kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

করোনায়ও স্বস্তিতে বাবুরহাটের ব্যবসায়ীরা

► বিদেশি কাপড় আমদানিতে ভাটা
► ব্যবসায়ীদের মুখে চওড়া হাসি

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনায়ও স্বস্তিতে বাবুরহাটের ব্যবসায়ীরা

স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবার কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে বাবুরহাটের দোকানগুলো ছবি : কালের কণ্ঠ

বৃহস্পতি থেকে শনিবার—সপ্তাহের এই তিন দিন পাইকারি কাপড় বিক্রির হাট বসে নরসিংদী সদর উপজেলার শিলমান্দী ইউনিয়নে। দেশের অন্য সব ইউনিয়নের মতোই এ ইউনিয়নের রাস্তাও কাঁচা-পাকা, অপরিকল্পিত, এমনকি কৃষিজমির ওপর গড়ে উঠেছে বাড়িঘর। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে এ ইউনিয়ন অনন্য ভূমিকা রাখছে। এর মূল কারণ, এখানেই রয়েছে দেশে উৎপাদিত কাপড় বিক্রির সবচেয়ে বড় পাইকারি হাট ‘শেখেরচর-বাবুরহাট’।

করোনা মহামারি প্রদুর্ভাবে সারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন স্থবির হয়ে পড়ে, তখন এখানকার ব্যবসায়ীদের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই সংকট কাটিয়ে তুলতে ঈদুল ফিতরের আগে জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইনের উদ্যোগে শর্ত সাপেক্ষে সীমিত আকারে চালু হয়েছিল এই হাট। এ ছাড়া করোনার কারণে ভারত ও চায়না থেকে কাপড় আমদানিতে ভাটা পড়ায় এখানকার তৈরি কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যায়। আর তাতেই স্বস্তি আসে ব্যবসায়ীদের মাঝে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এনসিসিআই) তথ্য অনুযায়ী, শাড়ি, লুঙ্গি, মেয়েদের থ্রিপিস, বিছানার চাদর, গামছা, মশারি, থান কাপড়, রুমালসহ দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদিত হয় জেলার বিভিন্ন কারখানায়। এর বেশির ভাগ বিক্রি হয় এই বাবুরহাটে।

ঢাকা থেকে সড়কপথে বাবুরহাটের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশেই এই হাট হওয়ায় এখানে কাপড় আসে জেলার বিভিন্ন কারখানা থেকে। প্রায় পুরো জেলায়ই আছে সুতা থেকে কাপড় তৈরির কারখানা পাওয়ার লুম (বিদ্যুত্চালিত তাঁত)। আগে হাতে তাঁত চালিয়ে সুতা থেকে কাপড় তৈরি করা হতো, এখন বিদ্যুত্চালিত যন্ত্রে চলে কাপড়ের বুনন। দিন-রাত সুতা থেকে তৈরি হয় নিখুঁত কাপড়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাপড়ের রং হয় ধূসর। ডায়িং কারখানায় নিয়ে সেগুলো পছন্দমতো রং করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে কাপড় যায় হাটে।

নরসিংদী চেম্বারের সভাপতি মো. আলী হোসেন শিশির বলেন, কাপড় উৎপাদনের কারখানাগুলো গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় অবস্থিত। এর মধ্যে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের প্রায় সব কারখানার কাপড়ই বিদেশে রপ্তানি হয়। সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে উৎপাদিত হয় স্বল্প পরিসরে। নরসিংদীতে যে কাপড় উৎপাদিত হয়, তার বেশির ভাগই দেশে, বিশেষ করে বাবুরহাটে বিক্রি হয়।

তিনি আরো বলেন, নরসিংদী জেলায় ছোট-বড় মিলে প্রায় তিন হাজার শিল্প-কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পাওয়ার লুমের সংখ্যাই বেশি। এর বাইরেও আছে টেক্সটাইল, ডায়িংয়ের (সুতা-কাপড় রং করা) মতো কারখানাও। এসব কারখানায় দেড় থেকে দুই লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তবে জেলায় অনেকটাই অপরিকল্পিতভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে।

অবশ্য জেলা চেম্বারের কাছে কারখানার যে হিসাব রয়েছে, তার সঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যের মিল নেই। তাদের মতে, নিবন্ধিত কারখানার মধ্যে এক হাজার ৪০১টি পাওয়ার লুম, আটটি তৈরি পোশাক কারখানা, আটটি জুটমিল, ছয়-সাতটি স্পিনিং মিল আছে। তবে নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যার চেয়ে বাস্তবে আরো বেশি কারখানা রয়েছে।

বাবুরহাটের ব্যবসায়ীরা বলেন, জেলায় ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই। গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের সংকটও নেই। তবে বাবুরহাটে বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা হয়। হাটের দিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক শ ট্রাক আসে। এসব ট্রাক পার্ক করার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। বেশির ভাগ ট্রাক মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় যানজট হয়। সরকারের উচিত এ বিষয়ে নজর দেওয়া।

আরটেক্স প্রিন্ট শাড়ির প্রপ্রাইটর শেখ মোহাম্মদ রুমন বলেন, ‘সারা বছর আমরা কাপড় বিকিকিনি করলেও মৌসুমটা হচ্ছে দুই ঈদ, বৈশাখ ও পূজায়। কিন্তু করোনায় যখন সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তখন আমরা তৈরি কাপড় নিয়ে বিপাকে পড়ে যাই। প্রায় প্রত্যেক ব্যবসায়ীর গুদামভর্তি কাপড়। হাট বন্ধ, তাই বিকিকিনি নেই। আর তখনই জেলা প্রশাসক ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে সীমিত আকারে মুঠোফোনে অর্ডার নিয়ে এক শাটারে মোকাম খোলার অনুমতি দেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে সারা দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ, তখন আমাদের বাবুরহাট সীমিত আকারে চালু হওয়ায় সারা দেশ থেকে ভালো অর্ডার পাই আমরা। আর তাতেই প্রায় সবাই নগদ অর্থে মজুদকৃত সব কাপড় বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে।’

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহসভাপতি ও রিজেন্ট ফ্যাব্রিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘করোনাকালে আমাদের ব্যবসা বন্ধ ছিল। কিন্তু যখন খুললাম তখন ব্যবসাকে একটা পজিটিভ রূপে দেখতে পেলাম। এর অন্যতম কারণ হলো, দেশে অবৈধভাবে যেসব বিদেশি কাপড় আমদানি করা হতো, করোনার কারণে তা বন্ধ থাকায় স্থানীয় কাপড়ের চাহিদা বেড়ে গেছে। আর আমরা চাই তা সব সময় অব্যাহত থাকুক।’

জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন বলেন, শুধু ব্যবসায়ীদের কথা নয়, স্থানীয়দের জীবন-জীবিকা চলমান রাখার প্রয়াসে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে মনিটরিং সেলের তত্ত্বাবধানে সীমিত আকারে এই বাবুরহাটটি চালু রেখেছিলাম। এতে বন্ধ অর্থনীতির চাকাটা কিছুটা সচল ছিল। আর তাতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্থানীয় অংশীজনেরা কিছুটা ভালো ছিল।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা