kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

খামার স্থাপনে ঋণ দিচ্ছে বিসিক

এবার উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার টন মধু

সজীব আহমেদ   

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এবার উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার টন মধু

করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই সময়ে মধুর উপকারিতা নিয়ে নানা আলোচনা চলেছে। এটি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে মধুর চাহিদা অন্য সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তাই দেশি উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদনে আরো বেশি সোচ্চার হয়েছে। বর্তমানে দেশে দুই হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক বা পেশাদার মৌ খামার রয়েছে। অপেশাদার বা শৌখিনভাবে মৌ পালন করছে আরো ২৫ হাজার। তার মধ্যে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি মৌ বাক্স রয়েছে। গত বছর ১০ হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হয়েছে। এ বছর এখন সরিষার মাঠ থেকে মধু আহরণ করা হচ্ছে। তবে এ বছর ১২ হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মৌ চাষের প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি চাষিদের উৎপাদিত মধু বাজারজাতকরণে সহায়তা করে যাচ্ছে বিসিক। বাংলাদেশে উৎপাদিত ৫০০ মেট্রিক টন মধু জাপান, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। চাষিরা এখন রপ্তানির জন্য বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষে ঝুঁকছেন। দেশের মৌ খামারগুলো থেকে এক লাখ টন মধু আহরণের সুযোগ রয়েছে। সেই লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। মধুর উৎপাদন বৃদ্ধি, মৌ চাষিদের প্রশিক্ষণ ও যাবতীয় উন্নয়নে যৌথভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কাজ করছে বিসিক।

বিসিক থেকে জানা যায়, বিসিক দেশে প্রথম ১৯৭৭ সালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাগেরহাট জেলার যাত্রাপুরে কাঠের বাক্সে দেশীয় মৌমাছির জাত ‘ফেরেনা’ চাষ শুরু করে। এতে বিসিক সাফল্য অর্জন করায় দেশের ছয়টি জেলায় স্থায়ী সেন্টার করে। এই সেন্টারগুলোতে মানুষের প্রশিক্ষণ, ব্যাপক প্রচারণা ও বিভিন্ন মেলার কারণে দেশের মানুষ বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষ শুরু করেন। এরই মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বোতলে করে মধু বাজারজাত করছে। তার মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রসেসিং প্লান্ট হিসেবে কাজ করছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এপি, ট্রপিকা, হানি বাংলাদেশ, সুন্দরবন অ্যাগ্রো ও সলিড হানি। বিসিকের আওতায় এবং আওতাবহির্ভূত সব মৌ চাষিকে বিসিকের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করানো হচ্ছে। যাতে তারা বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স নিয়ে বাজারজাত করতে পারে।

জানা গেছে, বিসিক বাণিজ্যিকভাবে এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মৌ চাষিকে আধুনিক পদ্ধতিতে মৌ চাষের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এই কার্যক্রম প্রসারে মৌমাছি পালন স্থায়ী ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে বিসিক। ক্রমাগতভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন মৌ চাষি তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া মৌ চাষে উপযোগী আরো ১২টি জেলায় বিশেষ খামার সৃষ্টি করে মধু উৎপাদনে কাজ করছে সরকার।

প্রশিক্ষণ শেষে বিসিকের নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণ পাচ্ছে এবং মৌ চাষের জন্য একটি আলাদা ঋণ প্রকল্প আছে সেটি থেকেও ৯ শতাংশ হারে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। খামার স্থাপনের জন্য ১৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত এই ঋণ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ মৌ চাষি ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও মধু চাষি এবং হানি বাংলাদেশ প্রসেসিং প্লান্টের মালিক মো. এবাদুল্লাহ আফজাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যারা মৌ চাষ করি তারা সরিষার আবাদ করি না। বিভিন্ন জেলায় যেখানে সরিষার মাঠ আছে সেখানে মৌমাছির বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করি। একইভাবে আবার কালোজিরা, ধনিয়া, বরই, লিচুর ফুলসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুল থেকেও মধু সংগ্রহ করে থাকি আমরা। আমি ভারতে ‘হানি বাংলাদেশ’ নামে মধু রপ্তানি করছি, আমার প্রসেসিং প্লান্ট গাজীপুরে। দেশে মধু আহরণের প্রচুর সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে যদি আরো প্রশিক্ষণ, ঋণের ব্যবস্থা ও মৌমাছি সরবরাহ করা যায়, তাহলে দেশের বেকারত্বের সমস্যা দূর হওয়ার পাশাপাশি মধুর উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি মাইলফলক হবে মধু রপ্তানিতে বাংলাদেশ।

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে খামারিদের বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ঋণ দেয় সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। আগে সরিষার মাঠ থেকে মধু সংগ্রহ করতে দিতেন না কৃষকরা, তাঁদের ধারণা ছিল ফুল থেকে মধু আহরণ করা হলে ফসলের ক্ষতি হয়। সেটা ২০১৬ সাল থেকে কৃষি সম্প্রসারণ কৃষকদের বুঝিয়ে এটি সমাধান করেছেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি সরিষা চাষিদের এবং মৌ চাষিদের ৪ শতাংশে সার্ভিস লোন দেওয়ার জন্য। তাহলে অবশ্যই সরিষা চাষি ও মধু উৎপাদন দুটিই আরো বাড়বে।’

বিসিকের মৌ চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে এই প্রকল্পের দায়িত্বরত খন্দকার আমিনুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মধু অত্যন্ত নামকরা সুমিষ্ট মধু। এই মধুর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। মধু উন্নয়নে বিসিকের সব কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ফলে মধু চাষ বা চাষি বাড়ছে। দেশে প্রায় সাত লাখ হেক্টর জমির কাছাকাছি সরিষা আবাদ হয়। এগুলোতে যদি আমরা মৌ খামার স্থাপন করতে পারি তাহলে আমাদের দেশে এক লাখ মেট্রিক টন মধু আহরণ করা সম্ভব। সেই সঙ্গে ব্যাপক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও রয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, ‘মধু সংরক্ষণ ও চাষিদের প্রশিক্ষণ বাড়ানোর জন্য একটি স্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুবই প্রয়োজন। দেশে এখন সময় এসেছে মধু নীতিমালা তৈরি করা, যে নীতিমালার আলোকে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গুণগত মান বজায় রেখে মধু উৎপাদন করা হবে। যাতে নিরাপদ খাদ্য হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা যায়। সে সময় এখন সামনে এসেছে। করোনাকালে দেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বেই মানুষ মধু খাওয়ায় ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়েছেন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি,

স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে চাষিদের মৌ বাক্স, মৌমাছি ও বিভিন্নভাবে সহায়তা দিচ্ছি। দেশে বহু বেকার রয়েছে যারা এখন মধু চাষে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা