kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

সুঁইয়ের ফোঁড়ে সোনালি স্বপ্ন

বগুড়ার নকশি কাঁথায় মুগ্ধ বিদেশিরা

রপ্তানি হচ্ছে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বগুড়ার নকশি কাঁথায় মুগ্ধ বিদেশিরা

বগুড়া সদরে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের সদস্যরা নকশী কাঁথা সেলাই করছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বগুড়ার নিভৃত পল্লীগ্রামের নারীদের হাতে তৈরি নকশি কাঁথা বিশ্ব মাতাচ্ছে। তাঁদের তৈরি কাঁথা ইউরোপের কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। প্রতিবছর বাড়ছে এই নকশি কাঁথার চাহিদা। এর মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি ভাগ্যবদল হয়েছে গ্রামের শত শত নারীর। দেখা মিলেছে সচ্ছলতার। পুরুষদের মতোই কর্মক্ষম এসব নারী পরিবারের জন্য নিজের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করছেন।

গুণগত মানের কারণে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ক্রেতা ছুটে আসছেন বগুড়ার নকশি কাঁথাপল্লীগুলোতে। তাঁদের পছন্দের ফিরিস্তি দিচ্ছেন কারিগরদের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে করোনার প্রভাবে এসব পল্লীতে কাজের চাপ কিছুটা কম বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বগুড়া পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামের বেসরকারি একটি সংস্থার মাধ্যমে নকশি কাঁথা রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে।

এই সংস্থার প্রধান সমন্বয়কারী আবু হাসানাত সাইদ জানান, সারা বছর যে পরিমাণ কাঁথা ও অন্যান্য সামগ্রী সেলাই করা হয় তার প্রায় ৮০ শতাংশই দেশের বাইরে চলে যায়। রাজশাহী সিল্ক কাপড়ে তৈরি করা ৯ বাই ৯ ফুট একটি নকশি কাঁথার দাম বাংলাদেশের বাজারে ২৫ হাজার টাকা। আর বিদেশের বাজারে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকা। দামের তারতম্যের এই বিশাল ফারাকের কারণে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। কারণ পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প সরাসরি বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে না। বিদেশি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দামে পণ্য সরবরাহ করে। সেই ক্রেতাই আবার নিজ নিজ দেশে এসব কাঁথা বিক্রি করেন।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার আখলাজিরা গ্রামের বেবি বেগম গ্রামের অন্য মেয়েদের সেলাই প্রশিক্ষণ দেন। তিনি এখন পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ফিল্ড সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করছেন। বেবি জানান, একটি কাঁথা সেলাই করে একজন মজুরি হিসেবে আয় করেন দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, চাদর এক হাজার টাকা, কুশন ২০০ টাকা, বেডকভার এক হাজার টাকা, মানিব্যাগ ১০০ টাকা, কম্পিউটার কভার ৪০০ টাকা, চশমার কভার ২৫০ টাকা, ছাতা ৮০০ টাকা, টেবিল ক্লথ এক হাজার টাকা, মাফলার ৫৫০ টাকা, শাড়ি তিন হাজার ৫০০ টাকা।

বগুড়ার মহাস্থানগড়ের পশ্চিমে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে ধলমোহনী গ্রাম থেকে সূচিকাজ এখন আশপাশের ১৫-২০টি গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। ধলমোহনী ছাড়াও বিহার, আখলাজিরা, জাহানবাদ, ধাওয়াকোলা, গোকুল, ধাওয়াকান্দি, করততোলা, চাঁদপাড়া, লাহিড়ীপাড়া, পলাশবাড়ী, মহাস্থান মধ্যপাড়া, জানাপাড়া ও নামুজার প্রায় দুই হাজার নারী এই কাজে সম্পৃক্ত। তাঁরা প্রত্যেকেই এখন প্রশিক্ষিত ও স্বাবলম্বী। তাঁদের সূচিকর্মের বিভিন্ন উপকরণ যাচ্ছে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে। গ্রাম ছাড়াও বগুড়া শহরের মধ্যে বৌবাজার, কলোনী, সুলতানগঞ্জপাড়া, মালতিনগরেও এই নকশি কাঁথা সেলাই করা হয়।

ডেনমার্কের গ্রেথা লরেসন বাংলাদেশের এই নকশি কাঁথা দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে তিনি বগুড়ার এসব গ্রামে এসে স্বচক্ষে দেখে গেছেন পল্লীবধূদের এমন সুন্দর সেলাইয়ের কাজ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে ক্রেতা আসেন এবং আসছেন বগুড়ায়। জানিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের চাহিদা। সেইমতো তৈরি হচ্ছে হরেক রকমের নকশি কাঁথার কাজ। সরাসরি বিদেশি ক্রেতা ছাড়াও রপ্তানি ও বাজারজাতকরণের জন্য অর্ডার দিচ্ছে হিট অ্যান্ড ক্রাফট, জাগরণী চক্রসহ দেশীয় রপ্তানিকারক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য এবং দেশীয় চাহিদা মেটাতে ঢাকা ও বিভিন্ন পর্যটন মোটেলে শোরুম চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া বগুড়া শহরে অবস্থিত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যালয়ে নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রির ব্যবস্থা আছে।

ধলমোহনী গ্রামের নাহারা, সীমা, নুরুন্নাহার, আফরোজা ও নাসিমা জানান, আগে তাঁদের ঘরে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। আজ তাঁরা স্বাবলম্বী, সচ্ছল। সংসারের কাজের ফাঁকে সেলাইয়ের কাজ করেন।

বগুড়ার এই সূচিশিল্পীরা শুধু কাঁথা নকশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন। কাঁথার পাশাপাশি তাঁরা তৈরি করছেন শাড়ি, মানিব্যাগ, চাদর, কুশন, বিছানার চাদর, কম্পিউটার কভার, চশমার কভার, ছাতা, টেবিল ক্লথ, গ্লাস-প্লেট ম্যাট, মাফলারসহ আরো হরেক রকমের পণ্য।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা