kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

গাড়ি সংযোজনেই প্রগতির ৫৪ বছর পার

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গাড়ি সংযোজনেই প্রগতির ৫৪ বছর পার

মালয়েশিয়া ১৯৬৭ সালে সুইডেনের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভলভোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রথমবারের মতো গাড়ি সংযোজন শুরু করে। পরবর্তী তিন বছরে সে দেশের সরকার ছয়টি অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট স্থাপনের অনুমতি দেয়। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সংযোজিত গাড়িতে ৫ শতাংশের কম স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবহার হতো। সরকারি নীতির কারণে পরবর্তী ১০ বছরে স্থানীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। আর ১৯৮৩ সালে সরকারি উদ্যোগে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিত্সুবিশি মোটরস করপোরেশনের (এমএমসি) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রোটন গাড়ির কারখানা স্থাপন করার ১৭ বছরের মধ্যে ২০০০ সালে মালয়েশিয়া বিশ্বের ১১তম দেশ হিসেবে নিজেদের প্রকৌশলীদের উদ্ভাবিত গাড়ি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫টি দেশে প্রোটনের গাড়ি রপ্তানি হচ্ছে।

অথচ আরো এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জেনারেল মোটরসের কারিগরি সহায়তায় ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যক্তি মালিকানায় ‘গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭২ সালে ‘প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নাম ধারণ করে। নামিদামি গাড়ি সংযোজন করে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতিষ্ঠানটি প্রোটনের মতো গাড়ি নির্মাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি গত ৫৪ বছরেও। অথচ এই সময়ে ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড, জেনারেল মোটরস, জাপানের ইসুজু, নিশান ও মিত্সুবিশি, ভারতের হিন্দুস্তান টাটা, অশোক লেল্যান্ড, মারুতি, মাহিন্দ্রা, চীনের আওলাস, ফোডে, কোরিয়ার কোরান্ডোর মতো নামিদামি অটোমোবাইল কম্পানির গাড়ি দেশে বিযুক্ত (সিকেডি) অবস্থায় এনে সংযোজন করে বিক্রি করেছে।

কথিত আছে, প্রগতির কারখানায় সংযোজিত সে সময়কার বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় জেনারেল মোটরসের ভক্সল ভিভা মডেলের প্রাইভেট কার উপহার হিসেবে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অথচ প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছর পরে এসেও বহু সম্ভাবনার প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিআইএল) গাড়ি সংযোজনেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে।

প্রগতির সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত গাড়ি নিয়ে সরকারি নীতিমালা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় গাড়ি উৎপাদনের পথে হাঁটতে পারেনি প্রগতি। ফলে গাড়ি সংযোজনে ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়নি। এ সময় ব্যাবসায়িকভাবে টিকে থাকাটাই ছিল মুখ্য। তাই মাঝেমধ্যে প্রাইভেট কার সংযোজন কিংবা নির্মাতা হিসেবে আবির্ভাবের পরিকল্পনা উঁকি দিলেও সংগত কারণে উদ্যোগেই থমকে গেছে।

২০১০ সালের দিকে প্রগতির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী জহির উদ্দিন চৌধুরী ‘ন্যাশনাল কার’ প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই উদ্যোগটি কিছুদূর এগোনোর পর থমকে যায়। কারণ জানতে চাইলে সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ন্যাশনাল কার সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়ার পর আমরা যাচাই করে দেখলাম জাপান কিংবা ইউরোপের কোনো নামি ব্র্যান্ডের প্রাইভেট কার সংযোজন করলে দাম বেশি পড়বে। সে ক্ষেত্রে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় টিকতে কষ্ট হবে। আবার চীন, ভারতের গাড়ির গুণগত মানে ক্রেতাদের আস্থা কম। এ কারণে আমরা কোরিয়ান ব্র্যান্ডের গাড়িকে বেছে নিলাম। এ নিয়ে ঢাকায় কোরিয়ান দূতাবাসে কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি (কোটরা) প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে মিটিং করি। শুরুতেই তাঁরা জানতে চায় গাড়ি সংযোজন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালা কী? এই এক প্রশ্নেই আলোচনা আর বেশিদূর এগোয়নি।’

তিনি বলেন, গাড়ি নির্মাতা হওয়ার প্রধানতম শর্ত হলো নীতিমালা প্রণয়ন। কিন্তু দুঃখজনক হলো এরপর ১০ বছর পেরলেও ‘কার পলিসি’ প্রণয়ন হয়নি।

২০১৫ সালে ‘পিপলস কার’ নামে দেশে কার সংযোজনের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে প্রগতিকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। তখন প্রগতির কর্মকর্তারা মিত্সুবিশি মোটরসের সঙ্গে কথা বলে তাদের কাছ থেকে একটি স্পেসিফিকেশন নিয়ে এসেছিল। মিত্সুবিশির ২০১৩ মডেলের ১২০০ সিসির ‘এটরেজ’ সেডান কারটি নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছিল প্রগতি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের কারণে সে উদ্যোগটিও ভেস্তে যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে আমদানি শুল্ক কমানোর জন্য দেনদরবার করেও কোনো লাভ হয়নি।

তবে আশার কথা হলো প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছর পরে এসে সম্প্রতি নতুন অ্যাসেম্বল প্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রগতি। বছর তিনেক আগে ডাবল কেবিন পিকআপ সংযোজনের জন্য যোগাযোগ হয় বিশ্বখ্যাত টয়োটা মোটরসের সঙ্গে। টয়োটার কর্মকর্তারা আগ্রহ নিয়ে এসে মান্ধাতা আমলের কারখানা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যায়। এই বাস্তবতায় ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন অত্যাধুনিক অ্যাসেম্বলিং কারখানা স্থাপনের বিকল্প নেই প্রগতির হাতে।

প্রগতির এক তথ্য বিবরণী থেকে জানা গেছে, ১৯৬৬ সালের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ পর্যন্ত প্রগতির কারখানায় মোট ৫৩ হাজার গাড়ি বিযুক্ত (সিকেডি) ও সম্পূর্ণ তৈরি (সিবিইউ) অবস্থায় এনে বিক্রি করেছে। বর্তমানে জাপানের মিত্সুবিশি মোটরসের ২৪৭৭ সিসির অত্যাধুনিক পাজেরো স্পোর্ট কিউএক্স, ফোডে ল্যান্ডফোর্ড, মাহিন্দ্রা স্করপিও সংযোজন করছে। তবে কারখানার বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি ৫০ বছরের পুরনো হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতা ও কার্যকারিতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অসম প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে প্রগতির নতুন নতুন অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে মিত্সুবিশির এল-২০০ মডেলের ডাবল কেবিন পিকআপ সংযোজনের সব প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করেছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বছরে এক হাজার, পরের বছর দেড় হাজার ইউনিট গাড়ি সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রগতি সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত কারখানা চালু হলে এখনকার বছরে এক হাজার ইউনিট গাড়ির পরিবর্তে এক শিফটে বছরে ২৫ হাজার গাড়ি সংযোজন করা যাবে। আর যদি চাহিদার ভিত্তিতে দুই শিফট চালু করা যায় তাহলে বছরে ৫০ হাজার ইউনিট গাড়ি সংযোজন সম্ভব হবে বলে জানালেন পিআইএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে। অক্টোবরের ১৫ তারিখে তাদের বাংলাদেশে আসতে বলেছি। ম্যানুফ্যাকচারার হওয়ার পূর্ব শর্ত হলো আধুনিক অ্যাসেম্বলড প্লান্ট থাকতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে কতটা ফিজিবল হবে সেটাও যাচাই করা হবে। আমাদের প্রস্তাবিত নতুন প্লান্টে পেইন্টশপ, বডিশপসহ সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। ইউরোপের বিখ্যাত কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়েই অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের গাড়ি নির্মাণ।’

আগামী ৭ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রগতির নিজস্ব গাড়ি বাংলাদেশের রাস্তায় চলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘কিছু পার্টস আমরা বানাব, বাকি পার্টস ভেন্ডর থেকে সংগ্রহ করা হবে। বিশ্বব্যাপী এটাই প্রচলিত। সব কিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে আগামী ৭ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রগতি অ্যাসেম্বলার থেকে ম্যানুফ্যাকচারার হবে।’ এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছেন। কারণ একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন বলে মনে করেন প্রগতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা