kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে নিজেদের তৈরি নতুন গাড়ি উপহার দেব

আবদুল মাতলুব আহমাদ চেয়ারম্যান, নিটল-নিলয় গ্রুপ

এম সায়েম টিপু   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে নিজেদের তৈরি নতুন গাড়ি উপহার দেব

স্বাধীনতার পর যখন কোনো অবকাঠামো ছিল না; তখন কিছু বাস-ট্রাক অনুদান হিসেবে দেশে আসে। সেই থেকে দেশে অটোমোবাইলের যাত্রা শুরু। এরপর ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে জাপান থেকে কিছু রিকন্ডিশন্ড (ব্যবহৃত) গাড়ি আসা শুরু হয়। পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য ওই সময় বাস ও ট্রাকও আসে। নব্বই সালের পর বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে দেশের কারখানায় সংযোজন (অ্যাসেম্বলিং) শুরু হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অটোমোবাইল শিল্প।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন দেশের অটোমোবাইল খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা আবদুল মাতলুব আহমাদ।

দেশের বাণিজ্যিক পরিবহনের বাজারে ৪০ শতাংশের বেশি অংশীদার নিটল-নিলয়ের। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, পিকআপ এসব পরিবহন বাজারজাত করে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয়ভাবে সংযোজন ও সম্পূর্ণ তৈরি করা পরিবহন আমদানি করে বাজারজাত করে এই প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ব্যক্তি গাড়ি (প্রাইভেট কার) তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মাতলুব আহমাদ। তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পরিপূর্ণ গাড়ি তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ।’

মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি আগামী স্বাধীনতা দিবসের আগেই নিজেদের তৈরি নতুন গাড়ি উপহার দেবে নিটল-টাটা গ্রুপ। এর ফলে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকায় গাড়ি কেনার আতঙ্ক থেকে বের করে এনে আমরা ওই গাড়ি দেব ১০ লাখ টাকার কমে।’

তিনি বলেন, দেশের অটোমোবাইলের বাজারে ১৫ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক গাড়ির বাজারের অংশীদার তাঁর প্রতিষ্ঠানের। অন্য অংশীদারসহ প্রায় ৩০ হাজার গাড়ির বাজার আছে দেশে। তবে কয়েক বছর ধরে বাড়ছে না বাজার। স্থবির হয়ে আছে প্রবৃদ্ধি। শুধু পিকআপ গাড়ির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে।

গাড়িশিল্পে বাংলাদেশ সবসময় আমদানিনির্ভর ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বলা যায় এখনো প্রায় শতভাগ গাড়ি আমদানি হচ্ছে। আগে বেশির ভাগ ছিল ব্যবহৃত গাড়ি, যা জাপান থেকে আমদানি করা হতো। ৩০ বছর আগে আশির দশকে এটা প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। তবে নতুন গাড়ির সংখ্যা এখন বেড়েছে। এটা প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। পুরনো গাড়ির বাজার এখনো প্রায় ৯০ শতাংশ।

দেশে নতুন গাড়ির বাজার কেন তৈরি হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার ও দেশের মানুষ চায় দেশে নতুন গাড়ি তৈরি হোক। তবে এর প্রধান বাধা দাম অনেক বেশি। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে দুই থেকে তিন লাখ টাকায় নতুন গাড়ি পাওয়া যায়। পুরনো গাড়ি কিনতেই ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা লাগে আমাদের।’

স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে গাড়ির দাম কমে আসবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘এটা আমাদের মোটরসাইকেল শিল্পে প্রমাণিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করায় তিন লাখ টাকার মোটরসাইকেল দেড় লাখ টাকায় নেমে এসেছে। তার মানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হওয়ার ফলে এটার দাম কমে এসেছে।’

প্রাইভেট কারে হচ্ছে না কেন—এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমরা আমদানিনির্ভর ছিলাম। গাড়িশিল্পে মনোযোগ দেব এমন পরিবেশ ছিল না। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে ন্যূনতম ৫০ হাজারের বেশি গাড়ি উৎপাদন করা না গেলে গাড়িশিল্প দাঁড়াতে পারে না।’

বাংলাদেশ চায় নিজেরাই গাড়ি বানাবে। তাই ২০২০ সালকে সরকার হালকা প্রকৌশল শিল্পকে অগ্রাধিকার খাত ঘোষণা করেছে। হালকা প্রকৌশল খাতের প্রধান কাজ হলো অটোমোবাইল খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। এ ছাড়া নীতিমালা তৈরি করছে সরকার। এ জন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটি হয়েছে। এ সবই করা হচ্ছে দেশে গাড়িশিল্প তৈরির পরিবেশ।

একই সঙ্গে ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ি উপকরণ উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পরই আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরি করবে। এই গাড়ি হবে পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গাড়িশিল্পে সুন্দর আগামী হবে এই ইলেকট্রিক গাড়ি। তাই আমাদের রপ্তানির পরিকল্পনা নিয়ে গাড়ি উৎপাদনে যেতে হবে।’

গাড়িকে সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করতে এরই মধ্যে কাজ হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে। এতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ জন্য স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করা এবং আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা হবে। গাড়ির কম্পোনেন্ট ও ভেহিকল রপ্তানিকে উৎসাহিত করা হবে। এই তিনটি বিষয়ে সরকার সহযোগিতা করলে এ খাতে বিপুল বিনিয়োগ আসবে।

আপনি কি মনে করেন গাড়ির বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বাড়াতে গাড়ি আমদানি করা বন্ধ করে দেওয়া উচিত— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘না’। এটাকে নিরুৎসাহিত করা হবে। কিন্তু বাধা দেওয়া যাবে না। তবে মনে রাখতে হবে নিজম্ব উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করা না গেলে স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠবে না। আর এটা হবে পুশ ইন পুশ আউট।

নতুন শিল্প তৈরিতে সংযোগ শিল্প বড় ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটাও একটা পরিকল্পনার বিষয়, আগে গাড়ি না এর যন্ত্রাংশ। আর কে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে। এ জন্য সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ জন্য দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুধীসমাজ কাজ করতে পারে।

দেশের অটোমোবাইল খাতে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে উল্লেখ করে মাতলুব আহমাদ বলেন, নিটল টাটা গ্রুপের টাটা ও হিরো মিলে এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া নাভানা, উত্তরা, রানার গ্রুপেরও বিপুল বিনিয়োগ আছে অ্যাসেম্বলিং এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। কম্পোনেন্ট মিলে এ খাতে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। কর্মসংস্থানের কথা বলতে তিনি জানান, কম্পোনেন্ট মিলে তিন লাখের বেশি। আর গাড়িশিল্পে ২০ হাজার লোক কাজ করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা