kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

যশোরে সূচশিল্পীদের দুর্দিন

ফিরোজ গাজী   

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যশোরে সূচশিল্পীদের দুর্দিন

যশোরে সেলাইয়ের কাজ করছেন নারীরা ছবি : ফিরোজ গাজী

যশোরের সূচিশিল্পের খ্যাতি দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রয়েছে। যা ‘যশোর স্টিচ’ নামে পরিচিত। হাতে সেলাইয়ের এই কাজ করেন সাধারণত নারীরা। এ থেকে বাড়তি উপার্জনে সংসারের ভার লাঘব হয় কিছুটা। তবে বর্তমানে এসব সূচিশিল্পীদের দিন কাটছে চরম দুর্দশায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালে বেশির ভাগেরই মেলেনি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা। অন্যদিকে তাঁদের দিয়ে কাজ করাতেন যেসব উদ্যোক্তা তাঁরাও ক্ষতিগ্রস্ত। এ কারণে সম্প্রতি ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হলেও পুঁজির অভাবে তাঁরাও সূচিশিল্পীদের দিয়ে তেমন কোনো কাজ করাতে পারছেন না। ফলে কষ্টে-দুর্দশায় দিন কাটছে যশোর অঞ্চলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২০ হাজার নারীর। দুর্দশা লাঘবে তাঁরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

যশোর সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের কাজীপাড়ায় বাড়ি রেহানা বেগমের। স্বামী বালির ট্রাকের শ্রমিক। দুই ছেলে এক মেয়ে ও বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে সংসার। সুঁই-সুতায় নকশা বোনেন তিনি। থ্রি-পিস, টু-পিস, পাঞ্জাবি, নকশি কাঁথা, হাতব্যাগ, কুশন কভার, টেবিল ক্লথসহ বিভিন্ন পোশাকে তিনি হাতে সেলাইয়ের কাজ করেন। সংসারের কাজ করার পর এই কাজ থেকে তিনি মাসে গড়ে আয় করতেন প্রায় তিন হাজার টাকা। এই টাকায় তাঁর দিনমজুর স্বামীর স্বল্প আয়ের সংসারে বড় ভূমিকা রাখত। কিন্তু করোনার সময় স্বামীর কাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি তাঁর জন্য কাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘করোনার সময় খুব কষ্টে গেছে। কিভাবে যে চলিছি তা আল্লা জানে। ভোটের সময় হলি নেতারা আসে। বিপদের সময় কোন খোঁজ নেয় না। এখনো খুব ভালো নেই।’

একই এলাকার তাহমিনা ইয়াসমিন লিমা। তাঁরও আয় বন্ধ হয়ে যায়। দুর্বিষহ দিন কেটেছে, সে সময় তিনিও পাননি কোনো সাহায্য। তবে দেড় মাস হলো তাঁর স্বামীর আবার চাকরি হয়েছে জুতার দোকানে। তিনি বললেন, ‘ছোটখাটো সেলাইকাজ এখন দু-একটা পাচ্ছি। তবে তাতে যে টাকা হয় তা দিয়ে সংসারে তেমন কিছু হয় না।’ ওই এলাকার রওশন আরা বেগমও সেলাইশিল্পী। করোনার কারণে কাজ হারিয়ে তাঁর অবস্থাও প্রায় অন্যদের মতো।

তিনি বললেন, ‘করোনার শুরুতে আইজ পর্যন্ত কোনো সাহায্যও পাইনি। এখন দু-একটা কাজ হচ্ছে। কিন্তু তাতে কী হয়? সংসার চালাতি খুবই কষ্ট হচ্ছে। মাসে এক দিন গোস জুটোনোও ভাগ্যোর ব্যাপার। আবার যারা আমাগের কাজ দিতো তারাও আগের মতোন কাজ দেয় না। চলাডাই তো কঠিন।’ ওই এলাকার সেলাই কাজে জড়িত প্রায় ৩৫ জন নারীর অবস্থাও এমন।

এ ব্যাপারে নারী উদ্যোক্তা ও সেতুলী ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী নাজনীন ইসলাম নাজু জানান, করোনার আগে যশোরের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় দেড় শ নারী সূচিশিল্পীদের দিয়ে তিনি অর্ডার অনুযায়ী নকশি কাঁথা, ওয়ানপিস, টুপিস, থ্রিপিস পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পোশাক ও সামগ্রীতে হাতের কাজ করিয়ে শোরুমে খুচরা বিক্রি করাসহ ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারিও বিক্রি করেন। তাঁর কিছু পোশাক নেপালেও বিক্রি হতো। সব মিলিয়ে মাসে তাঁর বিক্রি ছিল প্রায় দুই লাখ টাকার মতো। তবে করোনার কারণে তিনি পড়েছেন চরম ক্ষতিতে। তিনি জানালেন, সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ছোট-বড় মিলিয়ে যশোর জেলায় এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা শত শত। এসব উদ্যোক্তার সেলাই কাজ করে দিতেন সূচিশিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২০ হাজার নারী। করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই পক্ষই।

তিনি বললেন, ‘করোনার সময় তো ব্যবসা ছিল না। পুঁজি হারিয়ে ফেলেছি। দেশের ভেতরে এখন কিছু চাহিদা হচ্ছে। কিন্তু এসব সূচিশিল্পীদের দিয়ে কাজ করাব কিভাবে? সরকার যদি আমাদের স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করত তাহলেও আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা