kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

নির্ভরশীলতা বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে

রোকন মাহমুদ   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নির্ভরশীলতা বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে

এফ এম আলমগীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। রাজধানীর মানিকনগরের এই বাসিন্দা নিজের বাড়ির সব ইউটিলিটি বিল আগে দিতেন ব্যাংকে গিয়ে। কিন্তু করোনার এই সময়ে একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি, অন্যদিকে সীমিত ব্যাংকিংয়ে দীর্ঘ লাইন। ফলে তিনি ব্যাংকমুখী হওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। কিন্তু বিলগুলোও দেওয়া দরকার। সব মিলিয়ে একরকম বিপাকেই পড়েছিলেন ষাটোর্ধ্ব এই বাড়িওয়ালা। শেষে তাঁকে উদ্ধার করে মোবাইল ব্যাংকিং। তিনি বাসার নিচের একটি দোকান থেকে ডিপিডিসি ও ওয়াসার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ মোবাইল ব্যাংকের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করেন।

তিনি বলেন, ‘আগে তেমন কোনো কর্মব্যস্ততা না থাকায় ব্যাংকের মাধ্যমেই সব লেনদেন করতাম। করোনার কারণে ব্যাংকে যেতে পারছিলাম না। তাই এখন মোবাইল ব্যাংকের মাধ্যমে করি। এতে বেশ সুবিধাই হয়েছে। কষ্ট করে আর দূরে যেতে হয় না, নেই স্বাস্থ্যঝুঁকিও। তবে এর পর থেকে নিজের ঘরে বসেই করব। এ জন্য একটি ফোনসেট কিনে এনেছি।’ এটি আলমগীর সাহেবের মে মাসের গল্প। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে সেই মার্চ থেকেই। তাঁর মতো এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা নিত্যপণ্য কেনাকাটা, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বিভিন্ন ফি প্রদান, ভাড়ার অর্থ প্রদান, পরিবারের কাছে সংসার খরচ পাঠানো, ই-কমার্সের লেনদেন ইত্যাদি কাজে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে মানুষকে ঘরে থাকতে হচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কারণে লেনদেন করতে হবে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মানুষকে লেনদেন করতে হচ্ছে। এ জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহারও বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফলে মানুষের লেনদেন অনেক সহজ হচ্ছে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন অফারের কারণে নগদ লেনদেনের চেয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনে কিছুটা সুবিধাও পাচ্ছেন গ্রাহকরা। তাই প্রতিনিয়তই নতুন নতুন গ্রাহক যুক্ত হচ্ছেন এ খাতে। গত আড়াই মাসে এসব খাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা ও জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন করে এমএফএসের সঙ্গে যোগ হয়েছে বড় অঙ্কের পোশাক শ্রমিক ও সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাভোগীরাও। তাদের অর্থ এখন পৌঁছে যাচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনো কম্পানি গ্রাহকদের উৎসাহী করতে দিচ্ছে ছাড় ও অন্যান্য সুবিধা। এ ছাড়া টাকার জমার ওপর লাভও দিচ্ছে অনেক কম্পানি।

এপ্রিলের এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৫ দিনেই খোলা হয়েছে ২৬ লাখ মোবাইল ব্যাংক হিসাব। শুধু যে এমএফএসের গ্রাহক বেড়েছে তা নয়। গ্রাহকের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদার ভিত্তিতে বেড়েছে টাকা জমা ও উত্তোলনের সীমাও।

এ বিষয়ে বিকাশের কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার নতুন অ্যাকাউন্ট যোগ হতো। করোনার এই মাসগুলোতে তা অনেক গুণ বেড়েছে। মার্চে ছুটি শুরুর আগে আমাদের চার কোটি গ্রাহক ছিল। এখন তা বেড়ে চার কোটি ৪৩ লাখ হয়েছে। অর্থাৎ এ সময় আমাদের ৪৩ লাখ গ্রাহক বেড়েছে। যদিও এর বড় একটি অংশ পোশাক শ্রমিক। কিন্তু আমরা জানি, একবার হিসাব খোলা হলে এর মাধ্যমে সব সময়ই লেনদেন হয়।’

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের সীমা বাড়ানোর যাৈক্তিকতা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বর্তমানে নতুন খাত সম্প্রসারণে—যেমন রেমিট্যান্স বিতরণ, ই-কমার্স, ক্ষুদ্র ব্যবসা, বেতন প্রদান ইত্যাদি খাতে ভূমিকা রাখছে। তাই এ খাতের সীমাও বাড়ানো হয়েছে।

ই-কমার্সে মোবাইল ব্যাংকিং এখন প্রায় অপরিহার্য একটি বিষয়। বিশেষ করে করোনার এই সময়। তাই এ খাতের ব্যবসায়ীরা নগদ লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করে ডিজিটাল লেনদেনকেই উৎসাহিত করছেন। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন ই-কমার্স বলুন আর দৈনন্দিন লেনদেন বলুন, সব ক্ষেত্রেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব অনেক। করোনা আসার পর আমরা নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করে ডিজিটাল লেনদেনকেই উৎসাহিত করছি। এটি করোনার ঝুঁকি এড়াতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া এমনিতেও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আমরা বাজেটের আগে ডিজিটাল লেনদেনে ট্যাক্স মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছিলাম সরকারের কাছে।’

তিনি বলেন, যে হারে এ খাতে মানুষ ঝুঁকছে তাতে এখন সময় এসেছে কোর ব্যাংকিংয়ের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়েও আন্তসংযোগ স্থাপন করা। এক মোবাইল ব্যাংক অপারেটর অন্য মোবাইল ব্যাংক অপারেটরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হলে গ্রাহক ব্যাংকের পরিবর্তে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ঘরে বসে লেনদেন করতে পারবে। তবে ব্যাপ্তির সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে।

ই-কমার্সভিত্তিক মার্কেটপ্লেস ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল বলেন, অনলাইনে কেনাবেচার মূল্য ডিজিটাল মাধ্যমে পরিশোধ করার সুযোগ রয়েছে। ইভ্যালিতে মূল্য ডিজিটাল মাধ্যমে পরিশোধের শতভাগ সুযোগ রয়েছে। ফলে মূল্য পরিশোধ নিয়েও কোনো রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকছে না। এটাই ই-কমার্সের শক্তি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা