kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

দুর্যোগে ত্রাতার ভূমিকায় মোবাইল ব্যাংকিং

লকডাউন-ঘরবন্দিতে অর্থ আদান-প্রদানে বড় সহায়ক হয়েছে
অর্থ পাঠাতে বেগ পেতে হয়নি, তুলতেও বেগ পায়নি সংকটে থাকা মানুষ

রফিকুল ইসলাম   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনাভাইরাস হঠাৎ করেই সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। কাজ না থাকায় সংকটে পড়ে সাধারণ মানুষ। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে জীবিকা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। মানুষের কষ্ট লাঘব ও সহায়তায় এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও উদার ব্যক্তিরা। কেউ একাই নিজ উদ্যোগে কেউবা যৌথ, আবার কেউ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সাধ্যমতো। করোনার এই সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আর্থিক লেনদেনে ত্রাতার ভূমিকায় আছে মোবাইল ব্যাংকিং। টাকা পাঠাতে কিংবা তুলতে দূরে কোথাও যেতে হয়নি। ঘরে বসে অর্থ সহায়তা পেয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আবার এই মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে ঘরে বসেই সংকটে পড়া মানুষের কাছে অর্থ সহায়তা তুলে দিয়েছেন। করোনার এই দুর্যোগে সেবা ও সংকটে পাশে দাঁড়াতে সহায়ক হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং।

শুধু সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনই নয়, করোনা সংকটে থাকায় দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষকে সরকারের নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। প্রযুক্তির কল্যাণে এক ক্লিকেই বাঁছাই করা নম্বরে পৌঁছে গেছে সরকারি সহায়তার নগদ আড়াই হাজার টাকা। এই সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের উপকারভোগী প্রায় দুই কোটি মানুষ। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, সদস্য, শিক্ষক, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি তালিকা তৈরি করেছেন। ভাতা পাওয়ার তালিকায় আছেন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোল্ট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকের পরিবহন শ্রমিক ও হকারসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষ।

জানা যায়, তালিকাভুক্তদের কাছে নগদ, বিকাশ, রকেট ও শিওরক্যাশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি টাকা পেয়েছেন মানুষ। ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা না পাঠিয়ে নিম্নবিত্ত মানুষের ঝামেলা এড়াতে মোবাইল ব্যাংকিং বেছে নেওয়া হয়েছে।

করোনায় রাজধানী বা রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ব্যক্তি নিজ নিজ উদ্যোগে সংকটে পড়া মানুষের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীও নিজ নিজ উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজ এলাকায় সংকটে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটে পড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশেও দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। দূর-দূরান্তে ও মফস্বলে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য মোবাইলে অর্থ সহায়তা পাঠিয়েছেন। বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন টাকা। আবার কেউ টানা ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে মানুষকে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মানুষের পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিরা জানান, সংকটে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় সহায়ক হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। আবার দুর্যোগ ও সংকটে পড়া মানুষ ঘরে বসে মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পাওয়ার ভরসা পেয়েছে। তাঁদের মধ্যে আশা জেগেছে। করোনায় ঘরবন্দি থাকতে হয়েছে মানুষকে, সেই দুর্বিপাক পরিস্থিতিতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং।

৯০ দিনের বেশি সময় ধরে মানুষের মুখে দুই বেলা খাবার তুলে দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সদস্য তানভীর হাসান সৈকত। গত ২৩ থেকে করোনা সংকট শুরু হলে মানুষের সহায়তায় মাঠে নামেন তিনি। ব্যক্তি উদ্যোগে কাজটি শুরু করলেও তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আরো অনেকে। শুরুতে নিজের টাকা দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ালেও পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক, বর্তমান ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়েছেন।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিকাশ না থাকলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এতটা সহজ হতো না। এখন বিকাশ সহজলভ্য হওয়ায় খুব সহজেই টাকা আনা-নেওয়া করা যায়। যেটা হয়তো প্রথাগত ব্যাংকিং সেবায় সম্ভব হতো। আর করোনার সময় ব্যাংকে যেতেও তো ভয়। সেই হিসেবে ঘরবন্দি অবস্থাতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা খুবই সহায়ক হয়েছে।’

ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ তালুকদার, ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল আহমেদ তানভীর, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাদ বিন কাদের, সদস্য নজরুল ইসলাম এবং তিলোত্তমা শিকদার করোনা সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নগদ টাকা পৌঁছে দিয়েছেন আবার কেউ সাধারণ মানুষের পাশে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অর্থ লেনদেনে তাঁরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করেছেন। বিত্তবান মানুষের কাছ থেকে তাঁরা টাকা সংগ্রহ করে বিকাশের মাধ্যমে সংকটে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সাতক্ষীরা জেলা। এই জেলার আশাশুনি থানার শেষ প্রান্তের গ্রাম বিছট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই গ্রামের সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলী আজমের চেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকায় বসে তাঁর বিভাগের সিনিয়র ভাইয়েরা অর্থ সংগ্রহ করেন।

তাঁদেরই একজন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিকাশ ও রকেটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে অল্প সময়ের মধ্যে সংকটে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে রাস্তাঘাট লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সড়কে সেখানে যাওয়া দুঃসাধ্য ছিল। কেবল মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে।

মন্তব্য