kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

সুন্দরবনে মধু আহরণ বেড়েছে ৩২ শতাংশ

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট) ও আজিজুর রহমান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)   

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুন্দরবনে মধু আহরণ বেড়েছে ৩২ শতাংশ

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক অথবা চাষের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু গুণে-মানে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের মধুর চাহিদা বেশি। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মধু আহরিত হয়। এ বছর ৭১২ কুইন্টাল মধু এবং ২১৪ কুইন্টাল মোম আহরিত হয়, যা গতবারের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি। বন বিভাগ মধু ও মোম থেকে রাজস্ব আয় করেছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। শরণখোলা উপজেলার প্রায় পাঁচ মৌয়াল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গহিন বন থেকে এই মধু আহরণ করেছেন। এই মধুশিল্পের সঙ্গে মৌয়াল, তাঁদের পরিবার ও ব্যবসায়ী মিলিয়ে শরণখোলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে।

জানা যায়, সুন্দরবনে পাঁচ ধরনের মধু পাওয়া যায়। এসব মধুর সঙ্গে ভেজাল মধুও তৈরি করছে অনেকে। মধু আহরণে সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকায় ব্যবহার হচ্ছে সনাতন পদ্ধতি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মৌমাছি। অন্যদিকে মধু আহরণ করতে গিয়ে বনের মধ্যে খাবার পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন মৌয়ালরা। এ ছাড়া মধু আহরণ, সংগ্রহ, পরিবহন ও বিপণনে রয়েছে নানা জটিলতা।

বছরের এপ্রিল মাসে শুরু হয় মধু আহরণের মৌসুম। চলে জুন পর্যন্ত। সুন্দরবনের সবচেয়ে সুস্বাদু ও দামি খলিসা ও গরান ফুলের মধু আসে প্রথম মাসে। এর পরই আসে কেওড়া ও গেওয়ার মধু। আবার ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে পাওয়া যায় জার্মানি লতা (স্থানীয় ভাষায় যশোরি লতা) ফুলের মধু। মধু আহরণের জন্য বন বিভাগের নির্ধারিত রাজস্বের মাধ্যমে ১৫ দিনের পাস দেওয়া হয়। পাস নিয়ে শরণখোলা রেঞ্জের নির্ধারিত দুবলা, নীলকমল, ভেদাখালী, আমবাড়িয়া, কালামিয়া, আগুনজ্বলা খাল ও খাজুরা এলাকার বনে যান মৌয়ালরা।

তবে মধু আহরণে তাঁদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই বলে জানান আহরণকারীরা। এ জন্য অনেক মৌয়ালকে এখনো চাকে আগুন জ্বালিয়ে মধু ভাঙতে দেখা যায়। এতে মৌমাছি পুড়ে মারা যায়। অনেকে পুরো চাক কাটার ফলে নতুন করে সেখানে আর মৌচাক তৈরি হয় না। এ ছাড়া মধু আহরণ করতে গিয়ে গহিন বনে মৌয়ালদের সুপেয় পানির সংকট এবং সাপ বা বন্য প্রাণীর আক্রমণে আহত হলে চিকিৎসা পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বনের বাঘ, হরিণকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, একইভাবে রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত মৌমাছি সংরক্ষণেও উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশিক্ষিত করতে হবে মৌয়ালদের। সুন্দরবনে মধু আহরণের এলাকা বৃদ্ধি করতে হবে। বন বিভাগকে মৌয়ালদের দ্রুত এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা, মধু পরিবহন ও বিপণনে সহায়তা করতে হবে। এতে সুন্দরবন থেকে আহরিত মধু ও মোমে দেশের চাহিদা অনেকটা পূরণ করা সম্ভব হবে।

প্রায় এক যুগ ধরে মধুর সঙ্গে সম্পর্ক শরণখোলার বনসংলগ্ন খুড়িয়াখালী গ্রামের রাসেল আহমেদের। সুন্দরবনের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষের মধুও সংগ্রহ করেন তিনি। দুই ধরনের মধুর পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে স্বাদ-গন্ধ ও গুণে-মানে সুন্দরবনের মধু সেরা বলে বিবেচিত হয়েছে তাঁর গ্রাহকদের কাছে। রাসেল জানান, মৌসুমের শুরুর দিকে ২০-২২ হাজার টাকা মণ থাকে। বর্তমানে মধুর চাহিদা ব্যাপক। তাই এখন প্রতি মণ মধু ৩০-৩৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।

রাসেল আরো জানান, সুন্দরবনের মধুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তাই অনেক সময় মধু বিক্রি করতে গিয়ে এর মান নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। সরকার বা বন বিভাগ বনসংলগ্ন এলাকায় মান নির্ণয়ের জন্য ল্যাব স্থাপন, সহজভাবে বিএসটিআইয়ের অনমোদন পাওয়া, ব্যবসায়ী ও মৌয়ালদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে সুন্দরবনের মধুর ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ঘটানো সম্ভব।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, সুন্দরবনের মধু আহরণকারীদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ সব সময় সহযোগিতা করে থাকে। মধু আহরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মৌয়ালদের প্রশিক্ষিত করার জন্য সামনে সুন্দরবন সুরক্ষায় যেসব প্রকল্প আসছে, এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।

শ্যামনগরে মধু নিয়ে কাজ করে বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ এনভায়ারমেন্ট ডেভলপমেন্ট সোসাইটির পরিচালক মাসুদুর রহমান মুকুল বলেন, প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত সুন্দরবনের মধু উত্কৃষ্ট মানের। কিন্তু উৎপাদিত মধু সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা গেলে বিদেশে অধিক মূল্যে বিক্রি করা যাবে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ।

তিনি নিউজিল্যান্ডে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ভানুকা মধুর কথা উল্লেখ করে বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মধু। প্রতিকেজি মধু ৫০/৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এ অঞ্চলে মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা