kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

সহায়ক পণ্য উৎপাদনে লাভে ফিরবে চিনিশিল্প

রোকন মাহমুদ   

১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সহায়ক পণ্য উৎপাদনে লাভে ফিরবে চিনিশিল্প

চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা ছবি : মঞ্জুরুল করীম

আখের খামারগুলোতে অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ, কম মূল্যে চিটাগুড় বিক্রি, চিনি বিক্রিতে অনিয়ম, কারখানার আধুনিকায়ন না হওয়া ও উচ্চ ফলনশীল আখের বীজ ব্যবহার না করাসহ নানা সমস্যায় চিনিশিল্প অনেক পিছিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর বড় অঙ্কের লোকসান দিয়ে আসছে। আর এ সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ার পেছনে দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব, অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেটই মূলত দায়ী।

চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা একান্ত স্বাক্ষাৎকারে কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন। তাঁর মতে, শুধু চিনি উৎপাদন করে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। চিনির সঙ্গে বাই প্রডাক্ট (সহায়ক পণ্য) তৈরি করে সেগুলো বাজারজাত করতে পারলে শিল্প খাতটি লাভে ফিরে আসবে। এ জন্য একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অধীনে এরই মধ্যে বিদেশি দুটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও তিনি জানান।

এ ছাড়া লোকসানি কৃষি খামারগুলোতে নিজেরা উৎপাদন না করে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তই বাস্তাবসম্মত বলে মনে করছেন তিনি। মনোযোগ দিতে হবে মিলের আধুনিকায়নেও। এসব উদ্যোগ চিনি তৈরি খরচ যেমন কমাবে তেমনি চিনির মান আরো ভালো করবে বলে জানান সদ্য নিযুক্ত এই চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ‘আমি বেশি দিন হয়নি করপোরেশনে এসেছি। এর মধ্যে যে কয়টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাতে আমাদের কয়েকটি খাতে বড় অঙ্কের মুনাফা হয়েছে। অথচ এসব খাতে আগে বড় অঙ্কের লোকসান হতো। এর মধ্যে অন্যতম হলো মোলাসেস বা চিটাগুড় বিক্রি। গত বছরও (২০১৯ সাল) চিটাগুড় বিক্রি করা হয়েছে প্রতিটন মাত্র ৯ হাজার ৯৮৩ টাকা দরে। ওই সময় উৎপাদন দেখানো হয়েছিল ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। সে হিসেবে করপোরেশনের আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অথচ মার্কেটে চিটাগুড় বিক্রি করা যায় প্রতি টন ১৭ হাজার টাকার ওপরে।’

তার প্রমাণ হলো, চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্তই আমরা ৫৮ হাজার টন চিটাগুড় বিক্রি করেছি। এসব বিক্রি হয়েছে প্রতিটন ১৭ হাজার ৭৩৪ টাকা দরে। সে হিসেবে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের এই খাতে আয় হয়েছে ১০২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ১২০ কোটি টাকা হবে বলে আশা করছি। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি।

তিনি বলেন, করপোরেশনের চারটি কৃষি খামার ও ১৪টি চিনিকলের অধীনে পরীক্ষামূলক খামারের আওতায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১৩ হাজার ৫৩৪ একর। এর মধ্যে সাড়ে ছয় হাজার একর জমিতে পালাক্রমে আখ চাষ করা হয়। এ ছাড়া পুকুর, ফলবাগান ইত্যাদিও রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আখ চাষ করে অনেক খামারেই লোকসান হচ্ছে। এই লোকসানের অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ, দক্ষ জনবলের অভাব, শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব। তাই লোকসান কমিয়ে পর্যায়ক্রমে লাভজনক করতে প্রায় তিন হাজার একর জমি (পুকুর ও ফলবাগানসহ) লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে এক হাজার ৫৯১ একর জমি এরই মধ্যে লিজ দেওয়া হয়েছে। এই খাত থেকে করপোরেশনের আয় হয়েছে দুই কোটি ৪৫ লাখ টাকা। আগের বছর (২০১৯-২০) লিজ দেওয়া হয়েছিল এক হাজার ৮১ একর জমি। তার থেকে আয় হয়েছিল এক কোটি ৪২ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পরীক্ষামূলক খামারের অধীন আরো ১৭৫ একর জমি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ট্রায়াল সম্পন্ন করার শর্তে লিজ দিয়ে ৩০ লাখ ৯১ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। লিজ দেওয়ার কারণে আমাদের শ্রমিক খরচও সাশ্রয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আরো সাত কোটি টাকার ওপরে শ্রমিক খরচ সাশ্রয় হয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে উৎপাদিত আখ কৃষকরা সাড়ে তিন টাকা কেজি বিক্রি করেও লাভবান হচ্ছেন। আমাদের প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ ছয় টাকা ৬৫ পয়সা।

আখের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় অনেক খামার বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। আখ বিক্রি থেকে উৎপাদন খরচ উঠছে না। যেমন রংপুর সুগারমিল চার বছর ধরে গড়ে দেড় কোটি টাকা লোকসান গুনছে। লোকসানে রয়েছে সেতাবগঞ্জ কারখানার খামারও।

এই লোকসানের অন্যতম কারণ সিন্ডিকেশন। একদিকে দক্ষ জনবলের অভাব অন্যদিকে অদক্ষ লোকের আধিক্য, অতিরিক্ত মজুরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি না আনা ইত্যাদি কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে।

দেশীয় চিনি প্রতিযোগিতায় বাজারে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমাদের চিনিই প্রকৃত চিনি। আখ থেকে হয়, এর ক্ষতিকর দিক নেই। অথচ বাজারের রিফাইন করা সাদা চিনিতে অনেক ক্ষতিকর উপাদন রয়েছে। সে জন্য সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা আমাদের চিনি পরীক্ষা করে কিনছে। তার পরও আমাদের চিনি লোকসানে রয়েছে। এর কারণ হলো, আমাদের প্রতি কেজি চিনি উৎপাদন করতে এখন খরচ পড়ে ৯৩ টাকা থেকে মিল ভেদে ১৮৬ টাকা পর্যন্ত। বিভিন্ন ব্যাংকে আমাদের সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। সে ঋণের সুদ উৎপাদন খরচের সঙ্গে যোগ করলে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে ১৩১ টাকা থেকে ৩১১ টাকা পর্যন্ত। বিপরীতে সরকার বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে মিল ভেদে ৫২ থেকে সাড়ে ৫৭ টাকা পর্যন্ত। আর ব্যক্তি খাতে সাদা চিনি আমদানি খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। রিফাইন করে তারা যে দামে বিক্রি করে তাতে বিক্রেতাদের লাভ থাকে বেশি। ফলে বিক্রেতারা সাদা চিনিই বেশি বিক্রি করে।’

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো আখের উৎপাদন খরচ বেশি। এ ছাড়া আমাদের উৎপাদিত আখগুলোর জাত ভালো না হওয়ায় চিনি পাওয়া যায় কম। উন্নত জাতের আখ চাষ করে বলে বিদেশে একই পরিমাণ জমিতে কম খরচে বেশি আখ পায় এবং তা থেকে চিনিও বেশি হয়।’

এখন প্রতি হেক্টর জমিতে আমাদের দেশীয় জাতের আখ উৎপাদন হয় ৮ থেকে ১৫ মেট্রিক টন। উচ্চ ফলনশীল আখ চাষ করে পাওয়া যায় হেক্টরপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টন। চিনি উৎপাদনেও তারতম্য রয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ১০০ টন আখ মাড়াই করে চিনি পাওয়া যায় ১২ টন। আর আমরা এখন পাচ্ছি ৫ থেকে ৬ টন।

এ ছাড়া কারখানার আধুনিকায়ন না হওয়াও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। কারখানায় এখন যে মেশিন ব্যবহার হচ্ছে তা ৪০ থেকে ৭০ বছরের পুরনো এবং ম্যানুয়াল। অথচ অনেক আধুনিক মেশিনপত্র বেরিয়েছে। অনেক দ্রুত কম জনবল দিয়ে উৎপাদন করা যায়। সেটা আমরা করতে পারিনি। আমাদের কোনো রিফাইনারি নেই। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও আন্তরিকতার অভাব ছিল।

এ ছাড়া নানা অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কথা আগেই বলেছি। বিভিন্নভাবে তদবিরের কারণে লোকসানের মধ্যেও লোকবল নিয়োগ হয়েছে এই শিল্পে, যা লোকসানকে আরো বাড়িয়েছে।

সিন্ডিকেট করে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিভিন্ন মার্কেটে করপোরেশনের নিজস্ব খরচে ও পরিবহনে প্যাকেটজাত চিনি পৌঁছে দিয়ে বিক্রি করা হতো। অথচ আমাদের চিনির যে চাহিদা তাতে এমনিতেই বিক্রি হওয়ার কথা।

এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। এখন বিক্রেতারা নিজ উদ্যোগে রাজধানীর চিনি শিল্প ভবনের বেইসমেন্ট থেকে চাহিদামতো নিজস্ব পরিবহনে ও খরচে কিনছে। এতে মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে করপোরেশনের।

দেশে আমাদের প্রতিবছর চিনির চাহিদা রয়েছে ১৮ লাখ মেট্রিক টন। আমাদের উৎপাদন এখন ৮০ হাজার টন। বাকিটা আমদানি করে মেটাতে হচ্ছে। আমাদের উৎপাদন বাড়লেও পুরো চাহিদার খুব বেশি নিজস্ব উৎপাদন দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। আর শুধু চিনি উৎপাদন করে করপোরেশনকে লাভে ফেরানো সম্ভব নয়। কারণ চিনি মিলগুলোতে চিনি তৈরি হয় এক থেকে দুই মাস। বাকি সময়টা খালি থাকে। কর্মকর্তাদের বেতন দিতে হয় বসিয়ে বসিয়ে। এসব খরচ উৎপাদনের সঙ্গে যোগ হয়।

আমরা যদি চিনির সঙ্গে অন্য পণ্য তৈরি করতে পারি তবেই কেবল লাভজনক হতে পারে। এখন যেটা কেরু অ্যান্ড কোং করছে। তারা চিনির সঙ্গে ভিনেগার, জৈবসার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, অ্যালকোহল, স্প্রিট ইত্যাদি তৈরি করছে। এতে চিনিতে লোকসান হলেও অন্যগুলো দিয়ে ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কম্পানি তৈরি করে তার অধীনে বিভিন্ন বাই প্রডাক্ট তৈরি করতে হবে।

এরই মধ্যে এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ড ও জাপানের দুটি বিদেশি কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। তারা এই খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এর একটি হলো থাই রিফাইনারি জায়ান্ট সুটেক ইঞ্জিনিয়ারিং ও শরকরা ইন্টারন্যাশনাল। অন্যটি হলো জাপানের সিজিথ মেশিনারি করপোরেশন। তারা গত অক্টোবর থেকে আমাদের তিনটি বৃহৎ চিনি মিলের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) শুরু করেছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আমরা তাদের কাছ থেকে বড় বিনিয়োগ পাব। এর মাধ্যমে তারা হাই ভ্যালু প্রডাক্ট যেমন ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ, চিটাগুড় থেকে অ্যালকোহল, ভিনেগার ইত্যাদি তৈরি করবে, যা সরাসরি রপ্তানি হবে বিভিন্ন দেশে। সেভাবেই আমরা আগাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা লাগবে। চিনি মিল বন্ধ করা, যা ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন হবে না।

আমরা করপোরেশনের অবকাঠামোগুলো উদ্ধারেও মনোযোগ দিয়েছি। এসব অবকাঠামো থেকে ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। সম্প্রতি আমরা রাজধানীর ইমামগঞ্জে শেখ মোজতবা নামের চারতলা একটি ভবন দখলমুক্ত করেছি। চার বছর ধরে একটা গ্রুপ ভবনটি দখল করে রেখেছে। তাদের সঙ্গে মাত্র ১২ টাকা স্কয়ার ফিট হিসেবে ভাড়ার চুক্তি হয়েছে। অথচ এখানকার ভাড়া আরো অনেক বেশি। ফলে চুক্তি শেষ হওয়ার পর আমরা তাদের না দিতে চাইলে তারা আদালতে যায়। কিন্তু আদালত তাদের আরজি খারিজ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের ভবন দখলমুক্ত করেছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা