kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

সড়ক চাঁদাবাজির মাসুল ভোক্তার ঘাড়ে

সজীব আহমেদ   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সড়ক চাঁদাবাজির মাসুল ভোক্তার ঘাড়ে

দেশে সবজির বড় উৎস যশোর, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, পঞ্চগড় ও কুষ্টিয়া। এসব এলাকার আড়ত থেকে সবজি নিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ঢাকায় আসেন

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক কেজি পেঁপে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যশোর ও রাজশাহীর কৃষক সেই পেঁপে স্থানীয় হাটে বিক্রি করেছেন মাত্র ১২ থেকে ১৮ টাকা। দেশে সবজির বড় উৎস যশোর, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, পঞ্চগড় ও কুষ্টিয়া। এসব এলাকার আড়ত থেকে সবজি নিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসতে আসতেই সব ধরনের সবজির দর বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর বড় কারণ অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও পথে পথে চাঁদাবাজি।

দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন সবজি ও কৃষিজ পণ্যবাহী কয়েক হাজার ট্রাক আসছে রাজধানীতে। এসব ট্রাক রাস্তায় নানা ধরনের চাঁদা দিয়ে, যানজট ও ফেরিঘাটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে রাজধানীর বাজারে আসে। রাজধানীতে আসতে সময়ও লেগে যায় প্রায় এক দিন। এতে নষ্ট হচ্ছে পণ্য, বাড়ছে পণ্য পরিবহন খরচ।

যশোর জেলায় সারা বছর সবজির আবাদ হয়ে থাকে। দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজির বাজার যশোরের বারীনগর। ওই অঞ্চলের পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘এবার বন্যার কারণে প্রায় সারা দেশেই সবজির উৎপাদন কম। তাই কৃষকের কাছ থেকেই বেশি দামে ক্রয় করতে হচ্ছে। এদিকে ঢাকায় নিয়ে যেতে কাঁচামাল পরিবহন খরচও বেশি এবং সেই সঙ্গে মহাসড়কের নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে পুলিশ থামালে বেশির ভাগ চালকই কোনো কথা না বলে টাকা বের করে দেন। বিভিন্ন পৌরসভা ও সংগঠনকেও চাঁদা দিতে হয়। ঝামেলা এড়াতে চালকরা চাহিদামতো টাকা দিয়ে দেন। এই টাকা ভাড়া হিসেবে ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই নিয়ে নেন চালকরা।’

যশোরের ট্রাকচালক রবিউল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যশোরের বারীনগর বাজার থেকে ঢাকায় আসতে পাঁচ থেকে ছয় জায়গায় আমাদের চাঁদা দিতে হয়। আরিচা ফেরিঘাটে ছোট ট্রাকভাড়া মেমোতে (রসিদ) ৬৬০ টাকা লেখা থাকলেও আমাদের দিতে হয় এক হাজার ১০০ টাকা। বিভিন্ন স্থানে টাকা না দিলে নানা অজুহাতে ট্রাক আটকায়, হয়রানি করে।’

বগুড়ার কয়েকজন পাইকারি সবজির ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভরা মৌসুমে বগুড়ার মহাস্থান হাটসহ কয়েকটি আড়ত থেকে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক সবজি নিয়ে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এখন আগের চেয়ে ট্রাকের ভাড়াও বেড়েছে। সেই সঙ্গে পথে পথে দিতে হচ্ছে চাঁদা। এতে সব মিলিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে প্রতি কেজি সবজিতে খরচ পড়ে যায় কেনা দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।’

তবে রাজশাহীর ট্রাকচালকরা বলেন, ‘করোনার কারণে বিভিন্ন পক্ষের চাঁদাবাজি কিছুটা কমেছে। তার পরও ঝামেলা এড়াতে কোনো সংকেত দেখলেই টাকা দিয়ে দিই।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশে কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সড়কনির্ভরতার হার ৯৭ শতাংশেরও বেশি। দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে সাত কোটি টন শস্য উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের পণ্য বিপণনের মাত্রাও বাড়ছে। কৃষিজ এসব পণ্য বিপণনে প্রয়োজন হচ্ছে পরিবহনের, যার প্রায় পুরোটাই হচ্ছে সড়কপথে।

গত সোমবার যশোরের বারীনগর, বগুড়ারার মহাস্থান হাট ও রাজশাহীর দুর্গাপুর আমগাছি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকপর্যায়ে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি বেগুন ৩৫-৪০ টাকা, মুলা ২০-২৫ টাকা, শিম ৫০-৭০ টাকা, পেঁপে ১২-২০ টাকা, কাঁকরোল ২৫-৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০-১৫০ টাকা।

অন্যদিকে গত মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ২০০-২৪০ টাকা, বেগুন প্রতি কেজি ৮০, মুলা ৫০, পেঁপে ৪০-৪৫, কাঁকরোল ৬০-৭০ ও শিম ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

যশোরের বারীনগর, বগুড়ার মহাস্থান হাট ও রাজশাহীর দুর্গাপুর আমগাছি বাজারের সঙ্গে রাজধানীর বাজারের সবজির দামের বিশাল এই পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের কাঁচামাল আড়তদার ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচামাল পচনশীল পণ্য হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়। এ কারণে পরিবহন খরচ বেশি লাগে। সেই সঙ্গে ট্রাকে বেপরোয়া চাঁদাবাজিও হয়। ফলে এ খরচগুলো সব কাঁচামালের ওপর গিয়ে পড়ে। এ কারণে রাজধানীতে আসতে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান ট্রাক পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মকবুল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাসড়ক দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে এলেও প্রায় প্রতিটি পৌরসভার টোল আদায়ের নামে ট্রাক ড্রাইভারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে। পৌরসভা থেকে কোনো ধরনের মালামাল ওঠানো বা নামানো না হলেও তাদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বেশ কয়েক জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। এসব কারণেই পাইকারি ব্যবসায়ীদের বেশি দামে সবজি বিক্রি করতে হয়। যেসব গাড়ির রুট পারমিট কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকে না, চাঁদাবাজি হয় সেগুলোতেই বেশি। মালিক-চালকরা যদি সরকারের সব নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে গাড়ি চালান, তাহলে এ ঝামেলা অনেকটাই কমে আসবে।’

বাংলাদেশ ট্রাক কার্ভাড ভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশসহ অন্যদের চাঁদাবাজি এখন আগের চেয়ে কমছে। কিন্তু একেবারে যে কমেছে তা ঠিক না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা