kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

গাড়ি সংযোজন থেকে প্রস্তুতকারক

খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি শুরু করেছে পিএইচপি

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি শুরু করেছে পিএইচপি

২০১৭ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিন মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটন হোল্ডিংসের ১৩৩২ সিসির ‘প্রোটন সাগা’ গাড়ি সংযোজনের মাধ্যমে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গাড়ি সংযোজন শুরু করে ‘পিএইচপি অটোমোবাইল’। গাড়ি নির্মাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিল সে লক্ষ্যে বর্তমানে কিছু কিছু খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি হচ্ছে চট্টগ্রামভিত্তিক দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ পিএইচপি ফ্যামিলির এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কারখানায়।

সে স্বপ্নকে প্রসারিত করে অচিরেই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে গাড়ি রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে পিএইচপি অটোমোবাইল। সে লক্ষ্যেই সড়ক পথে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারত হয়ে নেপালে প্রোটন সাগা রপ্তানির ব্যাপারে বেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সব কিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে বাংলাদেশে সংযোজনকৃত গাড়ি প্রথমবারের মতো বিদেশে রপ্তানি হবে পিএইচপি অটোমোবাইলের হাত ধরে।

‘আমাদের রাস্তায় আমাদের গাড়ি, থাকবে সবার বাড়ি বাড়ি’ স্বপ্ন নিয়ে সেডান কার সংযোজনের যাত্রা শুরু করেছিল তারা। গাড়ি সংযোজনে চট্টগ্রাম নগরীর সাগরিকা এলাকায় প্রায় সাড়ে চার লাখ বর্গফুটের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারসহ ২৫৬ জন কারিগরি দক্ষ লোকের নিরন্তর চেষ্টায় সংযোজিত হচ্ছে প্রোটন ব্র্যান্ডের গাড়ি। আট হাজার ৩৩২টি পার্টস সংযোজিত করে তৈরি হয় একেকটি প্রোটন গাড়ি। বর্তমানে এই কারখানায় প্রোটন সাগা, প্রোটন প্রিভে এবং প্রোটন এক্স ৭০ এবং প্রোটন পার্সোনা এই চার মডেলের গাড়ি সংযোজন করা হচ্ছে।

পিএইচপি সূত্র জানায়, বর্তমানে কারখানায় বছরে ১২ শ ইউনিট গাড়ি সংযোজন করছে। সক্ষমতা রয়েছে তিন হাজার ৬০০ গাড়ি সংযোজনের। শুধু গাড়ি সংযোজন নয়, রং করা থেকে শুরু করে খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনেও দক্ষতা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে অ্যাসেম্বলি হুড সাপোর্ট, প্যানেল ব্যাটারি ট্রে, ব্যাটারি হোল্ডার, এল বোল্ট ব্যাটারি, ব্রাকেট লাম্বডা সেন্সর রিয়ার, ব্রাকেট অ্যাসেম্বলি কনডেনসর ট্যাংক, ব্রাকেট ইঞ্জিন কভার, ব্রাকেট এয়ার বক্স, হোস ক্ল্যাম্প, ফুয়েল ট্যাংক কভারসহ ২৫ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ পিএইচপি অটোমোবাইলের কারখানায় তৈরি হচ্ছে। আর গাড়ি রং করার ব্যাপারটি পুরোপুরি চট্টগ্রামের কারখানায় হচ্ছে। ফলে ক্রেতা নিজের পছন্দের কালারের গাড়ি অর্ডার করতে পারবেন এখানে। মাত্র তিন বছরের যাত্রায় অগ্রগতি খুব কম নয়।

১৯৮৩ সালে সরকারি উদ্যোগে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিত্সুবিশি মোটরস করপোরেশনের (এমএমসি) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মালয়েশিয়া প্রোটন গাড়ির কারখানা স্থাপন করে। ২০০০ সালে এসে মালয়েশিয়া বিশ্বের ১১তম দেশ হিসেবে নিজেদের প্রকৌশলীদের উদ্ভাবিত এবং নিজস্ব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে গাড়ি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫টি দেশে প্রোটনের গাড়ি রপ্তানি হচ্ছে। পিএইচপিও গাড়ি সংযোজন শুরু করেছে ভবিষ্যতে নিজস্ব গাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে। সে লক্ষ্যেই সংযোজন শুরুর তিন বছরের মাথায় বর্তমানে ২৫টি খুচরা যন্ত্রাংশ নিজেরাই তৈরি করছে। যদিও প্রোটনের প্রিভি মডেলের একটি গাড়ি ছোট-বড় আট হাজার ৩৩২টি খুচরা যন্ত্রাংশের মিলিত রূপ। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে ৩০০টি খুচরা যন্ত্রাংশ পিএইচপি অটোমোবাইলের কারখানায় তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

পিএইচপি ফ্যামিলি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালে প্রায় ২১ হাজার ইউনিট ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রি হয়েছে বাংলাদেশে। এর ৯০ শতাংশ গাড়ি পুরনো। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি করে এই চাহিদার জোগান দেওয়া হয়। পুরনো গাড়ি আমদানি খাতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। পুরনো গাড়ির বাজারে আধিপত্য রয়েছে জাপানের টয়োটা কম্পানির। প্রোটন বাজারজাতে খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এরই মধ্যে পিভিএস বা পারফেক্ট ভেহিকলস সলিউশনস নামের একটি মোবাইল অ্যাপস চালু করেছে পিএইচপি অটোমোবাইলস। যেখানে প্রয়োজনীয় সব পার্টসের ছবি ও মূল্য লেখা রয়েছে। ক্রেতা ইচ্ছা করলে বিকাশ অ্যাপসের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। আবার ক্যাশ অন ডেলিভারি সিস্টেমে হাতে পার্টস পাওয়ার পরও মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। ক্রেতা যে গ্যারেজে বলবে, সেখানেই পার্টস পৌঁছে দেবে কাস্টমার কেয়ার টিম। কোনো পার্টস তাৎক্ষণিকভাবে না থাকলে তা বিদেশ থেকে এনে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে জানালেন পিএইচপি অটোমোবাইলের কর্মকর্তারা।

গাড়ির বিক্রয়োত্তর সেবায়ও নিয়ে এসেছে নতুনত্ব। রিপ্লেসমেন্ট কার পলিসির আওতায় তিন বছরের ওয়ারেন্টি সময়ের মধ্যে যেকোনো কারণে কোনো গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই একই মডেলের একটি গাড়ি সংশ্লিষ্ট ক্রেতাকে পৌঁছে দেওয়া হবে। মেরামতের সময়কালে গ্রাহক সেই গাড়িটি সম্পূর্ণ ফ্রিতে ব্যবহার করতে পারবেন। ইউরোপ, আমেরিকাতে এ ধরনের সেবা চালু থাকলেও বাংলাদেশে একমাত্র পিএইচপি অটোমোবাইল এই অফার দিচ্ছে। এ ছাড়া কোনো গাড়ির রং চটে গেলে বা নষ্ট হলে তা নতুনের মতো করে ঠিক করে দেওয়া হবে।

জানা যায়, জনপ্রিয় মডেল ১৩৩২ সিসির সেডান কার প্রোটন সাগা আমদানি করে বিক্রি হয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। সেই গাড়ি দেশে সংযোজন করে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ১৪ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকায়। দেশে সংযোজনের কারণে প্রতি গাড়িতে সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির চেয়ে ব্র্যান্ড নিউ এই গাড়ি অনেক সস্তা। এ ছাড়া ১৫৫৭ সিসির প্রোটন পারসোনা ২৩ লাখ টাকা, একই সিসির প্রোটন প্রিভি ২৫ লাখ টাকা, প্রোটন এক্স৭০ টকিং কার ৪১ লাখ ৯৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং পিএইচপি শিনারি এক্স৩০ মাইক্রোবাস সাড়ে ১৩ লাখ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা