kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

চড়া দাম গুনছে ভোক্তা, ঠকছে কৃষক

মধ্যস্বত্বভোগীর হাতেই সবজির দাম তিন গুণ

রোকন মাহমুদ   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মধ্যস্বত্বভোগীর হাতেই সবজির দাম তিন গুণ

নানা অজুহাতে রাজধানীসহ দেশের খুচরা বাজারগুলোতে এখন সবজির আকাশছোঁয়া দাম। বন্যা, বৃষ্টি, পরিবহন সংকট, উৎপাদন ঘাটতিসহ নানা অজুহাতে রেকর্ড দামে বিক্রি করছেন শিম, আলু, টমেটো, পটোল, লাউ, কাঁচা মরিচসহ প্রায় সব ধরনের শাক-সবজি। অথচ বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য বলছে, দাম যতটা বেড়েছে, ভোক্তা ও কৃষক পর্যায়ে ততটা বাড়েনি। আর মূল্যবৃদ্ধির পরও কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে দামের ব্যবধান দুই থেকে তিন গুণ।

কৃষক এসব সবজি বিক্রি করার পর ভোক্তার ব্যাগে ওঠার আগেই ব্যাপারী, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীসহ চার থেকে পাঁচ স্তরের মধ্যস্বত্বভোগীরাই এই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে ভোক্তা বেশি দামে কিনলেও মাঠের কৃষক পাচ্ছেন তিন ভাগের এক ভাগ। মাঠে ঠকছেন কৃষক আর বাজারে ঠকছেন ভোক্তা। ভ্যালু চেইন ও বাজার পর্যায়ে সঠিক মনিটরিং না থাকা, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং উৎপাদন-সরবরাহে সমন্বয় না থাকায় বাজারে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ জন্য তাঁরা মৌসুমভিত্তিক চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফা রুখতে প্রয়োজনীয় মনিটর করার কথাও বলছেন।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন-যশোর, রংপুর, কুষ্টিয়ায় কৃষক পর্যায়ে শীতের আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি, কিন্তু রাজধানীর সেগুনবাগিচা, মালিবাগসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে ক্রেতাকে কিনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি। অর্থাৎ দাম প্রায় তিন গুণ বেশি। কুষ্টিয়ায় কৃষক বেগুন বিক্রি করছেন ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি, যশোরে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। রাজধানীর খুচরা বাজারে মান ভেদে বেগুন ৮০ থেকে ১৩০ টাকা। বেগুনের দামও বৃদ্ধি করছে তিন গুণের বেশি।

কুষ্টিয়ার বাজারে শসা ২৫ থেকে ২৮ টাকা, রংপুরে ২০ টাকা কেজি, রাজধানীর খুচরা বাজারে শসা ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। যশোরের বাজারে কৃষক পর্যায়ে পটোল বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, রাজধানীর খুচরা বাজারে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি। মুলা কৃষক পর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা আর খুচরা বাজারে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, অর্থাৎ দাম প্রায় দ্বিগুণ। ৩০ টাকার কাঁকরোল রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। এই মূল্যবৃদ্ধির অনেকটাই হয় খুচরা পর্যায়ে। আলু হিমাগারগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি। রাজধানীর বাজারগুলোতে তা ৫০ টাকা কেজি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবজির দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ে খুচরা পর্যায়ে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বৃহস্পতিবার দেশের পাইকারি বাজারগুলোতে গড়ে আলু বিক্রি হয়েছে ২৯ থেকে ৩০ টাকা কেজি। সে হিসাবে খুচরা বাজারে যৌক্তিক দাম ৩৮ থেকে ৪৪ টাকা কেজি। কিন্তু যৌক্তিক লাভের পরও দাম বেশি রাখছে কেজিতে পাঁচ টাকা পর্যন্ত।

একইভাবে পাইকারি বাজারে বেগুন বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। সে হিসাবে খুচরায় যৌক্তিক দাম ৫০ থেকে ৬৯ টাকা কেজি। কিন্তু বাস্তবে লাভের পরও বেশি রয়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা প্রতি কেজিতে। বৃহস্পতিবার পাইকারি বাজারে শসা বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি। সে হিসাবে খুচরায় যৌক্তিক দাম ৩৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি। বাস্তবে খুচরায় দাম বেশি রাখছে ২২ থেকে ৩০ টাকা প্রতি কেজিতে। শুধু এই পণ্যগুলোতেই নয়, প্রতিটি পণ্যের দামই এভাবে হাতবদলে যৌক্তিক দামের চেয়ে বেশি রাখছে কমপক্ষে ১০ টাকা, আর ঊর্ধ্বসীমা নেই।

মুগদা বাজারের সবজির খুচরা বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, খুচরায় দাম বাড়ার কারণ হলো সবজি নষ্ট হওয়ায়। পাইকারি পর্যায়ে সবজি দিনের দিন বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু খুচরায় প্রতিদিনের সবজি প্রতিদিন বিক্রি করা যায় না। এতে অনেক সবজি পচে যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে গত ২০১৯-২০ মৌসুমে আলুসহ মোট এক কোটি ৭২ লাখ টন সবজি উৎপাদন হয়েছে। আগের বছরও প্রায় কাছাকাছি ছিল। দেশে প্রতিদিন প্রতিজনের চাহিদা রয়েছে ২২০ গ্রাম সবজির। সে হিসাবে দেশে প্রতিবছর এক কোটি ৫২ লাখ টনের বেশি সবজির চাহিদা রয়েছে। সে হিসাবে দেশে সবজি উদ্বৃত্ত।

তার পরও বর্ষা মৌসুমে সবজির দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড এলায়েড ফুড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে মৌসুমভিত্তিক চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য নেই। তাই বর্ষা মৌসুমে ঘাটতি পূরণের কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারেনি। তবে এবার দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ও অতিবৃষ্টিই সবজির উৎপাদন অনেকটা কম। আর এই সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা করছেন।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (গবেষণা) দেওয়ান আশরাফুল হোসেন বলেন, ‘আমরা কৃষিজাত পণ্যের কৃষক পর্যায়ে দাম সংগ্রহ করে খুচরা পর্যায়ে তার যৌক্তিক দাম কত হতে পারে সেটা নির্ধারণ করে দিই। এটা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রয়োজনীয় মার্জিন যোগ করেই করা হয়। কিন্তু তার পরও তাঁরা বেশি দামে বিক্রি করেন।’

বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তলিয়ে গেছে সবজিক্ষেত। এর মধ্যেও সবজি উৎপাদনের চেষ্টা থেমে নেই। বগুড়ার শাজাহানপুরের রাধানগর থেকে তোলা।    ছবি : কালের কণ্ঠ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা