kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭। ৪ মার্চ ২০২১। ১৯ রজব ১৪৪২

বাঁশ-বেতের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ‘তংছি মিঙ’

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাঁশ-বেতের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ‘তংছি মিঙ’

বান্দরবানে মং নু মারমার প্রতিষ্ঠান ‘তংছি মিঙ’-এ তৈরি নানা পণ্য

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঁশ-বেত সহজলভ্য হওয়ায় বাহারি রকমের হস্তশিল্প পণ্য পাওয়া যেত গ্রামে গ্রামে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে চলে যেত চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এখন সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। শহরের সুবিধা পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামে। এর ফলে দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে বাঁশ-বেত। আর ঘরে ঘরে হস্তশিল্প পণ্যের জায়গা দখল করে নিচ্ছে সস্তা প্লাস্টিকসামগ্রী।

ব্যবসা না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাঁশ ও বেতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী সব হস্তশিল্প পণ্য। কারিগররাও এই পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। বাঁশের চিকন চিকন কঞ্চি দিয়ে শৈল্পিক হাতের বুননে তৈরি চমৎকার থুরংয়ের বদলে ঘরে ঘরে স্থান করে নিয়েছে প্লাস্টিকের ঝুড়ি। কোমর তাঁতের পিনন বা চাদর কম্বলের জায়গা দখল করেছে কারখানায় উৎপাদিত বস্ত্রসামগ্রী।

এর পরও হস্তশিল্প পেশায় আশার আলো দেখছেন উদালবনিয়ার মং নু মারমা। বান্দরবান সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের এই গ্রামে ২০০৪ সালে ‘তংছি মিঙ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তিনি যে বাঁশ-বেত শিল্পভিত্তিক জীবিকায় নেমে পড়েন—এমন দুঃসময়েও হাল ছেড়ে দেননি। এখনো তিনি কয়েকজন সহকারী নিয়ে পণ্য তৈরি করে যাচ্ছেন। বাঁশ দিয়ে নৌকা, ছোট ছোট ঘর, কলমদানি, ফুলদানি, চায়ের কাপ, ট্রে, ছোট ছোট থুরং, ঝুড়ি, বিন, মোবাইল স্ট্যান্ড, ছবির ফ্রেম, ল্যাম্প শেডসহ আরো বেশ কয়েকটি পণ্য উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন।

বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি তাঁর হস্তশিল্প পণ্য যাচ্ছে সুনামগঞ্জেও। মং নু জানান, প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকার পণ্য পাইকারি দরে তিনি সুনামগঞ্জে পাঠাচ্ছেন। এই হিসাবে শুধু সুনামগঞ্জেই বছরে তাঁর বিক্রির পরিমাণ ছয় লাখ টাকার বেশি।

মং নু জানান, ‘সব মিলিয়ে বছরে ৩০-৩২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করা যাচ্ছে। এতে কর্মচারীদের বেতন, কাঁচামাল ক্রয় এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় মিটিয়ে বছরে তাঁর আয় চার লাখ টাকার কম নয়। তিনি বলেন, প্লাস্টিক পণ্যের এই সময়ে উন্নত ও রুচিশীল পণ্যের চাহিদা এখনো কম নয়।’

মং নু বলেন, ‘পুঁজির সমস্যা হস্তশিল্পকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। এ অবস্থায় টাকার অভাবে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ক্রয় করতে পারছি না আমরা।’ বিনা জামানতে স্বল্প সুদের ঋণ পেলে হস্তশিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।

বান্দরবান জেলা সদরের কাছের মারমা গ্রাম থোয়াইঙ্গ্যা পাড়া। একসময় বাঁশ-বেত দিয়ে গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন বেশ কয়েকজন। এখন মংসা চিং মারমা নামের একজন সময় বা অবসর পেলেই শখের বশে বাড়ির আঙ্গিনায় বসে তৈরি করে যাচ্ছেন বাঁশের থুরং, মাছ ধরার চাঁই বা ঠেলা জাল। বয়স এখন ৫৯। আর কদিন এসব কাজ করব জানি না। আমি মরে গেলে এই গ্রামে থুরং বানানোর আর কেউ থাকবে না, বললেন বৃদ্ধ মংসা চিং।

তিনি বলেন, বেত তো এখন নেই বললেই চলে। বাঁশ দিয়ে করা হস্তশিল্প বিক্রি করে এখন তাঁর একজনের পেট-ই চলে না। তাই জীবন বাঁচাতে প্রতিদিনই খুঁজতে হয় অন্য কাজ। তিনি বলেন, ‘এখন পেট চালানোর জন্য থুরং বানাই না। চার যুগের নেশা টিকিয়ে রাখতে শখের বশে দুই-তিন দিনে দু-একটা থুরং বানাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা