয়ে এসেছি। অফিসার থেকে শুরু করে কর্মীদের অফিসের বদলে জেটি-ইয়ার্ড-জাহাজে থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। সবাইকে বিভিন্ন বিভাগের ১১টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করে কাজে নামিয়ে দিয়েছিলাম।’

তিনি বলেন, কোনো কাজের বন্দরের অনুমতি পেলে সঙ্গে সঙ্গেই সেটি গ্রুপে দিচ্ছিলাম; আর তাতেই কাজ শুরু হয়ে যায়। কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে স্পট থেকেই ছবি-ভিডিও তুলে গ্রুপে দিচ্ছিল। আমরা তাত্ক্ষণিক সমাধান দিচ্ছিলাম; সেটা রাত ১টা হোক বা ভোরবেলার শিফটে হোক।’

ক্যাপ্টেন তানভীর হোসাইন বলেছেন, ‘জাহাজে যারা ছিল তারা সেখানেই কর্মরত ছিল; কাজ শেষে চলে গিয়েছিল। ইয়ার্ড বা জেটিতে যারা কাজ করত, কাজ শেষে তারা সেখান থেকেই চলে গিয়েছিল। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা কর্মীদের আসা-যাওয়ার জন্য নিজস্ব বাসের ব্যবস্থা করেছিলাম। এর ফলে আমাদের পণ্য ওঠানামার কাজে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি; উল্টো বড় সুফল পেয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা এখনো বহাল রেখেছি আমরা।’

বন্দরের ১২ বার্থ অপারেটরও একই ধাঁচে কাজ করেছে। বার্থ অপারেটর পঞ্চরাগ উদয়ন সংস্থার পরিচালক রফিকুল আনোয়ার বাবু বলেন, ‘কভিড সময়ে আমরা যখন সরাসরি বন্দর জেটিতে গিয়ে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছিলাম না। তখনই আমাদের জেটি স্টাফদের সবাইকে স্মার্টফোন কিনে দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করে রিয়েলটাইম মনিটর করেছি। এমনকি ভিডিও অন রেখেও কাজ করেছি; যাতে কাজটি নিখুঁত হয়। এর সুফল পেয়েছি এবং পাচ্ছি।’

বন্দর ব্যবহারকারী সরকারি-বেসরকারি প্রায় ২৫টি সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। কাস্টমসে স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন চালু হয়েছে অনেক আগেই। অনেক বিভাগেই এখন ডিজিটালি কাজ হচ্ছে কিন্তু বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ সিস্টেমের অনেক মডিউল এখন পর্যন্ত ডিজিটাল হয়নি। যেমন পণ্য শুল্কায়ন সব কিছু স্বয়ংক্রিয় হলেও শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে ব্যাংকে গিয়ে ম্যানুয়ালি। ডিজিটাল ব্যাংকিং সিস্টেমে সংযোগ হয়নি কাস্টমসের।

বিদেশি শিপিং লাইনগুলোর দেশি এজেন্টরা আগে থেকেই ডিজিটাল প্রযুক্তিভিত্তিক ছিল। বিদেশি কম্পানির সঙ্গে পুরোপুরি প্রযুক্তিভিত্তিক কাজ করলেও দেশে কাজ করতে হতো অর্ধেক ডিজিটালি। কিন্তু কভিডের কারণে দেশেও তাদের কাজে ডিজিটাল নির্ভরতা বেড়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা