kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আশ্বাসেই আটকে আছে বে টার্মিনাল

টার্মিনালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য জোয়ার-ভাটার নির্ভরতা ছাড়াই সরাসরি জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আশ্বাসেই আটকে আছে বে টার্মিনাল

২০১৮ সালের ১ নভেম্বর বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প হিসেবে অনেক আগেই পতেঙ্গা সাগর উপকূলজুড়ে ‘বে টার্মিনাল’ গড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই টার্মিনালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে জোয়ার-ভাটার নির্ভরতা ছাড়াই সরাসরি জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়েও বড় জাহাজ অনায়াসেই ভেড়ানো যাবে। সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়। ধাপে ধাপে এই প্রকল্প বাস্তবায়নেরও সিদ্ধান্ত হয়।

২০১৮ সালের ১ নভেম্বর বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কথা ছিল প্রথম পর্যায়ে বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ৬৮ একর জমিতে কনটেইনার ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল বাস্তবায়ন করার। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে সেই ইয়ার্ড চালুর লক্ষ্য ছিল। এ জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পের ডিপিপি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত অনুমোদন না দেওয়ায় সেই কাজটিও শুরু করা যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান মূল জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে সরাসরি পণ্যগুলো স্থানান্তর করে বে টার্মিনাল ইয়ার্ডে নেওয়া হবে। সেখান থেকে ডেলিভারি নেবেন আমদানিকারকরা। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতর পণ্য রাখার স্থান বাড়বে। বন্দরের কাজে গতিশীলতা বাড়বে।

২৩ মাসেও প্রথম ধাপের কাজ শুরু না হওয়ায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ও দেশের ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, নৌ মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা দায়িত্ব নিয়ে আসেন; প্রকল্পটি বুঝতে বুঝতেই তাঁদের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। আবারও নতুন একজন পদে বসেন, প্রকল্পের গুরুত্ব বুঝে কাজ শুরু করতেই তাঁরও সময় শেষ। শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে এভাবেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যদিও চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘এই প্রকল্পে নতুন করে ডিটেইল ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োগ চলছে; যেখানে আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টিও যুক্ত থাকবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে তারা প্রতিবেদন দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকেই ট্রাক টার্মিনাল ও কনটেইনার রাখার ইয়ার্ড নির্মাণ করব। ফলে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালুর পর সক্ষমতা শেষ হওয়ার আগেই আমরা এই টার্মিনাল ও ইয়ার্ড পেয়ে যাব।’

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৮০০ একক ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ ঢুকতে পারে; আর বে টার্মিনালে একসঙ্গে পাঁচ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। এখন বন্দরে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ে; আর একেবারে সাগরে অবস্থানের কারণে বে টার্মিনালে দিনে-রাতে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে ও ছেড়ে যেতে পারবে। এতে পণ্য পরিবহন খরচ ও প্রচুর সময় সাশ্রয় হবে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটি-টার্মিনালে একসঙ্গে ১৯টি জাহাজ ভিড়তে পারে আর বে টার্মিনালে একসঙ্গে ৩০-৩৫টি জাহাজ ভিড়তে পারবে। কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে বাঁকের কারণে জেটিতে জাহাজ আসতে যথেষ্ট ঝুঁকি নিতে হয়। এর বিপরীতে বে টার্মিনালে সরাসরি জাহাজ ভিড়তে পারবে। 

শুধু তা-ই নয়, বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে পৌঁছতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়। এর বিপরীতে বে টার্মিনাল জেটিতে ভিড়তে লাগবে মাত্র এক কিলোমিটার। এ ছাড়া বে টার্মিনালে পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে পারবে।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর জেটি থেকে এনসিটি পর্যন্ত অপারেশনাল এরিয়ার পরিমাণ ৪০০ একর আর বে টার্মিনাল প্রথম দফায় নির্মিত হবে প্রায় ৯০০ একর জমির ওপর। পর্যায়ক্রমে বে টার্মিনালের আয়তন বেড়ে দাঁড়াবে দুই হাজার ৫০০ একর, যা চট্টগ্রাম বন্দরের ছয় গুণ। 

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত পতেঙ্গা থেকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছনে হয়ে রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরতীর ঘেঁষে সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় এই বে টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। ৮৯০ একর জমিতে বে টার্মিনাল গড়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০১৪ সালে; কিন্তু জমি বুঝে পেতে বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চার বছর সময় লাগল বন্দরের। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ব্যক্তিমালিকানাধীন ৬৮ একর জমি বন্দরকে বুঝিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এ জন্য বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা