kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

মৌয়াল পেশায় ৩০ বছর

‘হিংস্র বাঘ আর ডাকাতের চোখ এড়িয়ে সুন্দরবনে যাই নিয়মিত’

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘হিংস্র বাঘ আর ডাকাতের চোখ এড়িয়ে সুন্দরবনে যাই নিয়মিত’

আনোয়ার হোসেন আকন

জলে কুমির-বনে বাঘ ছাড়াও অসংখ্য হিংস্র প্রাণীর ভয় উপেক্ষা করে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে হয়। এর বাইরে আছে বনদস্যুদের আক্রমণ। তবুও পেশা বদলানোর ইচ্ছে নেই তাঁর। নিয়মিত বনে যাচ্ছেন মধু সংগ্রহ করতে। তিনি বাগেরহাটের শরণখোলার দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন আকন (৫০)। ৩০ বছর ধরে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও হতদরিদ্র বাবার সংসারের হাল ধরতে মাত্র ২০ বছর বয়সে গহিন বনে মধু আহরণে নেমে পড়েন। এই পেশাকেই এখন আপন করে নিয়েছেন তিনি। অবশ্য একবার প্রাণসংশয়ে পড়তে হয়েছে তাঁর ও তাঁর দলের সদস্যদের।

শ্বাসরুদ্ধকর সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আনোয়ার হোসেন আকন বলেন, ‘২০১৫ সালের ২০ মার্চের ঘটনা। বনে মধু ভেঙে ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে কটকার ছোট চিত্রার খালে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় বনদস্যু বেল্লাহ হোসেন ওরফে ফেরাউন বেল্লালের বাহিনী আমাদের নৌকা দেখে তাঁদের কাছে যেতে বললে আমরা দ্রুত নৌকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করি। এরই মধ্যে পেছন থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। ১৫-২০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে আমার নৌকার তিনজন মৌয়াল গুলিবিদ্ধ হন। প্রথম গুলিটা আমার ডান কানের পাশ থেকে ফসকে সহযোগী মৌয়াল সোহাগ হাওলাদারের তলপেটে গিয়ে লাগে। এরপর একে একে লিটন হাওলাদারের পিঠে এবং মাহাবুল তালুকদারের ডান হাত ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। পরে দস্যুরা আমাদের নৌকায় উঠে সাত মণ মধুসহ আমাকে এবং সহযোগী রশিদ পেয়াদা ও রাজ্জাক তালুকদারকে তুলে নিয়ে যান। আমি কৌশলে দস্যুদের ট্রলার থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়ে পালিয়ে আসি। পরে কটকার বনরক্ষীরা খবর পেয়ে গুলিবিদ্ধ তিনজনসহ আমাদের উদ্ধার করে শরণখোলা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে খুলনায় পাঠায়। তাঁদের চিকিৎসায় আমার প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়। তা ছাড়া ঘটনার ২৪ দিন পর ওই দুই মৌয়ালকে ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে দস্যুদের কবল থেকে ছাড়িয়ে আনি।’

আনোয়ার আকন জানান, চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজ। অভাবের কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি। ছোটবেলা থেকেই বাবা নূর মোহাম্মাদের মধু সংগ্রহ দেখে দেখে অভ্যস্ত হন। বাবার কাছ থেকে মধু সংগ্রহের কৌশলও আয়ত্ত করেছেন। তারপর বাবার সঙ্গে বনে যান। প্রথম তিন বছর বাবার সঙ্গে এবং অন্যের নৌকায় ভাগি হিসেবে মধু ভাঙতে যেতেন বনে। পরে ১১ জনকে নিয়ে নিজেই একটি দল তৈরি করে মধু সংগ্রহ শুরু করেন।

নব্বই দশকে মৌসুমের দুই-আড়াই মাসে ৭০-৮০ কেজি করে মধু পেতেন একেকজন। ওই সময় এক মণ মধু বিক্রি হতো আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। এখন এক মণ মধু পাইকারি ২০-২২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধু বিক্রি করতে তেমন সমস্যা না হলেও দাদনের জালে তাঁর মতো অনেকেই আটকে আছেন।

আনোয়ারের অভিযোগ, অনেকেই মশাল জ্বালিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করছে। বিশেষ করে যারা অসচেতন, আবার যারা বন বিভাগ থেকে পাস না নিয়ে অবৈধভাবে মধু ভাঙছে, তারা মৌমাছি ও চাক আগুন দিয়ে ধ্বংস করছে। যার কারণে প্রকৃত মধু সংগ্রহকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আনোয়ার আরো জানান, বর্তমানে পাসের মেয়াদ ১৫ দিন হওয়ায় পরবর্তী পাসের জন্য তাড়াহুড়া করতে হয়। মধু আহরণে প্রযুক্তিগত কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তারা যে মধুটা সংগ্রহ করে তা স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। হাত দিয়ে চটকে মৌচাক থেকে মধু বের করতে হয়। তাদের নেই নির্দিষ্ট পোশাক-জুতা। সাধারণ জামা পরে মুখে গামছা পেঁচিয়ে শরীরে মৌমাছির কামড় খেয়ে চাক ভাঙে তারা। তা ছাড়া দুর্গম বনের মধ্যে কেউ অসুস্থ বা কোনো কারণে আহত হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এতে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয় মৌয়ালসহ বনজীবীদের।

আনোয়ারের দাবি, পাসের মেয়াদ ৩০ দিন, মধু সংগ্রহে প্রশিক্ষণ, পোশাক, চাক থেকে মধু বের করার আধুনিক প্রযুক্তি, বনে ভাসমান চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করলে মৌয়ালরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি মানসম্মত মধু পাওয়া সম্ভব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা