kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

মধ্যবিত্তের নাগাল পেল সুপারশপ

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মধ্যবিত্তের নাগাল পেল সুপারশপ

দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই বাচ্চাদের নিয়ে স্বেচ্ছা ঘরবন্দি জীবন শবনম মুশতারীর। দেশব্যাপী লকডাউন চলাকালে এপ্রিল মাসের শেষ ভাগে একদিন রান্নার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে দেখেন লবণ, তেল, মাছ-মাংসের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য প্রায় শেষের পথে। করোনা সংক্রমণের কারণে বাজারের মতো জনসমাগম এড়িয়ে চলেন এই প্রবাসীর স্ত্রী। ফেসবুকের কল্যাণে চিন্তিত শবনমের জন্য আলাদিনের চেরাগ হয়ে হাজির হয় অনলাইন শপিং। অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে অর্ডার দেওয়ার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই নগরীর খুলশী এলাকার ‘দি বাস্কেট’ সুপারশপের হোম ডেলিভারি টিম সব পণ্য নিয়ে হালিশহর আবাসিকের দোরগোড়ায় হাজির, তাও ন্যায্য মূল্যে।

শবনম মুশতারীর মতো করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে চট্টগ্রামের সুপারশপগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে এমন দারুণ সমর্থন দিয়ে গেছে নগরবাসীকে। করোনার সময়ে স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতাদের নির্ভেজাল ও স্বাস্থ্যসম্মত পণ্যসেবা দিয়ে নিজেদের আস্থার জায়গাটি পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। ক্রেতাদের সন্তুষ্টি অর্জনে চেইন সুপারশপগুলোর সঙ্গে সমানতালে পণ্যসেবা দিয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক সুপারশপ খুলশী মার্ট, দি বাস্কেট, হালিশহর মার্ট ও শপিং ব্যাগ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সুপরিসর জায়গার কারণে করোনা চলাকালে এসব সুপারশপে ক্রেতা বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। নতুন এই ক্রেতাদের একটি বড় অংশই মধ্যবিত্ত, যারা এত দিন উচ্চ মূল্যের ভীতিতে এসব সুপারশপ এড়িয়ে চলত।

 

শপিং ব্যাগ সুপারশপ

চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার বর্গফুটের বিশাল জায়গা নিয়ে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি চালু করা হয় ‘শপিং ব্যাগ সুপারশপ’। চালুর মাত্র দেড় মাসের মাথায় শর্টসার্কিট থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে সংঘটিত আগুনে যে ক্ষতি হয়েছিল সেই জের টানতে হয়েছিল অনেক দিন। তবে সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড়াতে অনেকটা সহায়তা করেছে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি।

কিভাবে? সেই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শপিং ব্যাগের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দেশব্যাপী লকডাউনের শুরুতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে ব্যবসার সার্বিক অবস্থা খুবই খারাপ গেছে। তবে মে মাস থেকে পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে থাকে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলামেলা পরিবেশে কেনাকাটা আর স্বাস্থ্যকর পণ্যটি পেতে সুপারশপের ওপর আস্থা রাখলেন ক্রেতারা। আমরাও গ্রাহকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে অনলাইন অর্ডার ও হোম ডেলিভারি দেওয়া শুরু করলাম। ফলে করোনার আগে ও পরে আমাদের গ্রাহকসংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’

মজার বিষয় হলো, নতুন এই ক্রেতাদের একটি বড় অংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা অত্যধিক দামের ভয়ে সাধারণত সুপারশপ এড়িয়ে চলত। এমন তথ্য জানিয়ে শপিং ব্যাগের অপারেশন ম্যানেজার (আউটলেট) মোহাম্মদ রাকিব হোসেন বলেন, ‘করোনায় আমাদের প্রাপ্তি হচ্ছে মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন বাজারের একটা অংশ হওয়া।’

 

হালিশহর মার্ট

এই মধ্যবিত্ত ক্রেতারাই আবার প্রধান ভরসা ‘হালিশহর মার্ট’ সুপারশপের। মূলত মধ্যবিত্তদেরই বাস বন্দর নগরীর সবচেয়ে বড় আবাসিক এলাকাটির। চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট কানেক্টিং সড়কের পাশে সুপারশপটির অবস্থান হলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই বছর ধরে এ সড়কটিই তাদের ভোগাচ্ছে। চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়া সড়কটি গত তিন বছরেও সংস্কারের কাজ শেষ করতে পারেনি। ফলে সাড়ে ১১ হাজার বর্গফুটের এবং এক লাখ ২৫ হাজার আইটেম নিয়ে সজ্জিত সুপারশপটি সেভাবে তাদের পরিচিতি জানান দিতে পারছে না। কিন্তু এর মধ্যেও করোনাকালে গ্রাহকসেবা দিয়ে ঠিকই ক্রেতাসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। বিশেষ করে এই হুজুগের সময়েও স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীসহ সব পণ্যই ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করে ক্রেতাদের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবেই এই করোনাকালে তাদের ক্রেতা আগের চেয়ে অন্তত ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

সমৃদ্ধ অ্যাপারেল সামগ্রী, মেডিসিন কর্নার ও ডক্টরস চেম্বারের কারণে চট্টগ্রামের অন্য যেকোনো সুপারশপের তুলনায় হালিশহর মার্ট নিজেদের ব্যতিক্রম হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে। বিশেষ করে ডক্টরস চেম্বারটি দেশের যেকোনো সুপারশপের মধ্যে একেবারেই ব্যতিক্রম বলে দাবি করলেন হালিশহর মার্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খসরুল আলম আকন। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে দেশের আর কোনো সুপারশপে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার কোনো নজির নেই। আমাদের এখানে শিশুরোগ, গাইনি ও মেডিসিনের তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়মিত রোগী দেখেন। এই করোনার সময়ে যেখানে চিকিৎসকরা চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন সেই সময়েও আমাদের চিকিৎসকরা নিয়মিত রোগী দেখছেন।’

 

দি বাস্কেট

করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে নগরীর খুলশী এলাকায় অবস্থিত দি বাস্কেট সুপারশপে অনলাইন অর্ডার হতো মাসে সাকল্যে ৩০০টি। কিন্তু দেশব্যাপী লকডাউন চলাকালে করোনার সংক্রমণ এড়াতে মানুষের বাজারভীতির কারণে অনলাইননির্ভরতাকে খুব ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে বাস্কেট কর্তৃপক্ষ। মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানোর কারণে বর্তমানে মাসে গড় অনলাইন অর্ডার দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮০০টিতে। বাস্কেটের মোট বিক্রিতে অনলাইন বিক্রির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। অনলাইনে বিক্রি তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় এটিকেই এখন আলাদা একটি ইউনিট হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে বাস্কেট কর্তৃপক্ষ। এ জন্য চারটি মোটরসাইকেল দিয়ে শুধু অনলাইন অর্ডার হোম ডেলিভারি দেওয়ার জন্য পাঁচজন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে অন্তত ৩০ শতাংশ নতুন কাস্টমার যুক্ত হচ্ছে বাস্কেটের গ্রাহকের তালিকায়।

বাস্কেটের কাস্টমারদের একটা বড় অংশই উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত। করোনার কারণে মধ্যবিত্তরাও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছে সুপারশপের কেনাকাটায়। এ ক্ষেত্রে বড় বাধা ভ্যাট। সুপারশপের কেনাকাটার ওপর সরকার নির্ধারিত ভ্যাটের পরিমাণ ৫ শতাংশ। সরকার যদি এই ভ্যাট ছাড় দেয় তাহলে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সুপারশপের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন দি বাস্কেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হোসাইন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে শপিংয়ের ট্রেন্ড নষ্ট হয়ে গেছে। আগে যেমন বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবারে পরিবারের সবাই মিলে সুপারশপে ঘুরতে এসে কেনাকাটা করত, সেই আনন্দটা হারিয়ে গেছে। শৌখিন পণ্য কিনছে না ক্রেতা। ক্রেতারা এখনো ভীত।’

 

ক্রেতা বাড়লেও মুনাফা কমেছে

মো. খসরুল আলম আকন

এমডি ও সিইও, হালিশহর মার্ট

করোনার শুরু থেকেই আমরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীতে বিশেষ নজর দিয়েছি। ক্রেতাদের হাতে এসব সামগ্রী তুলে দিতে আমরা বাড়তি এক টাকাও নেইনি। ২২০ টাকার সেভলন ২২০ টাকায়ই বিক্রি করেছি। যদিও এ সময় কম্পানিগুলোর কাছ থেকে আমরা চাহিদা অনুযায়ী সুরক্ষা সামগ্রী পাইনি। যেমন ২০০ লিটার সেভলন অর্ডার দিয়ে সরবরাহ পেয়েছি ৫০ লিটার। বাকি পণ্যগুলো কয়েক গুণ বেশি দামে কোথায় দিচ্ছে, কারা পাচ্ছে সেটা যাচাই করা উচিত।

করোনার মধ্যে আমরা সাধারণ জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে শুরু থেকেই সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে করোনার মধ্যে বিদ্যুৎ বিলে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সব ধরনের সারচার্জ মওকুফ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। আমরা লকডাউনের মধ্যেও নির্ধারিত ব্যাংকে বিদ্যুৎ বিল জমা দিতে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সীমিত কার্যক্রমের অজুহাত দেখিয়ে বিল নেয়নি। পরে যখন জুন মাসে বিল দিতে গেলাম তখন এই তিন মাসের জন্য ৫০ হাজার টাকা সারচার্জ করা হয়। এ ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনার কথা জানিয়ে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা শুধু আবাসিকের জন্য সারচার্জ মওকুফ সুবিধার কথা বলেন; কিন্তু বাণিজ্যিক গ্রাহকরা নাকি এই সুবিধার বাইরে। অথচ এই সারচার্জের দায়ভার কোনোভাবেই আমাদের ওপর বর্তায় না।

করোনার কারণে পণ্য সরবরাহ দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাল, ডাল, মাছ, সবজির মতো নিত্যপণ্যগুলোর সরবরাহ পেতে খুবই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অনেক সময় ঢাকা থেকে নিজ দায়িত্বে পণ্য সংগ্রহ করে আনতে হয়েছে। আমাদের নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট সুবিধা থাকার কারণে নিজেরাই ঢাকা থেকে পণ্য নিয়ে এসেছি। এ জন্য ক্রেতাদের ওপর বাড়তি কোনো দাম চাপানো হয়নি। কিন্তু বিদেশি পণ্য পেতে দারুণ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিলাস দ্রব্য, বিদেশি খাদ্যসামগ্রী, কসমেটিক্সের মতো পণ্যগুলো আমরা পাচ্ছি না। কিন্তু এই পণ্যগুলোই আমাদের জন্য লাভজনক। করোনার কারণে মানুষের ব্যয়ক্ষমতা কমে গেছে। তাঁরাও এখন জীবন ধারণের জন্য নিত্যপণ্যের বাইরে কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। যে কারণে করোনার সময়ে আমাদের বিক্রি বাড়লেও মুনাফা কিন্তু সেভাবে বাড়েনি।

 

মন্তব্য